বিদেশের সভা-সেমিনারে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা

বিদেশের সভা-সেমিনারে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা

  • ক্যাম্পাস ডেস্ক

তরুণদের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে নিয়মিতই আয়োজিত হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা, কর্মশালা, সম্মেলন ইত্যাদি। ছাত্রাবস্থায় ভিনদেশে ঘুরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ঝুলি যেমন ভারী হচ্ছে, তেমনি বন্ধুত্ব হচ্ছে নানা দেশের তরুণদের সঙ্গে। সুযোগ হচ্ছে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাবার। কীভাবে এসব আন্তর্জাতিক আয়োজনের খোঁজ পাওয়া যায়? কেমন করে অংশ নিতে হয়? ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কী কাজে আসে? চলুন, এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজা যাক।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দা নিশাত নায়লা। বন্ধুরা নাকি ইদানীং তাঁকে ‘বিদেশি’ নায়লা নামে ডাকা শুরু করেছেন। এমন নামকরণ হবে নাই-বা কেন? আজ হয়তো নায়লা সিঙ্গাপুরের বিমানবন্দরে বসে ফেসবুকে চেক-ইন দিচ্ছেন, কদিন পরই দেখা গেল, তিনি আছেন থাইল্যান্ডে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু করার পর ২০১৫ সাল থেকে এরই মধ্যে মোট আটবার দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এই শিক্ষার্থী। তবে এই যাওয়া স্রেফ ভ্রমণের জন্য নয়; তরুণদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সম্মেলন, সভা বা কর্মশালায় অংশ নেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

নিশাতের মতো বাংলাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বহু শিক্ষার্থী সুযোগ পেলেই অংশ নিচ্ছেন তরুণদের জন্য আয়োজিত নানা রকম আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে। তা ছাড়া দেশে আজকাল নিয়মিত এমন কিছু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে সাফল্য পেলে ভিনদেশের বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নেওয়া যায়। কেউ কেউ নিজ খরচে সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। আবার বিশেষ বৃত্তি পেয়ে বিনা খরচেও ভিনদেশে দারুণ সব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন অনেকে।

কেমন করে এসব আয়োজনে ডাক পেতে হয়? আবেদন করার প্রক্রিয়া কী? ভিনদেশে অর্জিত এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের কতটা লাভবান করছে? এ প্রসঙ্গেই কথা হলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তরুণ সম্মেলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। জানা গেল, ব্যাপারটা মোটেও ‘রকেট সায়েন্স’ নয়। অনেক তরুণেরই হয়তো পছন্দের বিষয়ের ওপর আয়োজিত সম্মেলনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা আছে, আছে ইচ্ছেও। কিন্তু সঠিক পথটা জানা নেই বলে আবেদন করতে পারছেন না।

আবেদনের প্রক্রিয়া
5c1c3f31adc25a4a313fc3c9ab159bd2-59050e01c644dএকেক সম্মেলনের ক্ষেত্রে আবেদনের প্রক্রিয়া থাকে একেক রকম। ঘাবড়ে না গিয়ে একটা একটা করে ধাপ অনুসরণ করে নির্ধারিত কাগজপত্র জমা দিতে হবে। বুয়েটের মিত্রশ্রী দেবকে যেমন ‘দ্য গ্রেস হপার সেলিব্রেশন অব উইমেন ইন কম্পিউটিংয়ে’ অংশ নিতে অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়েছিল। অনলাইনে প্রথমে সিভিসহ আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, শিক্ষকদের সুপারিশপত্র জমা দেওয়ার পর মিলেছে সুযোগ। কোনো কোনো সম্মেলনে অংশ নিতে অনলাইনে সাক্ষাৎকারও দিতে হয়।

