যেভাবে চাকরি পেলাম

যেভাবে চাকরি পেলাম

  • ফারুক হোসেন

এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। প্রথম বছর কিছু বুঝতে না বুঝতেই কেটে গেল। সব সময় বড় ভাইদের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলতেন মেজো ভাই। ধীরে ধীরে পরিচিত হলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন চাকরি পরীক্ষার্থী বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই বিসিএস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির কথা মাথায় ঢুকে যায়। তাঁরা বলতেন, গণিত আর ইংরেজি ভালো জানলে চাকরির অভাব হবে না। আর এই দুটিতে ভালো করার সংক্ষিপ্ত কোনো পথ নেই। একাডেমিক পড়ার ফাঁকে এই দুটির ভিত্তি গড়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁরা।

স্কুলবেলা থেকেই ইংরেজির দুর্বলতা কাটানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। অর্থনীতিতে পড়ার কল্যাণে পড়াশোনাও করতে হয়েছে ইংরেজি মাধ্যমে। তাই ইংরেজিভীতিটা কেটে গিয়েছিল। ইন্টারমিডিয়েট থেকেই টিউশনি করতাম। ফলে একাডেমিক ম্যাথও মুখস্থের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চাকরির ম্যাথ তো আসে ইংরেজিতে। তাহলে উপায়? ভাইয়ের পরামর্শে কিনে ফেললাম সাইফুরস ম্যাথ। একাডেমিক পড়ার ফাঁকে ম্যাথ সলভ করতে শুরু করলাম। কিছুদিনের মধ্যেই নিজের পরিবর্তন নিজেই লক্ষ করলাম। আত্মবিশ্বাস তৈরি হলো।

অনার্স শেষ করেই চাকরির আবেদন শুরু করলাম। চাকরি না হোক, অন্তত মডেল টেস্ট তো দিতে পারব। মাস্টার্সের পড়াশোনা, আর ফাঁকে ফাঁকে চাকরির প্রস্তুতি। মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। নিয়োগ পরীক্ষার বই কিনে পড়া শুরু করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাড়ার পর মেসে উঠলাম। মেসে থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিপ্রার্থী বড় ভাইয়েরা। পড়ার সময় কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে তাঁদের পরামর্শ নিতাম। টিউশনি করতাম। পড়াতাম ইংরেজি আর গণিত। নিজে যা পড়তাম, স্টুডেন্টকে বোঝাতে গিয়ে আবার পড়া হয়ে যেত।

প্রথম কয়েকটা পরীক্ষায় ব্যর্থ হলাম। হতাশ হয়ে পড়লাম। মেজো ভাই বললেন, ‘নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করে চেষ্টা করো। হতাশ হয়ো না, ভালো কিছুই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ’ মেসের বড় ভাইয়েরাও সাহস দিলেন। চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। গণিতের প্রস্তুতির জন্য শেষ করেছিলাম জিআরই, জি ম্যাটের বই। আর ইংরেজির জন্য বিসিএসের বইগুলোর পাশাপাশি ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষার বই একটা একটা করে পড়ে ফেললাম। সমাধান করতাম বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন।

একটা বিষয় মাথায় রাখতাম, বাংলা, সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, কম্পিউটার—এগুলোর পরীক্ষা মোটামুটি সবারই কমবেশি সমান হয়। আসল পার্থক্য হয় গণিত আর ইংরেজিতে। তার মানে এই না যে এসব বিষয় একদম বাদ দিয়েছি। এরই মধ্যে ফল পেতে শুরু করলাম। চাকরি পেলাম শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে। অগ্রণী ব্যাংকেও সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি হয়ে গেল, পোস্টিং নিজ জেলা ঝিনাইদহ। যোগ দিলাম অগ্রণী ব্যাংকে।

পরীক্ষা দেওয়া ছিল এক্সিম ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংকে। আবেদন করা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিসিএসে। অগ্রণী ব্যাংকে চাকরিরত অবস্থায় বুঝতে পারলাম, আমি আমার ট্র্যাক থেকে সরে যাচ্ছি। ঢাকা থেকে দূরে আছি। মনে হলো, সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না। পরীক্ষা দিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে। অংশ নিলাম ৩৩তম বিসিএসেও। এর মধ্যে আগের তিনটি ব্যাংকের যোগদানপত্রই হাতে এলো। তিন মাসের মাথায় অগ্রণী ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে যোগ দিলাম এক্সিম ব্যাংকে। পোস্টিং হলো ঢাকায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। টিকে গেলাম। সামনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাইভা, আবার ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা। সঙ্গে চাকরি তো আছেই। মতিঝিলে অফিস হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় প্রতিদিনই দেখা হয়ে যায়। আর ব্যাংকে চাকরি করার কারণে ব্যাংকিং সেক্টরের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির নেশাটা পুরোপুরি পেয়ে বসল। শুরু করলাম ভাইভার প্রস্তুতি। অফিস থেকে ফেরত এসে রাতের খাবারের পর রাত জেগে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। প্রায় দিনই ভোর ৪টা পর্যন্ত পড়াশোনা করতাম। যেহেতু আমি অর্থনীতির ছাত্র, আর ভাইভা বাংলাদেশ ব্যাংকের। তাই অর্থনীতি, ব্যাংকিং সেক্টর, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজেট, অর্থনৈতিক সমীক্ষা—এসবের ওপর গুরুত্ব দিলাম বেশি। পরীক্ষার আগের রাতে অর্থনৈতিক সংবাদগুলো অনলাইন সংবাদপত্রে পড়ে নিলাম। ভাইভা দুপুরের পর। সকালে অফিসে গেলাম। দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাচ্ছি বলে বের হলাম। অর্থনীতি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন জানতে চাইলেন ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা। কোনো ধরনের ভয়ডর ছাড়াই ভাইভায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বের হলাম। এরপর ফলাফলের অপেক্ষা। সঙ্গে চলল বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি। লিখিত পরীক্ষা দিলাম, কোয়ালিফাই করলাম। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফল ঘোষণা হলো। সেখানেও টিকে গেলাম। এক্সিম ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে যোগ দিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকে। চাকরিরত অবস্থায় বিসিএসের ভাইভা দিলাম। পেলাম শিক্ষা ক্যাডার। ক্যাডার সার্ভিসে যোগ না দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকেই রয়ে গেলাম। তিন বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে আমি এখন উপ-পরিচালক।

লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালক

সূত্র: কালের কণ্ঠfavicon59-4

Leave a Reply