ঘুরে এলাম কোরিয়া

ঘুরে এলাম কোরিয়া

  • সাকীব মৃধা 

সকাল সকাল ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর ১৮ মাইল বেগে বাতাস! রিপোর্টিং টাইম সকাল সাড়ে ৮টা! আমি বরাবর সময় নিয়ে একটু খুঁতখুঁতে হওয়ায় উঠে পড়ি ভোরেই। গোসল সেরে ব্যাগ নিয়ে পাহাড় বেয়ে চললাম। বলা বাহুল্য, আগের রাতেই গোছানো ছিল ব্যাগ।

বলছি কোরিয়ান গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ প্রোগ্রামে থাকাকালীন দংসো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ক্যাম্পে আমার অভিজ্ঞতার কথা।

হোস্টেল থেকে প্রধান অ্যাকাডেমিক ভবন প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে এক পাহাড়ের উপর। সেখানে পৌঁছে দেখি হৈ হৈ রব। ছোটখাট একটা মাল্টিকালচারাল গ্যাদারিং। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে আবেদনের প্রেক্ষিতে নেয়া হয়েছে মাত্র ১০০জনকে, যার অর্ধেক কোরিয়ান আর বাকিরা বিভিন্ন দেশের। সেখানে হাজিরা দিতেই, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের লিও চোই আমাকে নিয়ে একটি গ্রুপের দায়িত্বে বহাল করে দিলেন। আমি আর এক জাপানি ছেলে ছাড়া আর ৮জনই মেয়ে, যার মধ্যে চারজন কোরিয়ান, একজন জাপানি আর দুজন ইন্দোনেশিয়ান। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনটি বাসে করে শুরু হলো তংইয়ংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা। প্রধান কাজ, পেট বাঁচানো! হ্যাঁ, ওটাই ছিলো সেদিনের মধ্যাহ্নভোজের স্থান।

রৌদ্রজ্জ্বল দিনটিছিলো ২০১৬ এর মে মাসের ১২ তারিখ। কোরিয়ায় তখন বসন্তকাল। তাতে কি হবে, বাতাসে সবার হাড় কাঁপছিল। তিনটি বাসে মোট ১০০জন শিক্ষার্থী ও বেশ কজন কর্মকর্তাদের নিয়ে শুরু হয় দংসো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই দিনব্যাপী বাৎসরিক ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্প।

উইন্ডি পাহাড়ের কোলে। ছবি: লেখক

দংসো ইউনিভার্সিটি দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দর নগরীতে অবস্থিত। এটা পাহাড়ী এলাকা। আমাদের বাসগুলো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে চলছিলো। বাসে প্রাতঃরাশের ব্যবস্থা ছিলো। ক্যাম্পাস থেকে তংইয়ংয়ের পথ প্রায় আড়াই ঘণ্টার। ওখানে পৌঁছে দেখি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যে রেস্তোরাঁয় আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে তা একদম সাগরের কোল ঘেঁষে একটা টিলার উপর।

খাবার শেষে আমরা যাত্রা করলাম দনপিরাংয়ের পথে। দংপিরাং গ্রামটি হলো বুসানের একটি অন্যতম আকর্ষণ। এটা তংইয়ং থেকে দুই ঘণ্টার পথ। রওনা দিতে বুঝতে পারিনি সামনে কি হতে যাচ্ছে। পৌঁছুতেই আমাদের এক গাইড আমদের গ্রুপ প্রতিনিধিদের হাতে ধরিয়ে দিলেন এক ফর্দ! না কেনাকাটার না, বরং তুলতে হবে ছবি। সেগুলো থেকে বাছাই করতে হবে পাঁচটি, আর তা নিয়ে একটা গল্প সাজাতে হবে, যা কিনা ঐ সন্ধ্যায় আমাদের শোনাতে হবে সবার সামনে। সময় বেঁধে দেয়া হলো এক ঘণ্টা!

পুরো গ্রামের দেয়ালটাই যেন একটা আর্ট গ্যালারি, সম্পূর্ণ গ্র্যফিটি করা। আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক ছবি তুলে ক্ষান্ত দিলাম। সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম মিরুকসান পাহাড়ে। সেখানে একসাথে যেকটা পাহাড় সাগরের উপর দ্বীপের মতোন দাঁড়িয়ে আছে, মিরুকসান তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ। গান্ডোলায় করে যেতে হয় পাহারটাতে। প্রতিটা গান্ডোলায় ছজনের বেশি ওঠা যায় না। মিরুকসানে পৌঁছে আমি আমার গ্রুপ নিয়ে সেখানের সবচে উঁচুতে উঠে গেলাম।

কিছুক্ষণ পরই ফেরার ডাক পড়ল। হঠাৎ করেই সবার মনে কেমন একটা ভীতির সঞ্চার হলো। এইরে, একটু পর সবার সামনে গল্প শোনাতে হবে, আর করতে হবে ট্যালেন্ট শো। বাসেই আমরা সবাই গ্রুপ হয়ে আলোচনায়  বসলাম। গল্প শোনানোর দায়ভারটার পড়ল আমার ঘাড়েই। তবে ট্যালেন্ট শো নিয়ে খুব একটা এগোনো গেলো না। তার মাঝেই আমরা গজে দ্বীপে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।

