বিদেশি কালচারাল সেন্টারের খোঁজ খবর

বিদেশি কালচারাল সেন্টারের খোঁজ খবর

  • ক্যারিয়ার ডেস্ক

অবসরে কী করেন আপনি? হয়তো বলবেন- যান্ত্রিক জীবনে অবসর আর কোথায়? ব্যস্ততা প্রতিনিয়ত ঘাড়ে চেপে বসে জীবনটা বোরিং করে তুলেছে। এমন ভাবনায় যদি বুঁদ থাকেন তবে আপনাকেই বলি, জীবন কখনও বোরিং হয় না। আমরাই বোরিং করে তুলি। ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা অফিসের কাজে বিপর্যস্ত? বাসায় গিয়েও নানা কাজে হয়তো বোরিং হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বলি, এই ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারেন ছুটির দিন। যে কোনো ছুটির দিনে কিংবা রুটিন করে কয়েক বন্ধুকে ফোন করে নিয়ে আসুন চেনাজানা কোনো ক্যাফেটোরিয়ায়। আপনার সৃজনশীলতায় শান দেওয়ার জন্য এখানে করতে পারেন বিভিন্ন কোর্স। বসতে পারেন আড্ডায়। কফিতে চুমুক দিয়ে পুরনো দিনের গল্পে ডুব দিতে পারেন। দেখবেন দূর হয়ে যাচ্ছে বাস্তব জীবনের ক্লান্তি আর মন খারাপের ভাবনাগুলো। আর নিজেকে উপস্থাপন করতে পারছেন নতুন করে। শহরে গড়ে ওঠা বিদেশি এমন কিছু কালচারাল সেন্টারের খোঁজ জেনে নিই, চলুন:


শহরে অন্য আকাশ
ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় কিংবা নিজের সৃজনশীলতায় শান দেওয়ার জন্য অথবা নিজেকে আরও ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য বিদেশি কালচারাল সেন্টারগুলোর ভূমিকা অনন্য। শুধু তাই নয়, আপনি যদি হন গল্পবাজ কিংবা আড্ডাবাজ; তার জন্যও চাই একটু ব্যতিক্রম পরিবেশ। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আড্ডার জন্য অবশ্যই খোলা ময়দান ভালো। যেখানে বসে দেখতে পারবেন দিগন্ত মিশে যাওয়ার দৃশ্য। সবুজে নাক ডুবিয়ে হতে পারবেন মুগ্ধ। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে একঝাঁক বুনো পাখি। কিন্তু হায়! ঢাকা শহরে পাবেন কোথায় এমন পরিবেশ? সুতরাং এই চিন্তা বাদ দিয়ে অন্য কিছু ভাবতে পারেন- নিরিবিলি পরিবেশ, হালকা মিউজিক, আশপাশে মনমাতানো পরিবেশ, রঙের বাহার আর স্নিগ্ধতা। ভাবছেন এমন পরিবেশ কোথায়? বলি, শহরে গড়ে ওঠা বিদেশি কালচারাল সেন্টারগুলোতে বসে কফির মগে চুমুক দিয়ে মুগ্ধ হতে পারবেন। ভালো লাগা আপনাকে স্পর্শ করে যাবে নিমিষেই।

