বিজ্ঞান বিষয়ের চাকরির বাজার

বিজ্ঞান বিষয়ের চাকরির বাজার

  • ক্যারিয়ার ডেস্ক

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়ানো হচ্ছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নানা বিষয়। আর বিষয়গুলোর মধ্যে বাছাই করা কয়েকটির চাকরির বাজার সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন এই প্রতিবেদন থেকে।


স্থাপত্য : বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন ও নগরায়ণের কারণে স্থাপত্য ক্ষেত্রে বড় জনবলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। সেদিকে লক্ষ রেখে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বিষয়টিতে পাঠদান শুরু করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্কিটেকচারের বিষয়ে কথা বলতে হলে আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আলাদা করে বলতেই হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রকৌশলের ছাত্রদের অন্যতম পছন্দ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। ব্র্যাক, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আর্কিটেকচার পড়ানো হয়। বিষয়টিতে পড়ার সুযোগ আছে সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়েও।

বিষয়টিতে লেখাপড়ার পদ্ধতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হয়েছে আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগের প্রভাষক জায়েদী আমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আর্কিটেকচার হচ্ছে অনেকটা স্টুডিওবেজড। এখানে আমরা যা কিছু শেখাই তার অনেকটাই স্টুডিওনির্ভর। অন্য কথায় বলতে গেলে একেবারে হাতে-কলমে শিক্ষা। ধরুন, আমি একজন ছাত্রকে একটা দালানের নকশা তৈরি করতে দিলাম। তখন ছাত্ররা ওই দালানটি কেমন হবে তা নিয়ে গবেষণা করে। যেমন—ঢাকার জন্য একরকম, খুলনার জন্য আরেক রকম, আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করেও আবার নকশায় পরিবর্তন আসে। এটা বের করার পর তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে আসলে এই কনটেক্সটে দালান হওয়া উচিত। এরপর তারা পরিকল্পনা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জুরি বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করে। গতানুগতিক থিওরি থেকে আমরা ডিজাইনের ওপরই বেশি ফোকাস করি। পাশাপাশি আমরা ফটোগ্রাফি, গ্রাফিকস আর্ট, পেইন্টিং, ইন্টেরিয়র—এসব বিষয়েও সম্যক ধারণা দিয়ে দিই। এতে একজন ছাত্রের জন্য ভবিষ্যতের অনেক দরজা খুলে যায়। অর্থাৎ ব্যাচেলর শেষ করে যদি কেউ ফটোগ্রাফিতে বা ফিল্মে বা গ্রাফিকস ডিজাইনিংয়ে চলে যেতে চায় যেতে পারে।’

এ বিষয়ের চাকরির বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন দিকেই উন্নয়ন চলছে, ঢাকা বাড়ছে, তাই এ বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্র আরো উন্মুক্ত হচ্ছে। তবে আমরা ছাত্রদের উৎসাহ দিই, যাতে তারা শহরকেন্দ্রিক না হয়ে মফস্বল বা গ্রামের দিকেও চলে যায়। এতে তাদের যেমন নতুন অভিজ্ঞতা হবে তেমনি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরি করার সুযোগ তো থাকছেই।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর শেখ রুবাইয়া সুলতানা বলেন, ‘আর্কিটেকচার বিষয়টিতে আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিই ডিজাইনের ওপর। এ বিষয়ে অর্ধেকের বেশিই থাকে ডিজাইননির্ভর শিক্ষা। আমরা চেষ্টা করি যে একজন ছাত্র যেন আমাদের এখানে পড়ে যাওয়ার পর একজন কমপ্লিট আর্কিটেক্ট হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা এখনো পুরোপুরি আবাসিক সুবিধা দিতে পারি না, তবে আমরা এক সেমিস্টার ছাত্রদের সাভারের ক্যাম্পাসে রাখি। সেখানে তারা জীবনের অনেক দিক সম্পর্কে ধারণা পায়। আর চাকরির ক্ষেত্রে বলতে গেলে এ বিষয়টিতে পড়ে যে শুধু চাকরিই করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ব্যক্তিগত জায়গা থেকেও কাজ করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং করেও আয় করা যায়। ফটোগ্রাফি, ফিল্মসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও চাকরি করার সুযোগ রয়েছে।’

