বাংলাদেশ থেকে হার্ভার্ডে

বাংলাদেশ থেকে হার্ভার্ডে

  • ক্যাম্পাস ডেস্ক 

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যখন গণিত নিয়ে আমাকে লিখতে বলা হলো তখন কিছুটা অবাকই হয়েছি বলতে হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে পদক অর্জন থেকে শুরু করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়েই পুরো সময় কেটেছে, বর্তমানে সিলিকন ভ্যালিতে স্টার্টআপ শুরু করার কারণে একাডেমিক বিশুদ্ধ গণিতের সঙ্গে একটু দূরত্বই তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছুটা ভাবার পরই উপলব্ধি করলাম যে স্টার্টআপে কাজ করা আর গণিত করার মধ্যে আসলে খুব বেশি দূরত্ব নেই। কারণ, ছোটবেলা থেকে গণিত চর্চার মাধ্যমে গাণিতিকভাবে চিন্তা করার যে ক্ষমতা তৈরি হয়, সেটার ব্যবহার কেবল গণিতে সীমাবদ্ধ নয়।

ছোটবেলা থেকে গণিত আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে লেগে থাকতে হয়, সেটা যেকোনো সমস্যার সমাধানই হোক বা স্টার্টআপের নতুন প্রোডাক্ট তৈরিই হোক। গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে। ছোটবেলা থেকে গণিত আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে লেগে থাকতে হয়, সেটা যেকোনো সমস্যার সমাধানই হোক বা স্টার্টআপের নতুন প্রোডাক্ট তৈরিই হোক। গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে। সে বছর পত্রিকার পাতায় জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে নির্বাচনের জন্য বেশ কিছু কুইজ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো সমাধান করে জাতীয় পর্যায়ে যোগ দিলেও সে বছর ফিরতে হয়েছিল শূন্য হাতে! কিন্তু পরের দুই বছর গণিতের পেছনে লেগে থাকার পর ২০০৬ সালে ডাচ বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ও প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় হয়ে জাতীয় অলিম্পিয়াডে জুনিয়র পর্যায়ে দেশসেরা হিসাবে পুরস্কার পেয়ে যোগ দিলাম গণিত ক্যাম্পে। সে বছর গণিত ক্যাম্প থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আরও এক বছর লেগে থাকলাম গণিতের পেছনে! এরপরের বছরই বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পাই। বাকিটা ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। একইভাবে গত বছর নতুন স্টার্টআপের কাজ শুরু করার পর লেগে থাকার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছি গত দেড় বছরে অনেকবার!

গণিতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং সমস্যা সমাধান। অ্যাবস্ট্র্রাকশন বিষয়টা সহজে বোঝা যায় মুঠোফোনের কথা চিন্তা করলে। মুঠোফোনের কল বাটন চাপলে যেমন আমাদের চিন্তা করা লাগে না যে কীভাবে জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফোন অপারেটর দুজনের ভেতর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছে, সেভাবে গাণিতিক অ্যাবস্ট্র্রাকশন আমাদের শেখায় কীভাবে একটি জটিল সমস্যাকে ফোনের কল বাটন চাপার মতো সহজ সমস্যায় পরিণত করা যায়। স্টার্টআপে কাজ করার সময় প্রতিনিয়ত আমাদের জটিল সমস্যার সমাধান করতে হয়। আর সেই সমস্যাগুলো সহজে সমাধান করা যায় সমস্যাগুলোকে ছোট ছোট অ্যাবস্ট্রাকশনে পরিণত করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে গণিত করার মাধ্যমে গাণিতিকভাবে চিন্তা করার যে ক্ষমতা তৈরি হয়, সেটার ব্যবহার শুধু গণিত করা নয়, জীবনের যেকোনো সমস্যা সমাধানেই কাজে লাগে।

গণিত অলিম্পিয়াডের বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় বাদ দিলেও বলতে হবে গণিত ক্যাম্পের স্মৃতিগুলো আমার প্রাক্‌বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্যতম সেরা স্মৃতি। ক্যাম্পে তুখোড় এবং গণিতপ্রেমী শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে আসতে পেরে আমি এখনো নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। গণিত ক্যাম্প এবং জাতীয় দলের অনেকেই দেশ ও বিদেশের সেরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে বা করছে। মজার ব্যাপার হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের যেসব শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাদের অনেকেই হার্ভার্ড, এমআইটিতে পরে পড়তে এসেছে। এমনকি আমি বর্তমানে যে স্টার্টআপে কাজ করছি, সেখানে যোগ দিয়েছে আমার বন্ধু ম্যালকম, সে ছিল নিউজিল্যান্ড গণিত দলের সদস্য!

গণিত অলিম্পিয়াড কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলন এবং একটি স্বপ্নের নাম। গণিত অলিম্পিয়াড কেবল আমাদের গাণিতিক দক্ষতাকে বাড়ানোর জন্যই কাজ করেনি, আমাদের সবাইকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আমার মতো অনেকের জন্যই বাংলাদেশের ছোট শহর থেকে পড়ে বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ কাজটি গণিত অলিম্পিয়াড করে চলেছে নিরন্তরভাবে। গণিত অলিম্পিয়াডের দেখানো স্বপ্নের পথ ধরে আমি ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখি এমন কোনো প্রযুক্তির ওপর কাজ করার, যা সরাসরি মানুষের জীবনের উন্নয়নে কাজে আসে। হার্ভার্ডে শেষ বর্ষে স্বল্পমূল্যের কম্পিউটার ব্যবহার করে শিক্ষাদান পদ্ধতি উন্নয়নের প্রজেক্টের ওপর অনেক কাজ করেছি, যেটার নাম ছিল বাংলা পাই। সেটাকে এবং সেটার মতো বিভিন্ন আইডিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু হার্ভার্ড থেকে বের হওয়ার পর সিলিকন ভ্যালিতে এসে বুঝতে পেরেছি তার জন্য আমার নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ।

প্রতিবছর গণিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের সফলতা আমাকে অবাক করে। গত বছর আমাদের শিক্ষার্থীরা ভারতকে পেছনে ফেলেছে। এ বছর প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে আমরা শত পয়েন্টের বেশি অর্জন করেছি। আসিফ মাত্র এক পয়েন্টের জন্য স্বর্ণপদকের সুযোগ হারিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার পদক বা এক বছরের অর্জন নয়; বরং আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো আমাদের ধারাবাহিক সফলতা এবং অগ্রযাত্রা। প্রথম বছর (২০০৪ সালে) আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের দলীয় অর্জন ছিল সর্বমোট ৩ পয়েন্ট। সেখান থেকে আমরা ১২ বছরের মাথায় দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হওয়া বাংলাদেশের জন্য সার্বিকভাবে একটি গর্বের বিষয়।

আমার মতো অনেকে যারা স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে এবং বড় কিছু করতে চায় এমন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আমার কিছু পরামর্শ হলো:

১. সব সময় নতুন কিছু করতে বা শিখতে চেষ্টা করো। শিক্ষাজীবনে নিজের দক্ষতার ওপর বিনিয়োগের চেয়ে কোনো ভালো বিনিয়োগ নেই।

২. ইন্টারনেট সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখো। ইন্টারনেটের ব্যবহার কেবল ফেসবুকে সীমাবদ্ধ রেখো না, বরং ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজেকে উন্নত করতে শেখো। এডএক্সের মতো ওয়েবসাইটে বিনা মূল্যে বিশ্ববিখ্যাত প্রফেসরেরা বিভিন্ন বিষয় শেখান। এসব থেকে একটু শিখতে পারলেও নিজেকে অনেক দূর নিতে পারবে।

৩. পাঠ্যবই বা পড়াশোনার বাইরে একটা বিশাল জগৎ আছে, সেটাকে চিনতে ও জানতে চেষ্টা করো।

৪. সবশেষে যে বিষয় ভালো লাগে সেটা করো। আমাদের দেশে অভিভাবকদের থেকে চাপ থাকে; কিন্তু বাস্তবতা হলো তোমার যদি কোনো বিষয় ভালো না লাগে তাহলে সেটাতে জোর করে ভালো করা সম্ভব হয় না।

গণিত অলিম্পিয়াডের মতো সামাজিক আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, এটি আমার মতো অনেক কিশোর তরুণকে স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন কিছু করার জন্য। সেই সঙ্গে শুধু গণিত ভীতি দূর করাই নয় বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানো ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। তাই আমি স্বপ্ন দেখি যে গণিত অলিম্পিয়াড আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাবে আগামীর বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে।

সূত্রঃ প্রথম আলো

favicon59-4

Leave a Reply