দুই তরুণ গবেষকের মুক্তিসংগ্রাম

দুই তরুণ গবেষকের মুক্তিসংগ্রাম

  • ক্যাম্পাস ডেস্ক

খ্যাতিমান সাংবাদিক আফসান চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেন ফৌজিয়া আফরোজ ও জাকির হোসেন। তুলে আনেন মুক্তিসংগ্রামে গণমানুষের জীবন। সেগুলো গবেষণা শেষে বই আকারে প্রকাশিত হবে। তাঁদের কাছে শুনে লেখা হলো তাঁদের সেই জীবন।


২০১৩ সালের কথা। ফৌজিয়া আফরোজ তখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়তেন। তাঁদের একটি কোর্সের শিক্ষক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরী। এক ক্লাসে শিক্ষক বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেলে আমার সঙ্গে তাকে গবেষণার সুযোগ দেব। ’ সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করলেন ফৌজিয়া। গত চার বছর ধরেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছেন এই ছাত্রী। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে পড়েন।

গবেষণাজীবনের কথা বলতে গিয়ে ফৌজিয়া জানালেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ বলতে আমরা এত দিন রাজনীতি ও যুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের কথা জানতাম। কিন্তু আরো অনেক নতুন কিছু জেনেছি। এক নারীর কথা শুনেছি, তিনি গ্রামের বাজারে ভাতের হোটেল চালাতেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানোর অপরাধে তাঁর হোটেলটি রাজাকাররা ভেঙে দেয়। ভয়ে তাঁর স্বামী এলাকা ছাড়লেও অন্তঃসত্ত্বা সেই মহিলা বাড়ি ছাড়তে পারেন না। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা তাঁকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। এতে তাঁর সন্তানটি গর্ভেই মারা যায়। ’ গণমানুষের এমন অনেক ত্যাগের কথা, কষ্টের কাহিনি তিনি  জেনেছেন। শুনে নিজেও কেঁদেছেন। ফৌজিয়া আরো বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুরুষের লড়াইগুলোই আমাদের সামনে আসে। কিন্তু নারীর যে সংগ্রাম, সেগুলো তো আমরা জানি না। তাঁদের এই যুদ্ধের কথা ইতিহাসে আসা প্রয়োজন। ’

তাঁর মতো আরো এক ছাত্র গবেষকের নাম জাকির হোসেন। তিনি কাজ শুরু করেন মাস্টার্সে পড়ার সময় থেকে। জাকির তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়তেন। বিভাগের শিক্ষক আনিসুজ্জামান মানিকের সুবাদে আফসান চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়। গবেষণার জন্য রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগিশো, পালশা, বেলঘড়িয়াসহ আরো কয়েকটি গ্রাম ঘুরেছেন তিনি। গেছেন আরো নানা জায়গায়। দুর্গাপুর উপজেলায় গোপালচন্দ্র সরকারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। পেশায় তিনি ছিলেন গ্রাম্য ডাক্তার। মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসা করে সংসার চালাতেন। রিকশাচালক আনসার উদ্দিন থাকতেন অন্যের বাড়িতে। তখন তিনি বাড়ির কাজের লোক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে রাজাকারদের খবর এনে দিতেন। ১৯৭১ সালের ১৬ মে এক দিনে পাকিস্তানি বাহিনী যুগিশো ও পালশা গ্রামের ৪২ জন নিরীহ হিন্দু গ্রামবাসীকে মেরে ফেলে। সেদিন রেখার স্বামীও মারা যান। ফলে ১৩ কি ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েটি অসহায় হয়ে পড়েন। ছয় মাসের গর্ভবর্তী এই নারী খুব কষ্টে বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে ভারতের পথে রওনা দেন। না খেয়ে, ভারতের শরণার্থী শিবিরেও খাওয়া না পেয়ে এই গর্ভবতী নারীর শরীর ফুলে যায়, তিনি রাতকানা রোগে আক্রান্ত হন। এখনো তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। তাঁর শরীর ভালো নেই—এ কাজটি করতে গিয়ে এমন নানা গল্প জমে যাচ্ছে ফৌজিয়া ও জাকিরের জীবনের খাতায়। তাঁরা রেকর্ডারে সেগুলো বন্দি করে লিখে দিচ্ছেন স্যারকে। আর সেগুলোই বই আকারে প্রকাশ করছেন আফসান চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন তিনি। ১৯৭৮ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্র’ প্রকল্পেও ছিলেন। তৈরি করেছেন ‘তাহাদের মুক্তিযুদ্ধ’ নামের গণমানুষ নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র। ২০০৭ সালে তাঁর সম্পাদনা ও গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে চার খণ্ডের বই ‘বাংলাদেশ ১৯৭১’। তিনি বিবিসির জন্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাঁচটি রেডিও সিরিজও তৈরি করেছেন।

এখন তিনি ‘গ্রামের একাত্তর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একাত্তর’ নামের একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করছেন। খ্যাতিমান এই সাংবাদিক ২০০৬ সালে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। তার পরও তিনি গবেষণা থামিয়ে দেননি। ১৯৬৫ সালে তাঁর বাবা জি এম চৌধুরীকে উপহার দেওয়া শিল্পাচার্যের নিজের হাতে আঁকা ‘চাঁদপুরের নদীর ঘাট’ নামের অমূল্য ছবিটি দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। কেন এই গবেষণা আর ফৌজিয়ারা কী শিখছে—এই প্রশ্নের জবাবে আফসান চৌধুরী বলেন, গবেষণা করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে জানতে হয়। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে হলেও গবেষণা চালিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলে, কিন্তু গবেষণার জন্য টাকা দিতে চায় না। তরুণদের রাজনৈতিক ভাবনা থেকে দূরে থেকে এসব গবেষণা করতে হবে। ফৌজিয়া ও জাকির সেটিই শিখছে।

সূত্র: কালের কণ্ঠfavicon59-4

Leave a Reply