তোমরা যারা মেডিকেলে পড়তে চাও

তোমরা যারা মেডিকেলে পড়তে চাও

  • ক্যারিয়ার ডেস্ক

নীরবে নিভৃতে এক ‘যুদ্ধের’ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশের প্রায় এক লাখ তরুণ। এই যুদ্ধের নাম—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা! চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাঁরা এখন দিন-রাত পড়ার বইয়ে বুঁদ হয়ে আছেন, তাঁদের জন্য লিখেছেন গত বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী রিজভী তৌহিদ


 মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছে ছিল সেই ছোটবেলা থেকে। তখন ডাক্তারদের অবাক হয়ে দেখতাম, আর ভাবতাম, একদিন আমিও তাঁদের মতো অ্যাপ্রোন পরব। তা ‘পরতে’ হলে যে আগে ‘পড়তে’ হবে, সেটা জানতাম খুব ভালোভাবে। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ময়মনসিংহের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোমেনশাহী থেকে ২০১৪ সালে মাধ্যমিক পাস করেছি। আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছি ২০১৬ সালে।

কলেজে পড়ার সময় মা প্রায়ই বলতেন, ‘দেখিস, মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় তুই ফার্স্ট হবি।’ আমি হাসতাম। ভাবতাম, এ কথা বোধ হয় সবার মা-ই বলেন। ‘ফার্স্ট’ হওয়া নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। তবে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ আমি পাব—এই আত্মবিশ্বাস ছিল সব সময়। ঢাকার বাইরের স্কুল-কলেজে পড়েছি। কিন্তু আমাদের শিক্ষকেরা আমাদের এমনভাবে তৈরি করেছেন যে ঢাকার ছেলেমেয়েদের চেয়ে পিছিয়ে আছি—এই ভাবনা কখনোই মাথায় আসেনি। এর আগেও আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বুয়েট-মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছে। তাই আমার মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল জেদ। মেডিকেলের প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষাগুলোর কোনো একটায় প্রথম না হয়ে দ্বিতীয় হলেই সেই জেদ আরও বাড়ত। আরও উদ্যম নিয়ে পড়া শুরু করতাম।

0ebf2512d65bd1dadc206087ef039edb-59612094135db
রিজভী তৌহিদ। ছবি: সংগৃহীত

ভর্তি পরীক্ষা দিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম, যদি কোনো অঘটন না ঘটে, তাহলে আমি চান্স পাব। ফার্স্ট হব কি হব না, এসব ভাবনা মাথায় ছিল না। তবে আমার মায়ের তখনো একই কথা। ফলাফল প্রকাশের আগের দিনও বলছিলেন, ‘দেখিস, তুই ফার্স্ট হবি।’ আমার মধ্যে একটা ধারণা ছিল, আমি ভাবতাম একটা কথা বলে ফেললে সেটা আর সত্যি হয় না। তাই মায়ের ওপর একটু বিরক্তই হয়েছিলাম। ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলো, দেখা গেল মায়ের কথাই ঠিক। আমি প্রথম হয়েছি! সেদিনের আগে মাকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। এখন ভাবতে অবাক লাগে, ছোটবেলায় যেই অ্যাপ্রোন পরা মানুষগুলোকে অবাক হয়ে দেখতাম, এখন আমিও তাঁদের একজন। এখনো তেমন কিছুই শিখিনি। তবু হাসপাতালে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা ভাই, অমুক টেস্টটা কোথায় গেলে করা যাবে?’ তাঁকে যখন দিকনির্দেশনা দিয়ে দিই—এটুকু সাহায্য করতেও ভালো লাগে। গ্রামে আমার স্বজন, প্রতিবেশীরা অতশত বোঝেন না। তাঁরা ভাবেন মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মানেই বিরাট ডাক্তার হয়ে যাওয়া! বাসায় গেলে আমার কাছে নানান অসুখ-বিসুখের কথা বলতে আসেন। আমি বলি, ‘ভালো ডাক্তার দেখান। আর আমার কাছ থেকেই চিকিৎসা নিতে চাইলে আরও কয়েক বছর অসুখটা ধরে রাখুন!’