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ
যদি নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করতে চান আর আড্ডার সত্যিকারের স্বাদ পেতে চান, তবে যেতে পারেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ বা তাদের ক্যাফে লা ভ্যারান্ডাতে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের এই ক্যাফেটোরিয়া আকর্ষণীয়, মুগ্ধকর এবং আড্ডার উপযুক্ত স্থান। প্রতি রোববার তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। এ ছাড়া সপ্তাহের সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২.৩০ থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বাংলাদেশে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ও পরিচিতির জন্যই আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার প্রতিষ্ঠা। এটি ফরাসি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক পরিচালিত হয়ে থাকে। এখানে ফ্রেঞ্চ ভাষার কোর্স করানো হয় বিভিন্ন লেভেলে। তাছাড়া এই সেন্টারটির ধানমণ্ডি শাখায় ভাষা কোর্স ছাড়াও আরও নয়টি কোর্স করানো হয়। কোর্সগুলোর মধ্যে ভায়োলিন এবং সেলো ওয়ার্কশপ, ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ, পিয়ানো, গিটার, থিয়েটার, মিউজিক কম্পোজিশন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন এস্ট্রোনমি, মডার্ন ড্যান্স অন্যতম। নতুন সেশন শুরু হয় জানুয়ারি, এপ্রিল, জুলাই ও অক্টোবর মাসে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে উত্তর দিকে ১ মিনিট হাঁটার দূরত্বে সিটি কলেজ সংলগ্ন এটির অবস্থান। ল্যাব এইডের ঠিক বিপরীতেই। এ ছাড়াও তাদের আরও দুটি শাখা রয়েছে বারিধারার এক নম্বর রাস্তার দুই নম্বর বাড়ি অ্যানেক্সে। আর উত্তরা শাখাটি হচ্ছে ছয় নম্বর সেক্টরের ঈশা খাঁ এভিনিউর ১৫ নম্বর বাড়ি।  হৈ-হট্টগোল, হাসাহাসি, গান-কবিতা সব চলতে পারে এই চমৎকার ক্যাফেটারিয়াতে। আপনাকে মুগ্ধ হতেই হবে ক্যাফে লা ভ্যারান্ডাতে এসে। সম্পূর্ণ ফ্রান্সের এনভায়রনমেন্ট অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে এই ক্যাফেটারিয়াটি। অসাধারণ বললে কম বলা হয়। ব্যাকগ্রাউন্ড কোয়ালিটি মিউজিক, হালকা আলো, মনোমুগ্ধকর স্নিগ্ধতার ছোঁয়া আপনাকে আড্ডাপ্রিয় করে তুলবেই।

ব্রিটিশ কাউন্সিল
এখানে আছে ব্রিটিশ কাউন্সিল রিসোর্স সেন্টার। ভেতরে বড়সড় লাইব্রেরি, মুভি কালেকশন, তথ্যকেন্দ্র এবং সাজানো-গোছানো মনোরম ক্যাফেটোরিয়া। ব্রিটিশ কাউন্সিলের গ্রন্থাগারে ১৫ হাজারেরও বেশি বই ৮০ হাজার ই-বুক এবং প্রায় ১৪ হাজার জার্নাল আপনার অপেক্ষা করছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সদস্য হয়ে এসব বই লাইব্রেরিতে পড়ার পাশাপাশি বাসায়ও নিয়ে আসতে পারেন। এ ছাড়া ছোট থেকে শুরু করে বয়স্ক, চাকরিজীবীসহ ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে ইংরেজিসহ বিভিন্ন কোর্স। বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতিও নিতে পারেন এখান থেকে। এ ছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিলের বাইরের রাস্তাও নিরিবিলি। ক্যাফেটারিয়া ছোট হলেও কাজের ফাঁকে চমৎকার আড্ডা দিতে পারেন।

ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার
এখানে রয়েছে চমৎকার একটি অডিটোরিয়াম এবং লাইব্রেরি। এদের ক্যাফেটারিয়াও অসাধারণ। তা ছাড়া এখানে প্রতি মাসেই বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রাম হয়ে থাকে। ক্লাসিক্যাল ড্যান্স, সেতার, তবলাসহ বিভিন্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম রয়েছে তাদের। কাজের ফাঁকে চমৎকার আড্ডা জমে উঠতে পারে বন্ধুদের সঙ্গে। প্রথম প্রথম হয়তো একটু অন্যরকম লাগবে। তবে ভালো লাগার ব্যাপারটা ধীরে ধীরে বেড়ে যাবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাংলাদেশি ও ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদানের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ১১ মার্চ ইন্ধিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের যাত্রা শুরু। এখানে হিন্দি ভাষা শিক্ষার কোর্সের পাশাপাশি লাইব্রেরিতে জার্নাল, ম্যাগাজিন, ভারতীয় ইতিহাস সংস্কৃতি, একাডেমিক, সাহিত্য, শিল্পকলা রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন বই পড়তে পারেন। শুক্র ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই প্রতিষ্ঠান। ধানমণ্ডির দুই নম্বর রোডের ২৪ নম্বর বাড়িতে এর অবস্থান। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অফিস ধানমণ্ডি হলেও লাইব্রেরি এবং অডিটোরিয়াম গুলশান ১-এর ২৪ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত।