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং: কম্পিউটারের যুগ হওয়ার কারণে এ বিষয়ে প্রকৌশলের চাহিদা অনেক। এই বিষয়টির দুটি পার্ট রয়েছে। একটি হচ্ছে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, যেটি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত। আরেকটি পার্ট হচ্ছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং। এটি প্রধানত কম্পিউটারের ভাষাবিষয়ক ইঞ্জিনিয়ারিং, বিভিন্ন জটিল গাণিতিক পদ্ধতিতে এই প্রকৌশল শেখানো হয়। দুটি ক্ষেত্রেই আছে সমান চাহিদা। তবে বাংলাদেশে প্রধানত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংই বেশি দেখা যায়।

এ বিষয়ে পড়ে চাইলে চাকরি না করেও অনেক কিছু করা যায়। যেমন—সফটওয়্যার বানানোর ফ্রিল্যান্সিং করে  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ডিজাইনসহ নানা ধরনের কর্মসংস্থান আছে এ বিষয়ে। কম্পিউটার বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান থাকায় এ বিষয়ে পড়ুয়া ছাত্ররা যেকোনো কম্পানির তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন পদে আবেদন করতে পারবে আর অফিস মানেই অনেক কম্পিউটার, তাই প্রতি অফিসেই একজন বা তার অধিক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের দরকার হয়। নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে জ্ঞান থাকলে চাকরির ক্ষেত্র আরো অনেক ব্যাপ্ত হয়।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং: প্রায় প্রতিটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়টি রয়েছে। চাকরিপ্রত্যাশী বেশি হওয়ায় এই বিষয়ে চাকরির জন্য প্রতিযোগীও বেশি। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের স্কুল অব সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রভাষক আশফাক ই আলম বলেন, এ বিষয়ে চাকরির ক্ষেত্র অনেক বড়, সরকারি ক্ষেত্রে পিডিবিসহ অন্যান্য পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানিতে যোগ দিতে পারবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের উঠতি সব ইলেকট্রনিকস কম্পানি, যেমন—ওয়ালটন, রানার প্রভৃতি কম্পানিতে এসব ইঞ্জিনিয়ারের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরেও এ বিষয়ের চাকরির সংখ্যাই বেশি। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক হওয়ার অপশন তো থাকছেই।

ফার্মাসি : কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়টি পড়ানো হয়। বায়োলজি ও মেডিক্যাল সায়েন্সের এ বিষয়টি কিছুটা মেডিক্যাল লেখাপড়ার মতো। এ বিষয়ের চাকরি প্রধানত ওষুধ কম্পানিগুলোতে হয়ে থাকে। এখানকার প্রধান কাজই হচ্ছে ওষুধ প্রযুক্তি। ব্যবসায় প্রশাসন বা পাবলিক হেলথে মাস্টার্স করে একজন ছাত্র চাইলে করপোরেট বা দাতব্য সংস্থায় চাকরি নিতে পারে।

গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন: গণিতে উচ্চশিক্ষা নিয়েও পড়ানোর পাশাপাশি করা যায় আরো কিছু। এখন অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিদেশের শিক্ষার্থীদের পড়ানো যায়। এ কাজ করে ঘরে বসেই গণিতবিদরা আয় করতে পারেন মোটা অঙ্কের টাকা। আবার গণিতের সঙ্গে কম্পিউটারবিজ্ঞানে ডিগ্রি যোগ করতে পারলে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানও লুফে নেবে। একই কাজ করা যায় পদার্থবিজ্ঞান ও ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান পড়েও। তবে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি নিতে পারলে গোটা পৃথিবীটাই হয়ে যাবে কাজের মস্তবড় বাজার। রসায়নে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন বড় গবেষণাগারের দায়িত্বও মিলবে।

অণুজীব বিজ্ঞান : অণুজীব বিজ্ঞানের চাকরির বাজারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। যত ধরনের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার সব কটিতেই এ বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের চাহিদা রয়েছে। আবার দেশের বাইরে নানা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কম্পানিতেও এ বিষয়ের চাকরির সুযোগ আছে। তবে এ বিষয়ে পড়ার জন্য সরকারি চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রয়েছে তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—নর্থ সাউথ, স্টামফোর্ড ও প্রাইম এশিয়া।favicon59-4

Leave a Reply