শাফাতের স্বপ্নের স্যুভেনির

শাফাতের স্বপ্নের স্যুভেনির

শাফাত কাদির। বিডি স্যুভেনির এর সিইও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিষয়ে সদ্য এমবিএ করা সাফাত উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশসেরা ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পান স্নাতক করার জন্য। পড়াশোনা শেষ করার পর অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক পেয়েছেন, পাচ্ছেন উচ্চপদে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু অন্যের প্রতিষ্ঠানে চাকরি নয়, নিজে কিছু করবেন, দেশের জন্য কিছু করবেন বলে হয়েছেন উদ্যোক্তা, মাত্র ২৫ বছর বয়সে বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেডের সহযোগিতায় সৃষ্টি করেছেন বিডি স্যুভেনির। তার কাজ দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। শাফাত কাদিরের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন মো. সাইফ


BD Suveniurমালয়েশিয়া থেকে সদ্য ফেরত আসা এক ভদ্রলোকের হাতে দেখা গেল অত্যন্ত সুন্দর নকশা’র একটি মসজিদের রেপ্লিকা। তার কাছ থেকেই জানা গেলো, এটি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর একটি। ঘুরতে গিয়ে বেশ কয়েকটি রেপ্লিকা কিনে এনেছেন, এখন সেগুলো উপহার হিসেবে কাছের মানুষদের দিচ্ছেন, সাথে মসজিদের সুন্দর নকশার মাহাত্ম্য বর্ণনা করছেন।

দূরদেশ ভ্রমণ শেষে স্মৃতি এবং স্মারক হিসেবে অনেকেই এমন রেপ্লিকা নিয়ে আসেন। এই কারণেই অনেকের বসার ঘরে, শো-কেসে শোভা পায় নান্দনিক ভারতের তাজমহল, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টির ক্ষুদ্রাকৃতির স্যুভেনির। এইসব রেপ্লিকা শুধু শোভা-বর্ধন নয় আমাদের সামনে তুলে ধরে তাদের কৃষ্টি-কালচার এবং তাদের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য।

বাংলাদেশ মধ্যম-আয়ের দেশ হলেও সভ্যতা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রাচীন স্থাপনার দিক থেকে অনেক উন্নত এবং সমৃদ্ধ বলা চলে। দেশ ছাড়িয়ে বহিঃবিশ্বকে আমাদের সম্পর্কে জানান দিতে এই সকল ইতিহাস-সমৃদ্ধ স্থাপনাগুলোকে চাইলেই কাজে লাগানো যায়। নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করা এক তরুণ উদ্যোক্তার মাথায় আসলো আইডিয়াটি। তিনি শাফাত কাদির। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আমরা পর্যটকদের কাছে রিকশা কিংবা এমন কোনো কিছুর রেপ্লিকা তুলে দিই যেটা হয়ত অনেকক্ষেত্রেই আমাদেরকে উপস্থাপন করে না। সাংস্কৃতিকভাবে আমরা অনেক সমৃদ্ধ। কার্জন হল, আহসান মঞ্জিল, ষাটগম্বুজ মসজিদসহ অনেক অসাধারণ আইকনিক জায়গা আমাদের রয়েছে। স্মারক স্যুভেনির হিসেবে আমরা সেসব তুলে দিতে চাই বিদেশী পর্যটকদের কাছে।’

বলতেই হয় অসাধারণ চিন্তা এটি। এই চিন্তাধারা থেকেই সাফাত কাদির ‘বিডি স্যুভেনির (Bd Souvenir)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান, যার প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। তাকে সহযোগীতা করতে আরও যোগ দেন ৪ বন্ধু, তারা হলেন আবুল হাসনাত সোহাগ, মোরসালিন অনিক, খায়রুল বাশার সজল, রবিউল হোসেন জুয়েল।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সাথে।
আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সাথে।