আমেরিকান কালচারাল সেন্টার
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আমেরিকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ প্রদানের ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালে আমেরিকান সেন্টার বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য হয়ে নিতে পারেন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। এখানে স্টুডেন্ট ভিসা প্রসেসিংয়ের পাশাপাশি লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়। প্রতি বুধবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত থাকে বিভিন্ন সেমিনার। এ ছাড়া আমেরিকান সেন্টারের সদস্যরা কোন ধরনের ফি ব্যতীত সাইবার সেন্টারের কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন। শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকে আমেরিকান কালচারাল সেন্টার। এ ছাড়া রবি থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বারিধারা আবাসিক এলাকার প্রগতি সরণির জে ব্লকে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান।

গ্যটে ইনস্টিটিউট
জার্মান কালচারাল সেন্টার বা গ্যটে ইনস্টিটিউটের সদস্য হয়ে ব্যবহার করতে পারেন লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে জার্মানি লিটারেচার লেকচার, ইতিহাস, সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, ম্যাগাজিন, পত্রিকা, নাটক, আর্টসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় ৫ হাজার বই রয়েছে। নিয়মিত দেখতে পারেন জার্মান চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রও। ভাষা, সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত হয় সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠান। করা হয় স্টুডেন্ট ভিসায় সহযোগিতা।

এ ছাড়া এখানে জার্মান ভাষা শিক্ষা, পিয়ানো, ড্যান্স, গিটার, তবলা ও ড্রাম প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানটিতে জার্মান চলচ্চিত্র প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, চিত্রাঙ্কন এবং তৈলচিত্র প্রদর্শনী হয়। সরকারি ছুটির দিন ও শুক্রবার বন্ধ থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া খোলা থাকে শনি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। মিরপুর রোডের পশ্চিম পাশে ধানমণ্ডি ক্লাব মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জার্মান কালচারাল সেন্টারের অবস্থান। আরও সহজে বললে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকার নয় নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাড়িতেই জার্মান কালচারাল সেন্টার।

মনের ডানা
কখনও হ্যাঁ, আবার কখনও না। সুতরাং আপনিই ঠিক করবেন আসলে আপনি কী চান? আপনি যদি নিজেকে নতুন করে উপস্থাপন করতে চান, অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে চান আর যদি আড্ডাকে সময় নষ্ট মনে না করেন, তবে আড্ডার প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন। আর কাজের ফাঁকে আড্ডা দিতে খুঁজে নিতে পারেন আড্ডা-কাজের যথাযথ স্থান। কাজের ফাঁকে নয়, মাঝে মাঝে শুধু শুধুই আড্ডা দিতে হয়।

আড্ডাহীন জীবন বড্ড বোরিং। বড্ড একরোখা। আর বোরিং থেকেই নানারকম মানসিক রোগের জন্ম হয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, কখনও বোরিং থাকা যাবে না। সবসময় হাসি-খুশি প্রাঞ্জল থাকতে হবে। আর হাসি-খুশি-প্রাঞ্জল থাকতে হলে আপনাকে অবশ্যই ঘরে-অফিসে-কাজে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার চক্করে আবদ্ধ হয়ে না থেকে কখনও কখনও আড্ডায়ও মেতে ওঠতে হবে। তা যদি হয় শহরে গড়ে ওঠা বিদেশি কালচারাল সেন্টারে, তবে তো কথাই নেই!

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply