স্বপ্নের কোনো নির্ধারিত গণ্ডি থাকে না

স্বপ্নের কোনো নির্ধারিত গণ্ডি থাকে না

আমার জন্ম ১৯৯২ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। চার বছর বয়সে ১৯৯৬ সালে বাবার চাকরিসূত্রে পঞ্চগড়ে চলে আসি। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করতাম। মা-বাবার কাছে শুনেছি গ্রামে (পার্বতীপুর) পুজোর সময় যখন প্রতিমা বানানো হতো, তখন আমি নাকি সারা দিন প্রতিমাশিল্পীদের কাছে পড়ে থাকতাম। তাঁরা কীভাবে কাজ করেন, সেগুলো মন দিয়ে দেখতাম। সেই সময়টাতে আমিও নাকি দিব্যি মাটি দিয়ে প্রতিমা বানিয়ে রাখতাম। একদিন নাকি মাটি দিয়ে বড় একটা কুকুর বানিয়ে রাতে সেটাকে রাস্তায় বসিয়ে রেখে গ্রামের অনেক বাসিন্দাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম।


আঁকাআঁকি ছিল আমার নেশা। বাবা-মা আমাকে মাঝেমধ্যেই আবিষ্কার করতেন আমি বিছানার নিচে শুয়ে শুয়ে আঁকছি! এ কারণে অনেক বকাও খেতে হয়েছে। এ জন্য অবশ্য এখন তাঁদের দোষ দিই না। কেননা আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ মানুষ মনে করে লেখাপড়াই আসল কথা। সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যারিস্টার হবে, এটাই পড়ালেখার আসল উদ্দেশ্য। চারুকলা, সংগীত, নৃত্য, অভিনয় কিংবা এমনকি সাহিত্য চর্চা করে উচ্ছন্নে যাওয়া মানুষেরা। কারণটাও যৌক্তিক, কেননা বিদ্যালয়ে কিংবা সমাজের শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবাই বলত ‘পড়ালেখা করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে!’ আমার বাবা-মাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাঁদের ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব। কিন্তু আমার ইচ্ছা তো সে রকম ছিল না। স্কুল শাখায় আমার চারুকলা বিষয়টি থাকার কারণে আঁকাআঁকির সঙ্গে লেগে থাকতে পেরেছি। ছাত্র হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না বলা যায়, স্কুলে বরাবরই প্রথম সারির ছাত্র ছিলাম। সেই মাধ্যমিক থেকেই অনেক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি, বরাবরই চ্যাম্পিয়ন হতাম। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক জীবনে পরপর তিনবার পেয়েছি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন অ্যাওয়ার্ড’, পেয়েছি আঞ্চলিক আর জাতীয় অ্যাওয়ার্ডও। এ বছর পেলাম ‘ক্যাম্পাস টু ক্যারিয়ার ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’।

আমি খুব স্বচ্ছন্দে ও সাবলীলভাবে জীবন অতিবাহিত করছি, মোটেই তা নয়। জীবনে আছে দুঃখ-কষ্টমিশ্রিত অনেক না-বলা গল্প। বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়ে সব জমিজমা বিক্রি করে পথে নেমেছিলেন। সেই পথচারীর সঙ্গী হতে হয়েছে পরিবারের সবাইকে। অনেক সময় গেছে, আঁকব কিন্তু সামান্য পেনসিল-কাগজ কেনার টাকা ছিল না। অনেক দিনই না খেয়ে পার করতে হয়েছে। আমার পড়াশোনা বন্ধ হবে হবে করেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। সেই সময় অসামান্য কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সংস্পর্শ আমাকে নতুন করে সাহসী বানিয়েছিল, যার ধারা এখনো বহমান।

যা-ই হোক, সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে এসএসসি ও এইচএসসির পালা শেষ করে আমার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পালা। ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করলাম। এরপরের লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলাম না। অনুভূতিটা হলো এমন, না পারলাম বাবা-মায়ের কথা রাখতে, না পারলাম নিজেরটা। তবে দমে যাইনি । জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কিছু মানুষের দেওয়া সাহস আর মনোবলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। অবশেষে ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পেয়ে ২০১৩ সালে পাড়ি জমালাম কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। অ্যাপ্লাইড আর্ট নিয়ে এখন আমি সপ্তম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত।

আর দশজন বাঙালির মতোই খুবই প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে আমার জন্ম হয়েছিল। প্রথমেই বলেছিলাম সেটি দিনাজপুরের পার্বতীপুর গ্রামে। তারপর বাবার চাকরির সুবাদে পঞ্চগড় শহরে বসবাস। তখন থেকেই আমার প্রকৃতির সঙ্গে ভালোবাসা। গ্রামবাংলার সবুজ-শ্যামলই হয়তো প্রকৃতিপ্রেমের প্রধান কারণ। আমার ধারণা, মাতৃপ্রেমের পরেই মানবসন্তানের নির্মোহ ভালোবাসা কেবল প্রকৃতির প্রতিই থাকে। হয়তো এ জন্য প্রকৃতি ভীষণ টানত সব সময়। ঘুরতে পছন্দ করতাম প্রচণ্ড, এখনো করি, ঘোরাঘুরি করাটা একপ্রকার নেশা হয়ে গেছে । নানান মানুষের সঙ্গে মিশে মানুষের জীবনকে বুঝতে পারার নিরন্তর চেষ্টা ছিল সব সময়। মনুষ্য জীবনকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশের একটা স্বপ্ন থেকেই বোধ হয় চিত্রশিল্পী হওয়ার মনোবাসনা আমার। মূলত আমার প্রকৃতিপ্রেম আর মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনবোধ মূল্যায়নের স্পৃহা থেকেই এই আঁকাআঁকির জীবনে আসা।

