ক্যারিয়ার গড়ি কুটির শিল্পে

ক্যারিয়ার গড়ি কুটির শিল্পে

  • ক্যারিয়ার ডেস্ক

সাব্বির জামান পড়াশোনা শেষ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনা শেষ করে সহপাঠী বন্ধুরা যখন চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে হা-হুতাশ করে ঘুরে ঘুরে হয়রান হচ্ছিলেন, তিনি ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ফিরে গেলেন নিজের গ্রামে। বন্ধুরা অবাক! সেটা বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তারপর সবাই ভুলে গেছেন সাব্বির জামানের কথা। কিন্তু কী হলো সাব্বির জামানের? কেন তিনি হুট করে তখন চাকরি না খুঁজে গ্রামে চলে গেলেন?

আসলে তিনি হুট করে গ্রামে যাননি। দীর্ঘ পরিকল্পনা আর একঝাঁক স্বপ্ন মাথায় নিয়েই গ্রামে গিয়েছেন। সেই স্বপ্নের নাম কুটির শিল্প। তার বন্ধুরা যখন স্বপ্ন দেখছিলেন একটা মাত্র চাকরির, তখন সাব্বির জামান স্বপ্ন দেখেছিলেন গ্রামের হাজারো অবলা নারীকে বলশালী করে তোলার। তাদের কাজে লাগিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার। সে জন্য গ্রামে গিয়ে কুটির শিল্প ছাড়া উপায় ছিল না।

প্রথম পাঠ
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী কুটির শিল্প এ রকম- ‘যে শিল্প কারখানা একই পরিবারের সদস্য দ্বারা পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত এবং পারিবারিক কারিগর খণ্ডকালীন বা পূর্ণ সময়ের জন্য উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকেন এবং যে শিল্পে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হলে ১০ জনের বেশি এবং শক্তিচালিত যন্ত্র ব্যবহৃত না হলে ২০ জনের বেশি কারিগর উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকে না, তাই কুটির শিল্প।’

5564অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি না থাকলে অনূর্ধ্ব ৫০ শ্রমিক নিয়োজিত কারখানাকেও কুটির শিল্প হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। আবার বাংলাদেশ কৃষিশুমারির মতে, যেসব কারখানার জমি ও কারখানার মূল্য ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য ৫ লাখ টাকার নিচে, সেগুলোকেও কুটির শিল্প বলা যেতে পারে।

অবশ্য এসবই এখন বাহুল্য। কুটির শিল্প মানে হচ্ছে নান্দনিক কিছু, যা গ্রামের অবহেলিত ও দুস্থ মানুষের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে মানুষের ব্যবহারের কাজে লাগে। হ্যাঁ, কুটির শিল্পের ইতিহাসও আমাদের অনেক প্রাচীন। ভূ-পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনীতেও সে কথা লিপিবদ্ধ আছে। সেই সময়ে আমাদের এই বাংলায় পৃথিবীখ্যাত যে মসলিন তৈরি হতো, সেগুলো কিন্তু আমাদের এই কুটির শিল্পেরই অন্তর্ভুক্ত। যদিও অত্যাচারী ইংরেজদের অত্যাচারে সেসব আজ ইতিহাস হয়েই আছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে গেলে জাহানারার দেওয়া মসলিনের কারুকার্য আর বাহারি রূপ দেখে আজও তাজ্জব হতে হয় এবং এটাই সত্যি, মসলিন কুটির শিল্পেরই শিল্প।