মেডিকেলে ভর্তির জন্য যারা প্রস্তুতি নিচ্ছ, আমার পরামর্শ তোমাদের কাজে আসবে কি না, জানি না। তবু নিজের মতো করে ১০টি পরামর্শ দিলাম। তোমাদের জন্য শুভকামনা।

 দশ পরামর্শ

১. সুস্থ থাকো

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সুস্থ থাকা। পড়তে পড়তে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম ছেড়ে দেওয়াটা খুবই বোকামি। এখন অনেকেরই চিকুনগুনিয়া হচ্ছে, তাই মশারি টানিয়ে ঘুমাও। সতর্ক থাকো। এসব ব্যাপারে একেবারেই অবহেলা করা যাবে না। অসুস্থ হয়ে দুদিন বিছানায় পড়ে থাকলে সেটাও কিন্তু অনেক বড় ক্ষতি।

 ২. স্বপ্ন দেখো

তুমি মেডিকেল কলেজে পড়ছ, তুমি ডাক্তার হয়েছ—মনে মনে এই দৃশ্য বারবার দেখো। স্বপ্ন না থাকলে স্বপ্ন পূরণের জেদ থাকবে না।

 ৩. সিলেবাস ভাগ করে নাও

তোমার সুবিধামতো সিলেবাসটাকে ভাগ করে নাও। কবে কী পড়বে, কতক্ষণ পড়বে, সেটা নিজের মতো করে সাজিয়ে নাও।

 ৪. সাধারণ জ্ঞান ও ইংরেজিকে অবহেলা কোরো না

সাধারণ জ্ঞান আর ইংরেজিতে নম্বর কম বলে অনেকে অবহেলা করে। সেটা করা যাবে না একদমই। সাধারণ জ্ঞান আর ইংরেজির জন্য প্রতিদিনই একটু একটু করে পড়তে হবে। আমি ভালো ইংরেজি পারি—এই বিশ্বাস থেকে ইংরেজির ওপর জোর না দেওয়া ঠিক হবে না। ইংরেজির জন্য বিসিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো দেখতে পারো। আর প্রচুর চর্চা করো।

 ৫. কী পড়ব, কোথা থেকে পড়ব

প্রতিটি বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হবে। আগের বছরের প্রশ্নগুলোতে যা এসেছে, সেগুলো তো বারবার পড়বেই, অন্য বিষয়গুলোও পড়তে হবে। যেগুলো তুমি ভুলে যাও, সেগুলো দাগিয়ে পড়া উচিত। বৈশিষ্ট্য, শর্ত, উদাহরণ, পার্থক্য, ব্যতিক্রমগুলো বেশি করে পড়তে হবে।

 ৬. তোমার দুর্বলতা তুমিই জানো

কোন বিষয়ে তুমি দুর্বল, সেটা তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো। একেকজনের পড়ার ধরন একেক রকম। তোমার ধরনটা তুমিই খুঁজে বের করো। সেভাবেই প্রস্তুতি নাও।

 ৭. পরীক্ষার আগে পরীক্ষা দাও

প্রচুর প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা দিতে হবে। আগের বছরের প্রশ্নগুলো বারবার সমাধান করো। নিজেই নিজের পরীক্ষা নাও। প্রতিটি পরীক্ষাই মূল পরীক্ষার মতো গুরুত্ব নিয়ে দাও।

 ৮. পরীক্ষার কৌশল

গাণিতিক বিষয় বা যেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় লাগবে, সেগুলো পরে দাও। প্রথমে একবার চোখ বুলিয়ে যদি মনে হয়, এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে তোমার ভাবতে হবে, তাহলে পরের প্রশ্নে চলে যাও। একটার উত্তর দিতে গিয়ে যদি তিন-চার মিনিট সময় নিয়ে ফেলো, দেখা যাবে শেষের দিকে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর করতে পারবে না। যত দ্রুত সম্ভব সবগুলো প্রশ্ন পড়ে ফেলতে হবে। প্রথমবার পড়ার সময় কঠিন মনে হলেও অনেক সময় দ্বিতীয়বার প্রশ্ন সহজ মনে হয়।

 ৯. স্নায়ুচাপ নেওয়া যাবে না

ভর্তি পরীক্ষাকেও আর দশটা পরীক্ষার মতোই নিতে হবে। স্নায়ুচাপ নেওয়া যাবে না। প্রবেশপত্র, সময়মতো পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারা, এসব নিয়ে যেন তোমাকে ভাবতে না হয়। সব গুছিয়ে রাখো।

 ১০. ফেসবুক থেকে দূরে থাকো

পরীক্ষার আগের কয়েকটা দিন ফেসবুক বা অনলাইনের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকাই ভালো। কয়েক দিন বন্ধ রেখে দেখো, উপকারটা নিজেই টের পাবে।

সূত্র: প্রথম আলোfavicon59-4

Leave a Reply