আমি কখনোই মনে করি না একটা ইনস্টিটিউট কাউকে আর্ট শেখাতে পারে। বড়জোর একটা নান্দনিক পরিবেশ দিতে পারে। কেউ কাউকে আর্ট শেখাতে পারে না। পৃথিবীর প্রতিটা প্রাণীই আমার কাছে শিল্পী। সবার মধ্যেই শিল্পবোধ আছে, এটি প্রাণিজগতের সহজাত বৈশিষ্ট্য। আমার দর্শন নিজেকে কখনো সিলেবাসের মধ্যে বা সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ না রাখা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সবকিছু হাতে পেলেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নবীনেরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমরা টার্গেট আর সীমানা বেঁধে দিই। অথচ ছাত্রদের প্রথমেই বলা উচিত, এই হচ্ছে তোমার আগ্রহের জায়গা। এ পর্যন্ত আহরিত জ্ঞানকে পুঁজি করে এবার তোমার জীবন অভিযানের পালা। তোমার কোনো সীমানা নেই, কেননা স্বপ্নের কোনো নির্ধারিত গণ্ডি থাকে না।

আমি ২০১১ সালে ক্যারিকেচার আঁকা শুরু করি। এই একটা মাধ্যম, যেটাতে আমি একটা অবর্ণনীয় অনুভূতি পাই। তবে ক্যারিকেচারই শেষ কথা নয়, আমি সব ধরনের ছবি আঁকতে পছন্দ করি। নিজের দক্ষতা আর কল্পনাশক্তিকে বুঝতে চেষ্টা করি। বাস্তবধর্মী ছবি আঁকাও আমার অন্যতম একটা ভালো লাগার জায়গা। সমাজের অবস্থা অনেকটাই এখন ইতিবাচক। এখনকার ছেলেমেয়েরা এখন চারুকলায় পড়তে আসছে। আঁকাআঁকি নিয়ে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কথা নিজের কল্পনাশক্তি, দক্ষতা আর স্বপ্নকে মূল্যায়ন করতে শিখেছে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ কার্টুনিস্টই চারুকলা ব্যাকগ্রাউন্ডের নয়। তাই আশা ছাড়া যাবে না, দুনিয়ার অনেক শিল্পীই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই দুনিয়া-কাঁপানো শিল্পী হয়েছেন। আমরা যেকোনো জায়গা থেকে আমাদের প্রতিভা আর শিল্পমনের বিকাশ ঘটাতে পারি।

কার্টুন, ইলাস্ট্রেশন, ক্যারিকেচার, অ্যানিমেশনের দর বিশ্ববাজারে এখন অনেকটাই চড়া। এখন সব জায়গায় চিত্রশিল্পীরা এসব কাজ করছেন। যদিও আমাদের দেশ এটা থেকে অনেকটা পিছিয়ে। তবে আশার কথা, এই যে নতুন নতুন ছেলেমেয়ে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ছে স্কেচিং করতে। ভালো ভালো কাজ উপহার দিচ্ছে। তবে আপাতত আমি নিজেও আশপাশ কিছু না ভেবেই কাজ করে যাচ্ছি। সামনের বছর একটা প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা করছি।

আর্থিক বিষয়টা শিল্পবোধের স্ফুরণের জন্য কিছুটা নয়, অনেকটাই প্রতিবন্ধক। ডিজিটাল আর্ট বিষয়টি অনেক ব্যয়বহুল একটা মাধ্যম, যার কারণে মাঝেমধ্যে নিজের ভালো লাগার বাইরে গিয়েও দর্শক আর মানুষের চাহিদা মোতাবেক কিছু কাজ করতে হয়। বিষয়টি আমার শিল্পমনের নৈতিকতাকে বরাবরই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্পীরা মূলত নিজের জন্য কাজ করেন, যে মুহূর্তে কোনো শিল্পী পাঠক, দর্শক আর বাজারের জন্য কাজ করেন মূলত তখনই শিল্পমনের অবক্ষয় ঘটে। কিন্তু কিছুই করার নেই, খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এদিকে ফেসবুক নামক নেশার কারণে অজান্তেই শিল্পের অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়। এখনকার বাচ্চারা একটা ছবি আঁকতে যে সময় ব্যয় করে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় ব্যয় করে ফেসবুকের লাইকসংখ্যা গণনা করতে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটা বিশাল ভালো দিক আছে, এটাকে আমাদের ব্যবহার করা উচিত, কাজে লাগানো উচিত। আগে কী হতো? একজন কবিকে কবিতা লিখে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো, আজ আর সেই সমস্যা নেই। একজন কবি সহজেই তাঁর কবিতাকে হাজার পাঠকের কাছে নিয়ে যেতে পারছেন, একই সঙ্গে পাঠকের প্রতিক্রিয়াও তিনি পাচ্ছেন। একই বিষয় সব শিল্পমাধ্যমের বেলায় খাটে। তবে এখানেও সাবধানতার দরকার আছে। কেননা যে মুহূর্তে শিল্পী নিজের ভালো লাগা থেকে কাজ না করে পাঠক, শ্রোতা, দর্শক কিংবা বাহবা আর হাততালির জন্য সৃষ্টি করা শুরু করবেন, তখনই তাঁর শিল্পীসত্তার মৃত্যু ঘটবে ।favicon59-4

Leave a Reply