গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি

  • উদ্যোক্তা ডেস্ক

সবজি চাষ করে সংসার চলে এমন ব্যক্তির যদি সবজি বিক্রিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে জীবন চলবে কিভাবে? দক্ষিণাঞ্চলের চর এলাকায় খালের ওপর সেতু না থাকায় দরিদ্রদের এমনি অবস্থা। পিরোজপুর সদরের শিকদার হাওলা গ্রামের প্রদীপ চক্রবর্তী বললেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের চলাচলেও অসুবিধা ছিল। এখন কাঠের পুল হওয়ায় আমরা সহজে বাজারে যেতে পারি। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে।

এই গ্রামে একটি কাঠের পুল করে দিয়েছে সমৃদ্ধি কর্মসূচি। জনগণের অংশগ্রহণ এবং অনুদানের মাধ্যমে কাঠের পুলটি নির্মিত হয়েছে। এতদিন শুধু উদ্যমের অভাব ছিল। এখন আর পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই। সমৃদ্ধি কর্মসূচির সমন্বয়ক আজিজুর রহমান জানালেন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে জেলা সদরের একটি লিংকেজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। এখানে সমৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে পল্লী কর্ম—সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগী সংস্থা ডাক দিয়ে যাই। সংস্থাটির সদস্যরা জানালেন, পিরোজপুর সদরের শিকদার মল্লিক ইউনিয়নকে সমৃদ্ধির আওতায় আনা হয়েছে। এই ইউনিয়নে ইতোমধ্যে ১০টি কাঠের পুল করা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে এখানে সমৃদ্ধি কর্মসূচি চলছে। এতে করে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রাই বদলে যাচ্ছে। আয়বর্ধক কার্যক্রম, সম্পদ সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়ে থাকে। আরো দেওয়া হয়ে থাকে যুবকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।

দেশের প্রায় দেড়শটি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সমৃদ্ধি। এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে ৪৩ লাখ পরিবার। যাদের জীবনে এখন নতুন স্বপ্ন। ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন। সংগ্রাম করে এগিয়ে যাবার দৃঢ় প্রত্যয় আছে এমনি এক যুবক রিয়াজুল ইসলাম। শিকদার মল্লিক ইউনিয়নের ছোট জুজখোলা গ্রামে তার বাড়ি। কিছু দিন আগেও সচ্ছল ছিল না সে। আর এখন তার বাড়িতে পাইকারদের ধরনা। পাইকাররা তার বাড়ি থেকে ডিম নিয়ে যায়। কোয়েলের ডিম। রিয়াজুল মাত্র ১ লাখ টাকা নিয়ে কোয়েলের খামার দেয়। নিচে পাঙ্গাস মাছের চাষ। কোয়েল ও কোয়েলের ডিম এবং মাছ এই তিনটা থেকেই তার আয় আসে। এই আয় দিয়ে গাভী, ছাগল পালনও শুরু করেছে। রিয়াজুলের মতে, সমৃদ্ধির কারণেই আজ আমি স্বাবলম্বী হতে পেরেছি। অন্যের অধীনে চাকরি করার চেয়ে নিজের কাজ নিজে করি। এ এক অন্য রকম আনন্দ। আর রিয়াজুলকে দেখে অন্যরাও উত্সাহিত হচ্ছে। প্রশিক্ষণ আর ঋণ নিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

সমৃদ্ধি কর্মসূচির বিস্তৃতি আরো বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন স্থানীয় এনজিও ডাক দিয়ে যাই’র কর্মকর্তা আজিজুর রহমান। তার মতে, সমৃদ্ধি কর্মসূচি গ্রহণের পর ক্ষুদ্র ঋণ আদায়ের হার বেড়েছে। বেড়েছে ঋণ বিতরণের হারও। এখন ঋণের বাইরেও এতগুলো সুবিধা পাচ্ছে, ফলে দরিদ্ররা নতুন করে বাঁচতে শিখছে। এমনকি ভিক্ষুক পর্যন্ত স্বাবলম্বী হয়েছে।

শিকদার মল্লিকের ভিক্ষুক মনোরঞ্জন মন্ডলের কথা কার অজানা। স্থানীয়রা সবাই জানতো মনোরঞ্জন ভিক্ষে করে। এক ছেলে ভারত চলে গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে এক দিনমজুরের সঙ্গে। দু’বেলা খেয়ে পরে থাকার অবস্থা ছিল না তার। ‘হিন্দু বলে ভিক্ষাও কম জুটতো’ এমন ধারণা থেকে মনোরঞ্জন গ্রাম থেকে দূরে গিয়ে মুসলমান সেজে ভিক্ষা করতো। দাঁড়ি, টুপি আর পাঞ্জাবি ‘লেবাস’ পরে ভিক্ষাবৃত্তির টাকায় চলতো স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। এমন দুর্দিনে তার পাশে সৌভাগ্যের হাতছানি নিয়ে দাঁড়ায় সমৃদ্ধি। মাত্র এক লাখ টাকায় তার জীবনটাই বদলে  গেছে। তাকে একটি ঘর করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ হচ্ছে। একটা গাভী থেকে তার তিনটা গরু। আছে হাঁস মুরগি। বাগানে ফলদ ও ঔষধি গাছ। জৈব সার আর সোলার বাতিতে এক নতুন জীবন এখন মনোরঞ্জন মন্ডলের। প্রতিক্রিয়ায় শুধু কৃতজ্ঞতা আর কৃতজ্ঞতা। এখন সে ডাক দিয়ে যাই’র উদ্যমী সদস্য। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানালেন, একই ইউনিয়নে ১০টি সমৃদ্ধি বাড়ি করা হয়েছে। যাদের আয়-রোজগারের জন্য অন্য কিছু করতে হবে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, প্রশিক্ষণ সেবাতো আছেই।

সমৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উদ্যোগে সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। এর চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সামগ্রিক উন্নয়নের একটি মডেল দাঁড় করান। পিকেএসএফের লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়ন এবং ঋণ প্রদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থাটি শুধু ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করছে সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। অন্য লক্ষ্যগুলোর বিষয়ে কোনো কাজ করেনি। ২০১৪ সাল থেকে পিকেএসএফ প্রথাগত ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এই কর্মসূচি হাতে নেয়।

পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, একটি সম্পূর্ণ ইউনিয়নকে লক্ষ্য করে পরিবারভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের এই পদক্ষেপ বেশ সাড়া ফেলেছে। এই কর্মসূচির অধীনে প্রথমে নির্ধারিত ইউনিয়নের সব পরিবারের ওপর আর্থসামাজিক অবস্থা নিরুপণের জন্য জরিপ চালানো হয়। তাতে পরিবারগুলোর চাহিদা উঠে আসে। কোন পরিবারে কিসের অভাব তা স্পষ্ট হয়। তখন ঐ বিষয়টিকে সামনে রেখেই পুরো সমন্বিত একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাইকে দেওয়া হয়। সমাজের প্রয়োজন এমন পদক্ষেপ যেমন স্কুল, ব্রিজ কালভার্ট, টিউবওয়েল স্থাপন, রাস্তাঘাট মেরামত প্রভৃতি এই কর্মসূচির অধীনে করে দেওয়া হয়। এসব ইউনিয়নের লোকেদের মধ্যে বেশ উদ্দীপনাও তৈরি হয়েছে।

সূত্র: ইত্তেফাকfavicon59-4

Leave a Reply