এখন প্রস্তুত হতে হবে গল্প শোনানোর জন্য। সুযোগ বুঝে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা টিশার্টটা খুঁজে নিলাম। হাঁটা দিলাম অডিটোরিয়ামের উদ্দেশ্যে। আমাদের গল্পটা ছিলো খুব সাদামাটা, তবে সেদিনকার সবচে শিক্ষণীয়। এরপর নানান রকমের খেলায় কেটে যায় প্রায় ঘন্টাখানেক।

আমরা ভেবেছিলাম, এ দিয়েই বোধহয় শেষ। কিন্তু, মাথায় যেন বাজ পড়লো, যখন ঘোষণা হল আধা ঘন্টা বিরতির পর শুরু হবে ট্যালেন্ট শো! গ্রুপ লিডার হিসেবে তখন আমি রীতিমত ঘামছি। কেননা সারাদিনের দৌড়ঝাঁপের পর কারো মাথা থেকেই যেন কিছু বেরুচ্ছিলো না! কিন্তু, দলের অন্যান্য সদস্য অভয় দিলো। ঠিক হলো একটা নাচ হবে। যেভাবে পুরো নাচটা ভাবা হয়েছিলো সেভাবে ঠিক না হলেও, শেষ করে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পরদিন সকালে ওঠার কথা থাকলেও, সাগরটা মাত্র ১৫মিনিটের পথ। অনেকেই আমরা সাগরধারে বসে গেলাম আড্ডায়। হঠাৎ করে মনে হলো পুরো পৃথিবীটা ওখানে চলে গেছে। ওমান, ইরান, জাপান, জার্মানি, ফিলিপিন, ভারত, ভিয়েতনাম, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, রাশিয়া, বেলিজ, গুয়েতেমালা, আর কোরিয়া তো ছিলই, তাছাড়া কয়টা দেশের নাম যে ভুলে গেছি মনেও নেই। সেই আড্ডা ভাঙতে ভাঙতে রাত ৩টা।

দেশে যেখানে অ্যালার্ম দিয়ে, মায়ের দশটা বকুনি খেয়ে ঘুম ভাঙ্গে; পরদিন কোনটারই দরকার পরেনি। সূর্য তখন উঠে গেছে, কিন্তু মানুষগুলো তখনও জাগেনি। শুরু হয় নতুন একটা দিন।

আমি একমগ কফি নিয়ে রিপোর্ট লিখতে বসে যাই। মিনিট ১৫ পরই তা শেষ করে, ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তার জন্য ডাইনিং এ যাই। নাস্তা শেষে আবার রুমে এসে ব্যাগ গোছাতে লেগে পরি। শেষবার দেখে নেই ওই সাগরের লাবণ্য!

ওখান থেকে আমরা একত্রিত হয়ে চলে যাই উইন্ডি হিল নামক একটা চমৎকার জায়গায়, যদিও হাইওয়ে  থেকে অনেকটা পথ হেটে যেতে হয়, তবে নামের সাথে এলাকার বাতাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় বাতাসের কারণে তেমন ক্লান্তি আসেনি। উইন্ডি হিল থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটা সি-ফুড রেস্তোরাঁয়। সেখানে এক মনোহারি খাবারের পর আমরা চলে যাই দামইয়াংগুনে দ্যায়নামুগল ব্যাম্বু পার্কে।

দ্যায়নামুগল ব্যাম্বু পার্কটা মূলত একটা বাঁশবাগান। এখানে কিভাবে বাঁশ চাষ করা হয়, তার প্রতিটা বিষয় খুব সহজভাবে দেখানো আছে। পুরো পার্কটাতে বসার বেঞ্চ থেকে শুরু করে, সাঁকো, রাস্তা, দোলনা, নানান খেলনা, এমনকি বাদ্যযন্ত্র সবই বাশের তৈরী। আমরা পুরো পার্কটাই ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেক ছবি তুললাম। এসব করতে করতে বিকেল হয়ে এলো।

এবার ফেরার পালা। পার্ক থেকে দংসোর দূরত্ব ঘন্টা তিনেকের। কিন্তু খুশির সময় যে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। অনেকের সাথেই ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম আর কোরিয়ানদের পছন্দ কাকাও টকে কানেক্ট হয়ে নেই। তারপর সন্ধ্যার আগেই আমরা হোস্টেলে চলে আসি। কিন্তু, কারোরই যেন যেতে ইচ্ছে করছিলো না। রাত হওয়া পর্যন্ত তাই অনেকে গল্প করলাম। ক্যাম্পাসের বাইরে রাতের খাবার শেষে চলে গেলাম যে যার গন্তব্যে।

মাত্র দুদিনের ক্যাম্পের অজস্র স্মৃতি লিখতে গেলে হয়তো একটা বই লেখা হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পে যে শুধুমাত্র হাসিঠাট্টা, গল্পগুজবের জন্য ছিলো তা নয়, বরং এর থেকে আমরা সবাই শিক্ষা পেয়েছিলাম নেতৃত্বের, সংস্কৃতির আদান প্রদানের, আর অবশ্যই বন্ধুত্বের!

Leave a Reply