আবার নিশাত রায়হান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ভারতে। বুয়েটের সাফির আবদুল্লাহ জাতিসংঘের বেশ কিছু আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাই ‘অফিশিয়াল ডেলিগেট’ হিসেবে তিনি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
যেকোনো সম্মেলনের ক্ষেত্রেই আবেদন করার পদ্ধতি বিস্তারিত উল্লেখ করা থাকে। কী পরিমাণ খরচ হবে, বৃত্তির সুযোগ আছে কি না—সবকিছু বিবেচনা করে শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সভা, সম্মেলন, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানআরও কত কী!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ব্যবসায় শিক্ষা, পরিবেশ, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়েই তরুণদের সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ফেসবুকে কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশাত নায়লার সঙ্গে। বলছিলেন, পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন বলেই সব সময় চোখ কান খোলা রাখেন, জানার চেষ্টা করেন—বিশ্বজুড়ে পরিবেশসংক্রান্ত কী কী কাজ হচ্ছে। গুগলে সার্চ করে কিংবা ফেসবুকের বিভিন্ন পেজের মাধ্যমে খবর পান তিনি। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও হংকংয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর।

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব চীনের সাংহাইতে গিয়েছিলেন ‘হুওয়াই সিডস ফর দ্য ফিউচার’ অনুষ্ঠানে। দেশীয় একটি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে এই সুযোগ পেয়েছেন তিনি। নাসমুস সাকিব যেমন পরিচিত হয়েছেন চীনের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেছেন।

২০১৫ সালে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা আয়োজন করেছিলেন ‘টর্চ লাইট র্যা লি ফর পিস’ নামে একটি অনুষ্ঠান। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট তরুণ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা’ বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাত রায়হানও ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আটজন মিলে পুরো র্যা লির নেতৃত্ব দিয়েছিলাম।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সালেমা নাজনীন সিদ্দিকাও গত ডিসেম্বরে ঘুরে এসেছেন জাপান থেকে। বুয়েট এবং জাপানের সায়তামা ইউনিভার্সিটির মধ্যে ‘একাডেমিক এক্সচেঞ্জ’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি এই সুযোগ পেয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বুয়েটেরই আরেক ছাত্র রাদীন মো. মাহিরুল হক। সালেমা বলেন, ‘সায়তামা ইউনিভার্সিটিতে নিজেদের পড়াশোনা, কারিকুলাম এবং গবেষণা নিয়ে আমাদের যেমন প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছিল, তেমনি জাপানি শিক্ষার্থীরাও একইভাবে আমাদের সামনে তাঁদের গবেষণা ও পড়ালেখার নানা দিক তুলে ধরেছেন। আমরা নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি।’

এ ধরনের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিময় প্রকল্প ছাড়াও একাডেমিক বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক সভা, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং, দলগত কাজ, পাবলিক স্পিকিংসহ নানা বিষয়েই বিভিন্ন দেশের তরুণেরা একত্র হন একেকটি সম্মেলনে। তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা বেশ কিছু সংগঠনও এ ধরনের উৎসবের আয়োজন করে।

কীভাবে খোঁজ পাব
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যাঁরা বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাঁদের জন্য বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নেওয়া খানিকটা সহজ। এসব কার্যক্রমের সুবাদে একটা ‘নেটওয়ার্ক’ তৈরি হয়। খোঁজখবর জানা যায়।

পছন্দের বিষয় অনুযায়ী গুগলে সার্চ করলেও অনেক সম্মেলনের খবর পাবেন। ধরুন, আপনার রোবটিকস নিয়ে আগ্রহ। গুগল সার্চ করলে দেখবেন, সামনে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন আছে। সব কটি হয়তো আপনার জন্য জুতসই নয়। হয়তো আপনাকে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। হাতে যদি সময় থাকে, এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দিন। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা সিনিয়রদের কাছ থেকে সহায়তা পেতে পারেন।