উদ্যোক্তার বেড়ে ওঠা

সদ্য এমবিএ শেষ করা শাফাত কাদিরের জন্ম ঢাকার শাহজাহানপুরে। মেধাবী সাফাত পড়াশুনা করেছেন শহরের নামকরা স্কুল-কলেজে। ২০০৭ সালে এসএসসি দিয়েছেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। ইংরেজি ভার্শনের ছাত্র সাফাত রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি একাধারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার সুযোগ লাভ করেন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে। সেখান থেকে নিজের পছন্দমতো বেঁচে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদকে। এই অনুষদের ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস’ বিষয়ে বিবিএ এবং এমবিএ শেষ করেছেন।

.

উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প

নিজে উদ্যোক্তা হবেন এমনটা হয়ত আগেই ভেবে রেখেছিলেন সাফাত কাদির। তিনি মনে করেন, উদ্যোক্তা দুই ধরনের হয়- ১.সামাজিক উদ্যোক্তা; ২. ব্যাবসায়িক উদ্যোক্তা। সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ডিইউ-টাইমজ (DUTIMZ)’ প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতিমূলক পাতা ‘ডিইউপিডিয়া(DUPEDIA)’-এরও উদ্যোক্তা তিনি। ২০১৪ সালে কাছের এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে তিনি ‘ইনোভেশন এক্সপো’ – যেটি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় – সেখানে ‘বিডি স্যুভেনির’ এর প্রজেক্ট উপস্থাপন করেন। মূলত সেখানে তারা কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে এমন স্থাপনাগুলোর মিনিয়েচার থ্রিডি রেপ্লিকা প্রদর্শণ করেন। এটি তখন ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিডি স্যুভেনির।

বিডি স্যুভেনিয়-এর পন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের রেপ্লিকা।
বিডি স্যুভেনিয়-এর পন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের রেপ্লিকা।

বিডি স্যুভেনিরের কার্যক্রম

বর্তমানে বিডি স্যুভেনির তাদের ব্যবসায়টিকে তিন ভাগে পরিচালনা করছে। প্রথমত, কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং তাদের মুল কাজ। এর অধীনে যে সকল পণ্য তারা তৈরি করেন সেটা হচ্ছে কালচারাল হেরিটেজ সম্পর্কিত থ্রিডি রেপ্লিকা যা ঐতিহাসিকভাবেও সমাদৃত। এই কাজে সাফাত কাদির সহায়তা পান চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের।

দ্বিতীয়ত, করপোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের অধীনে তিনি যে সকল পণ্য নিয়ে কাজ করেন সেগুলোকে বলা হয় ডেস্ক স্যুভেনির। পেনহোল্ডার, কার্ডহোল্ডার, টিস্যু বক্স ইত্যাদি পণ্য এক্ষেত্রে তারা প্রস্তুত করে থাকেন কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের জন্য।

তৃতীয়ত, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে কাজ করেন। এক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের শেষে ছাত্রছাত্রীদের হাতে উদ্ভাবনীয় কিছু তুলে দিতে কাজ করেন যাকে তিনি বলেন, এডুকেশনাল স্যুভেনির।

তিনিও বাধা পেরিয়েছেন

অন্য সকল উদ্যোক্তাদের মতো সাফাত কাদিরও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। সম্প্রতি একটি সমাবর্তনের কাজের অর্ডার পেয়ে তিনি যাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন তারা অগ্রিম টাকা নিয়ে আর ফিরে আসেনি। বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব, কাজের ক্ষেত্রে সৎ না থাকাটাকে তিনি দেখছেন বড় বাধা হিসেবে। একজন তরুণ যিনি ঝুঁকি নিয়ে হলেও একটি ব্যবসায়ের উদ্যোগ নেন, তিনি অবশ্যই আশা করবেন একটু সহায়তা এবং বিশ্বাসের জায়গা যেটিতে তিনি আস্থা রেখে এগিয়ে যাবেন। সাফাত কাদির মনে করেন, এটি তাকে দারুণ অভিজ্ঞতা দিয়েছে, ভবিষ্যতে সতর্ক থাকলে হয়ত এধরনের প্রতারকদের হাত থেকে মুক্তি মিলবে।

