সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক দেশ

সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক দেশ

  • ড. রউফুল আলম

পৃথিবীর পথে পথে যেখানেই গিয়েছি, মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, হয়্যার আর ইউ ফ্রম? হৃদয়ের সমস্ত ভালো লাগা দিয়ে, ঋজু শিরে বলেছি—আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। এই যে নিজের একটা দেশ আছে, পতাকা আছে, জাতীয়তার পরিচয় আছে, সেটা অহংকারের। পৃথিবীর বহু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট পরিচিতি নেই। ভৌগোলিক আইডেনটিটি নেই। তারা পৃথিবীর বুকে নির্যাতিত, নিপীড়িত।

প্রায় পঞ্চাশ বছর হলো আমরা একটি দেশ পেয়েছি। এই দেশটিকে নিয়ে আমাদের সবার স্বপ্ন। দেশটিকে আরও উন্নত দেখতে চাই। দেশের মানুষদের আরও সুখী দেখতে চাই। পৃথিবীর মঞ্চে এই দেশটিকে আমরা অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। একটা দেশকে দাঁড় করাতে হলে আগে মানুষদের আলোকিত করতে হয়। আর মানুষকে আলোকিত করার প্রধানতম শর্ত হলো সুশিক্ষা।

পৃথিবীর সকল দেশে, সকল জাতিতে দুর্নীতি আছে। কম-বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় ও অপচর্চা আছে। তবে যেসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যত ত্রুটিমুক্ত, স্বচ্ছ ও আধুনিক, সেসব দেশ তত উন্নত। সেসব দেশই পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শিক্ষা যদি হয় একটি জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষাঙ্গনগুলো হলো সে মেরুদণ্ডের কশেরুকা। কশেরুকা দুর্বল হলে যেমন মানুষের মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়, মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তেমনি শিক্ষাঙ্গন দুর্বল হলে একটা জাতি ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সে জাতির সমস্ত ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমি একজন সামান্য গবেষক। ইউরোপ-আমেরিকায় জ্ঞান-গবেষণার সুযোগ হয়েছে। সেসব অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পরখ করতে পেরেছি। তাদের উন্নতির মূল কারণ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি তাদের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা। সময়ে সময়ে শিক্ষায় আধুনিকতার প্রয়োগ ও নির্ভেজাল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নিরন্তর চেষ্টা দেখেছি। ইউরোপের বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী শুধু উন্নত শিক্ষার কারণে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটা দেশ যখন শিক্ষাকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করে, সে দেশ সহজে রুগ্ন হয় না। শিক্ষাকে রুগ্ন রেখে কোনো সমাজ দাঁড়াতে পারেনি।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন অনেক। আমরা নারী শিক্ষায় এগিয়েছি। বিশ্ব শ্রম বাজারে আমাদের পরিচিত বেড়েছে। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় আমরা প্রধানতম ভূমিকা রাখছি। দেশের রেমিট্যান্স বেড়েছে। সমাজে উদ্যোক্তা বেড়েছে। শিশু মৃত্যুর হার কমেছে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ হ্রাস পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষার মান হ্রাস পেয়েছে। পৃথিবীর সঙ্গে টিকে থাকার মতো মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের অবস্থান অনেক পেছনে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এখনই।

দেশের শিক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে বহু পদক্ষেপ নিতে হবে। সব হয়তো স্বল্পসময়ে সম্ভব নয়। তবে খুব দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, কোটা ইত্যাদি বন্ধ করা। শিক্ষকেরা হলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্তম্ভ। তাদের মান যদি দুর্বল হয়, তাহলে শিক্ষার মান কোনো দিনই বৃদ্ধি পায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা যেন শুধু মাত্র শিক্ষকতা, পড়াশোনা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, গবেষণা ইত্যাদি বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় জোর দিতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। গবেষণাভিত্তিক পদোন্নতি বিবেচনা করতে হবে। গবেষণায় অপারগ শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজে নিয়োগ করা যেতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক পরিষদে রাজনৈতিক লোক কিংবা সরকারি আমলা নিয়োগ না দিয়ে, নিজ নিজ ক্ষেত্রের গবেষকদেরই নিয়োগ দিতে হবে। সর্বোপরি, বিদেশ থেকে দেশের মেধাবী ছেলে-মেয়েদের ফিরিয়ে নিতে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করা অপরিহার্য। চীন, ভারত ও কোরিয়াসহ বহু দেশ এমন প্রকল্প চালু করে মেধাবীদের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রচুর মেধাবী ছেলেমেয়ে দেশে ফিরতে চায়। শুধু পর্যাপ্ত সুযোগের কারণে তাদের সে ইচ্ছেটুকু ক্ষয় হয়। অথচ দেশে অকারণে অনেক প্রকল্প চালু করা হয়।

শিক্ষা ও গবেষণায় জোর দিয়ে আজ ভারত, চীন পৃথিবীতে শক্তিশালী হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশেও সে সম্ভাবনা অফুরান। দেশের ছেলেমেয়েরা আগ্রহী, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাদের সময়, আগ্রহ ও শ্রমকে কাজে লাগানো যাবে শুধুমাত্র আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে। নতুন বছরের বাংলাদেশ যেন সে লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যায়।

ড. রউফুল আলম: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn), যুক্তরাষ্ট্র।

সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply