নার্সিং : সেবাধর্মী ক্যারিয়ার

নার্সিং : সেবাধর্মী ক্যারিয়ার

  • ক্যারিয়ার ডেস্ক

দিন দিন বাড়ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। নাগরিক ব্যস্ততায় পড়ে আমরাও পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারছি না। এ ক্ষেত্রে তাদের নিরবচ্ছিন্ন যত্নের একমাত্র নিশ্চয়তা দিতে পারেন কেবল নার্সই। এ ছাড়া নার্সিং পেশায় মানবসেবার পাশাপাশি অনায়াসে ভালো ক্যারিয়ার গড়া যায়।

বাংলাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে নার্সের চাহিদা। এই পেশার চাহিদাকে স্থান-কাল-পাত্রে সীমাবদ্ধ করা যায় না। দেশে সার্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, দিন দিন বাড়ছে আমাদের জনসংখ্যা, বাড়ছে হাসপাতাল। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নার্সের চাহিদাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী, একটি দেশে চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত হওয়া প্রয়োজন ১ : ৩। কিন্তু বাংলাদেশে এ অনুপাত ২ : ১। যেখানে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকা প্রয়োজন, সেখানে আমাদের দু’জন চিকিৎসকের বিপরীতে পাওয়া যায় একজন নার্স। শুধু আহত, অসুস্থ এবং পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরাই নন, নার্সিং সেবা প্রয়োজন অন্যদেরও।

নাইটিঙ্গেলের হাত ধরে
নার্সিংয়ের ইতিহাসে বৈপ্লবিক উন্নয়ন ও পরিবর্তন সাধিত হয় ঐতিহাসিক ক্রিমিয়ার যুদ্ধে। বিশ্বখ্যাত ইংরেজ নার্স ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নার্সিংয়ের পেশাদারি পর্যায়ের শুরুটা করেন। তার প্রণীত ‘নোটস অন নার্সিং’ বইটিকে এই বিষয়ে পথিকৃৎ মনে করা হয়। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ে নার্সদের নিবন্ধিত করা হয়। নব্বইয়ের দশকে নার্সদের ওষুধ দেওয়া, ডায়াগনস্টিক, প্যাথলজি পরীক্ষাসহ রোগীদের প্রয়োজনে অন্য পেশাদারি স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের কাছে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়।

নার্স হতে চাইলে
বিএসসি ইন নার্সিং ডিগ্রি নিয়ে পেশাদার নার্স হওয়া যায়। উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিএসসি ইন নার্সিংয়ে ভর্তি হতে হবে। তবে এ জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় নূ্যনতম জিপিএ ২.৫০ পেতে হবে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা নার্সিংয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেলেও মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্যও এ সনদ লাভের পথ খোলা। সরকারি কলেজগুলোয় ভর্তি সাধারণত জিপিএর ভিত্তিতেই হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পরই ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়।

সরকারি নার্সিং কলেজ
বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে সাতটি বেসিক বিএসসি নার্সিং কলেজে এ কোর্স চালু আছে। কলেজগুলো হলো- ঢাকা নার্সিং কলেজ, ময়মনসিংহ নার্সিং কলেজ, রাজশাহী নার্সিং কলেজ, চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজ, রংপুর নার্সিং কলেজ, সিলেট নার্সিং কলেজ ও বরিশাল নার্সিং কলেজ। এ ছাড়া চাকরির বাজারে বাড়তি চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নার্সিংয়ের ওপর কোর্স চালু করেছে।

আবেদন ও ভর্তি
এসব কোর্স করানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকে। ধাপে ধাপে কয়েকটি পরীক্ষা, যেমন- লিখিত, মৌখিক ও ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান ইত্যাদি বিষয় থেকে প্রশ্ন করা হয়।
এসব পেশায় মেয়েদের পাশাপাশি ১০ শতাংশ ছেলেদেরও ভর্তির সুযোগ আছে।

কাজের ক্ষেত্র
নার্সিং বিষয়ে পড়া শেষ করে দেশ-বিদেশসহ প্রায় সব জায়গায়ই ক্যারিয়ার গড়া যায় অনায়াসে। দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, হোটেল, মোটেল, এনজিও, এমনকি পর্যটন করপোরেশনেও ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে নার্সিংয়ে বিএসসি ও CFNS বা Commission on Graduates of Foreign Nursing Schools-এর পরীক্ষায় পাস করে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সহজেই কাজ করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় দুই হাজার নার্স সৌদি আরব, লিবিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ১৩টি দেশে কর্মরত। নার্সিং পেশার সম্ভাবনার দিক বিবেচনা করে অনেক প্রতিষ্ঠানই নার্সিংয়ে পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল অর্ডিন্যান্স নং LXI-১৯৮৩ অনুযায়ী কাউন্সিল এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান নার্সিং বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, ভর্তি, সনদ প্রদান ইত্যাদি কাজ করতে পারবে না। কাজেই কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেনে নিন সেই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কি-না।

বেতন-ভাতা
নার্সিং এমন একটি পেশা, যেখানে উপার্জনের পাশাপাশি সেবার মনমানসিকতা বড় ভূমিকা পালন করে। তাই এ বিষয়ে পড়ার মাধ্যমে যেমন মানবসেবার সুযোগ ব্যাপক, তেমনি হাতছানি দিয়ে ডাকে ভালো ক্যারিয়ারও। নার্সিং পেশায় বর্তমানে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আগের তুলনায় বেড়েছে কয়েক গুণ। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় নার্সের ঘাটতি থাকায় এ পেশায় পড়াশোনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা শতভাগ। নার্সিং পেশায় বেতনের পাশাপাশি আছে ওভারটাইমের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ। নিবন্ধনকৃত ও অভিজ্ঞ নার্সদের জন্য আছে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান নার্সদের পরিবারকেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়। এ ছাড়া নার্সদের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জীবন বীমার সুবিধাসহ অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকায় বর্তমানে নার্সরা আগের চেয়ে সচ্ছলতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। এ বিষয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের সব জায়গায়ই ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। বিদেশে নার্সিংয়ে বিএসসি পাস করে ঈঋঘঝ-এর পরীক্ষা সম্পন্ন করে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সহজেই কাজ করা যায়।

নিশ্চিত চাকরি
সরকারি নার্সিং কলেজগুলো থেকে বিএসসি ইন নার্সিং কোর্স করতে চাইলে খরচ পড়ে এক লাখ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকার মতো। আর বেসরকারি কলেজগুলোতে খরচ হয় চার বছরে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মতো। তবে বেসরকারি পর্যায়ের কলেজগুলোতে খরচ প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। আর সরকারি কলেজগুলোতে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং করতে কোর্স ফি নেয় না। প্রতি মাসে উল্টো টাকা দেয় ভাতা হিসেবে।

কাজেই নিশ্চিত চাকরির কথা ভেবে এবং মানবসেবার মতো মহৎ পেশার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে নার্সিং পেশাকে বুকে টানতে আজই নেমে পড়ূন এই ব্যতিক্রম ক্যারিয়ার রুটে। এখানে মানবতার জয়ধ্বনি শোনা যায়!favicon59-4

Leave a Reply