দি প্রমিনেন্টকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়। সাফাত কাদির ও মো: সাইফ।
দি প্রমিনেন্টকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়। সাফাত কাদির ও মো: সাইফ।

অর্জনের খাতায়

বিডি স্যুভেনিনের নিজস্ব পণ্য থ্রিডি মিনিয়েচার রেপ্লিকার কপি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক নিজে দেখেছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও এটি পৌঁছেছে। তারা স্যুভেনির-গুলোকে খুবই পছন্দ করেছেন এবং এটিকেই বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন সাফাত কাদির। তার প্রতিষ্ঠানের স্যুভেনির-গুলো গেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত! বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের (BPC) অধীনে বিমানবন্দরের ডিউটি-ফ্রি শপগুলোতে তার পণ্যগুলো বিক্রয়ের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান সাফাত। এছাড়া সম্প্রতি ‘আর্ট সামিট’ এ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (BTB) নিজস্ব স্টলে শাফাত কাদিরের স্যুভেনির-পণ্যগুলো  রাখার আমন্ত্রন পান।

.

যারা উদ্যোক্তা হবে

বর্তমানে ‘উদ্যোক্তা’ ‘স্টার্ট-আপ’ শব্দগুলো খুবই জনপ্রিয়। হুজুগের বশেই অনেকেই হয়ত আসতে চাচ্ছেন এই সেক্টরে। তবে সাফাত কাদির স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেন তাদেরকে, শুধু ভিজিটিং কার্ডে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে দেখানোর লোভ থেকে নয়, আপনাকে বুঝতে হবে আসলেই আপনি উদ্যোক্তা হতে চান কি না ! কারণ সাফল্য পেতে দরকার প্রচুর পরিশ্রম। আত্মবিশ্বাস এবং নিজেকে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে না পারলে এখানে এসে টিকে থাকা মুশকিল। সাফাত কাদিরের মতে, সফল হতে মাত্র তিনটি গুণের সমন্বয় থাকতে হবে- ‘ডেডিকেশন(Dedication)-হার্ডওয়ার্ক (Hardwork) এবং অনেস্টি(Honesty)’!

অনন্য উচ্চতায় দেখতে চান নিজেকে

প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল খুবই ভালো, পড়াশুনার পাশাপাশি জড়িত ছিলেন অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে। চাকুরির প্রস্তাব অনেক পেয়েছেন, পাচ্ছেন। ভালো বেতনে চাকুরির সুযোগ থাকা সত্বেও শুধু দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা এবং নিজের আগ্রহের জায়গাটি প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্যেই হয়ে গেলেন উদ্যোক্তা। বিডি স্যুভেনিরের পরিসরকে আরো বড় করতে চান অদূর ভবিষ্যতে। ‘বাংলাদেশ ব্র্যান্ড’ নামে সুবিশাল বড় কোনো শো-রুম করতে চান যেখানে একই ছাদের নিচে থাকবে সমগ্র বাংলাদেশ- যেখানে মুখরোচক বাঙ্গালিয়ানা খাবার, ঐতিহ্যবাহী পোষাক, স্যুভেনির কিংবা এমন সব পণ্য যার মাধ্যমে ফুটে উঠবে বাংলাদেশ।

সবশেষে জানালেন অদ্ভুত সুন্দর এক স্বপ্নের কথা। হতে চান অনেক বড় ব্যবসায়ী যাতে করে বাংলাদেশের সেরা ৫০ জন ধনকুবেরদের মধ্যে একজন হতে পারেন তিনি। সাহসীরাই উদ্যোক্তা হয় কথাটি আবারো সত্য প্রমাণিত হলো সাফাত কাদিরের সাহসী স্বপ্নকথায়!

Leave a Reply