সভা, সম্মেলন, কর্মশালা, বৃত্তি, ফেলোশিপ ইত্যাদির খোঁজখবর রাখার একটা ভালো জায়গা ইয়ুথ অপরচুনিটিজ। ইয়ুথ অপরচুনিটিজের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে নিয়মিত বিভিন্ন সম্মেলনের খবর পাওয়া যায়। মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের তরুণ ওসামা বিন নূরের সঙ্গে। ওসামা বললেন, ‘ইয়ুথ অপরচুনিটিজ বর্তমানে তরুণদের এই সুযোগগুলো জানানোর একটা বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। যারা এই সম্মেলনগুলো সম্পর্কে জানেন, অনেকেই আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখে পাঠান, ই-মেইল করেন। আমরা সেগুলো ফেসবুক পেজের মাধ্যমে জানিয়ে দিই। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থারও যোগাযোগ আছে। তারা নিয়মিতই তাঁদের আয়োজনগুলো সম্পর্কে আমাদের জানান। সব মিলিয়ে একটা বিশাল কমিউনিটি হয়ে গেছে।’ ওসামা জানালেন, সম্প্রতি ইয়ুথ অপরচুনিটিজের একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছেন তাঁরা। গুগল প্লেস্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে নিলে খোঁজ রাখা সহজ হবে।

a8e8a67623163bdba22e8a12abc00589-59050e2357bbcকী কী সম্মেলন, কাদের জন্য
ইয়ুথ অপরচুনিটিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন নূর বলছিলেন, ‘প্রতিটা প্রোগ্রামেই আবেদনকারীর কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা থাকে। শিক্ষার্থীরা সে অনুযায়ী আবেদন করতে পারেন। একাডেমিক বিষয়গুলো নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে শুরু সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নেন। আবার বিভিন্ন ইয়ুথ ফেস্ট, ফোরাম কিংবা অ্যাসেম্বলি—এ ধরনের আয়োজনে সবাই অংশ নিতে পারেন।’

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের তড়িৎ কৌশল বিভাগের সাবেক ছাত্র নাসিম আল ইসলাম যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন আইট্রিপলইর আঞ্চলিক কংগ্রেসে অংশ নিতে। এই কংগ্রেস সবার জন্য ছিল না। আইট্রিপলইর আঞ্চলিক শাখাগুলোতে যাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের জন্যই ওই আয়োজন। আবার বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সাফির আবদুল্লাহ সম্প্রতি মালয়েশিয়ার মেলাকা থেকে ঘুরে এলেন। তিনি অংশ নিয়েছিলেন ‘এশিয়ান ইয়ুথ আরবান এম্বেসি’ নামের আয়োজনে। এই সম্মেলন কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল না। ‘শহর উন্নয়ন’-এর ওপর একটি থিম দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন বিষয়ে পড়ুয়া আগ্রহী শিক্ষার্থীরা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। ওদিকে বুয়েটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের মিত্রশ্রী দেব টেক্সাসে অংশ নিয়েছিলেন ‘দ্য গ্রেস হপার সেলিব্রেশন অব উইমেন ইন কম্পিউটিং’ নামের সম্মেলনে। এই সম্মেলন ছিল শুধু কম্পিউটার প্রকৌশলে অধ্যয়নরত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য।

সীমানা ছাড়ানো বন্ধুত্ব
যেকোনো সম্মেলনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাই শিক্ষার্থীদের পেশাজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি নানা দেশের তরুণদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার আনন্দটাকেও বড় করে দেখেন তারা।

নিশাত নায়লা যেমন বলছিলেন, ‘প্রতিটা সম্মেলনই যেন নতুন নতুন বন্ধু বানানোর উপলক্ষ। বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন সংস্কৃতির তরুণদের সঙ্গে মিশলে যেমন তাদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি আমাদের দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কেও তাদের জানানো যায়।’ এই সুযোগে অন্য দেশের তরুণেরা পৃথিবীকে এগিয়ে নিতে কী ভাবছেন, কী করছেন, সে সম্পর্কে ধারণা হয়। চাইলে এই ভিনদেশি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়েও নতুন কোনো উদ্ভাবনের কাজ শুরু করা যেতে পারে।
সম্মেলনের সুযোগে শিক্ষার্থীদের দেখা হয়, কথা হয় বিশ্বের নামকরা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞজনদের সঙ্গে। সফল মানুষদের কথাও তরুণদের অনুপ্রাণিত করে।

সূত্র: প্রথম আলোfavicon59-4

Leave a Reply