কুটির শিল্পের পৃথিবী
মূলত হাতের কারুকার্যতা ব্যবহার করেই কুটির শিল্পের কাজ করা হয়, পণ্য তৈরি হয়। তবে আধুনিকতায় ভর করে আজ কুটির শিল্প পেয়েছে নতুন মাত্রা। ফলে আধুনিক সভ্যতার কল-কারখানাও কুটির শিল্পের কাজে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তাই এখন কুটির শিল্প দ্বারা তৈরিকৃত পণ্য আরও নান্দনিক ও সুন্দর হয়েছে। ধরন, নিয়ম, প্রকার ইত্যাদি মিলে আন্তর্জাতিক হিসাব গণ্য করে কুটির শিল্পকে ৮ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। খাদ্য, পানীয়, তামাক প্রক্রিয়াজাত শিল্প; বস্ত্র ও চামড়া শিল্প; কাঠজাত শিল্প; মুদ্রণ ও মোড়কসহ কাগজ শিল্প; রাসায়নিক, পেট্রোলিয়াম ও রসায়নজাত শিল্প; অধাতব খনিজ শিল্প; মেশিনারি ও যন্ত্রপাতিসহ ধাতব শিল্প এবং হস্তশিল্পসহ অন্যান্য শিল্প।

কদর
কুটির শিল্পের কদর হওয়ার মূল কারণ, এটি শিল্প আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বিরাট ভূমিকা পালন করছে। আর দ্বিতীয় কারণ, কুটির শিল্পে তুলনামূলক যে কোনো ব্যবসার চেয়ে খুবই কম মূলধন লাগছে। এই শিল্পে দ্রুত উন্নতি সম্ভব। দেশের ভেতরের চেয়ে দেশের বাইরে কুটির শিল্পের মূল্য আরও অনেক বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামের যে মানুষগুলো দক্ষ, কিন্তু তাদের শিক্ষা নেই বলে অবহেলিত এবং অন্য কাজে লাগানো যাচ্ছে না, তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার পাশাপাশি দেশের উন্নতিতে কুটির শিল্পের ভূমিকা অনন্য।

যেভাবে শুরু করতে পারেন
আপনি যদি একেবারেই নতুন হয়ে থাকেন কুটির শিল্প জগতে কিন্তু আপনার আগ্রহ যদি থাকে ষোলো আনা, আর নিজেই নিজের বস হতে চান- তাহলে আপনাকে স্বাগতম। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন [বিসিক] রয়েছে আপনার অপেক্ষায়। খুব দক্ষতার সঙ্গে তারা আপনাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযোগী করে তুলবে। দরকার শুধু আপনার আগ্রহের। পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, কাজের সহযোগিতা, এমনকি আর্থিক সহযোগিতাও দিয়ে থাকে বিসিক। আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন তাদের ওয়েবসাইটে-www.bscic.gov.bd।

হিসাব-নিকাশ
কুটির শিল্পে কাজ শুরু করতে মূলধন খুব বেশি লাগে না। আপনি সম্পূর্ণ একাই শুরু করতে পারেন। তারপর ধীরে ধীরে পরিবারের সবাইকে যুক্ত করতে পারেন। প্রয়োজনে এলাকার আশপাশের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েও শুরু করা যায়। আর সেক্ষেত্রে মূলধন শুরুতে মাত্র ১০ হাজার টাকা হলেই আপনার একার জন্য যথেষ্ট। তবে এক লাখ টাকা নিয়ে শুরু করতে পারলে অবশ্যই ভালো।

সুবিধা-অসুবিধা
প্রতিটি কাজেই সুবিধা ও অসুবিধা থাকে। তবে কুটির শিল্পে অসুবিধা নিতান্তই কম। তার চেয়ে সুবিধাই বেশি। অসুবিধা হলো, কাজ করতে হয় একেবারে রুট লেভেল থেকে সাধারণ মানুষকে নিয়ে। শুরুতে পণ্য বিক্রি করতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হয়। আর সুবিধা হচ্ছে, খুবই অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করতে পারা। যাদের সঙ্গে কাজ করবেন, তারা সাধারণ হলেও অনেক আপন। কারণ তারা খেটে খাওয়া মানুষ। আপনার কাজকে তারা মূল্যায়ন করতে জানে। সব মিলিয়ে সুবিধাই বেশি। ফলে চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ঘুরে নিজের সোনার দেহ-মন নষ্ট করার চেয়ে, অন্যদের কর্মক্ষেত্র নিজেই সৃষ্টি করে, ধীরে ধীরে উন্নতির শিখরে আরোহণ করাই তো বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: সমকালfavicon59-4

Leave a Reply