রাশিয়া বোঝে, আমরা বুঝি না কেন?

রাশিয়া বোঝে, আমরা বুঝি না কেন?

  • সাজিদ উল ইসলাম

সকাল থেকেই তুলোর মতো তুষার ঝরছে৷ ঘুম ভেঙ্গে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায়—ওপাশে দাঁড়ানো আপেল গাছের পত্রহীন শাখায় নেমেছে শূন্যতার দীর্ঘ শীতঘুম৷ পায়ের নিচে মুড়ির মতো চুড়চুড় করে ভেঙ্গে যায় বরফ কুচি—কখনো বা সূর্যকিরণে হিরের মতো দ্যুতি ছড়িয়ে জ্বলজ্বলে হয়ে ধরা দেয় চোখে। রাশিয়াতে পড়তে এলে নিতে হয় রুশ ভাষার হাতেখড়ি৷ প্রাইমারী ক্লাসের মতো বই, ব্যাগ গুছিয়ে নিদ্রাদেবীর কোল ছেড়ে ঢুলুঢুলু আঁখিযুগল ডলতে ডলতে মাইনাস ডিগ্রীর সাথে লড়াই করে ছুটতে হয় ক্লাসে৷ উত্তরের আর্কটিকের হীম হাওয়া নাতিদীর্ঘ পথকে দীর্ঘ করে তুললেও জ্ঞানপিপাসু বিদ্যার্থীদের দমিয়ে রাখতে পারে না৷ শ্রেণিকক্ষে বসে ভালো লাগে ষাটোর্ধ্ব শিক্ষিকার ঠৌঁটের হাসি, মার্জিত ব্যবহার আর রুচিসই পোশাক৷ নারীরা এখানে সহজে বয়সের কাছে হার মানে না৷ বয়স্কা শিক্ষিকাদের ইংরেজির জ্ঞান “ইয়েস নো” পর্যন্ত অথবা জানলেও বলতে চান না৷ সেজন্য প্রথম দিকে বিদেশী শিক্ষার্থীদের কথা বলতে বা বুঝতে গিয়ে ‘আঁধারে হাতড়ানো’ অবস্থা হয়৷ তাই না বুঝেও অনেক সময় মাথা উপর-নিচে ঝুঁকে পড়ে৷

pictur.php
রুদেন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস।ছবি: ইন্টারনেট

ক্লাসে সাহচর্য মিলেছে আরব, আফ্রিকান, আফগান, ভিয়েতনাম ফরাসিদের—যেন এক বিশ্ব পরিবার৷ ভাষা-বর্ণ-আচারে ভিন্নতা থাকলেও রুশ ভাষা সকলকে এক অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় একই গঙ্গা স্রোতে, শিখিয়ে দেয় বিশ্ব সংস্কৃতির পাঠ৷ ভাষা শিক্ষা অনুষদকে বলা হয় ‘পাদ্গাতাভিতিলনম ফাকুলতিয়েত’ বা পূর্ব প্রস্তুতি অনুষদ, যেখানে আগুন্তক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশার জন্য প্রস্তুত করা হয়। তাদের সামনে তুলে ধরা হয় রাশিয়ান ঐতিহ্য, জীবনাচরণ, বিশ্বাস আর ইতিহাসকে, এমনকি বসন্ত উৎসবও বাদ পরে না। অনুষদের সমগ্র ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন দল উপদলে ভাগ করা হয়। প্রত্যেকদলের তত্ত্বাবধনে থাকেন একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা। এক বছরের জন্য তিনি হন দশ বারো জনের সকল বিষয়ের অবিভাবক। দুর্বলদের জন্য থাকে বিশেষ দল। সকল বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের ইতিহাস, ভূগোল অধ্যায়ন করতে হয়৷ ইতিহাসের ক্লাস হলো সব দলের শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা৷ মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে রুশদের পূর্বপুরুষ ইউরোপীয়ান-স্লাভিয়ান সমাজ, রুশ সামাজ্যের উত্থান পতন সহজভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়৷ মাঝে মাঝে ফিল্ম দেখা আর ঐতিহাসিক যাদুঘর পরিদর্শণ শিক্ষণ পক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করে৷ বর্ণনা সাধারণ হলেও আয়োজনটা এত অসাধারণ যে ভাষার দুর্ভেদ্যতা সত্ত্বেও ইতিহাসের পাথর বিদেশীদের কাছে বরফের মতো গলে যায়৷ ভূগোল ক্লাস মানে অসংখ্য মানচিত্রের সমাহার৷ প্রত্যেকের কাছে থাকতে হয় মানচিত্রের বই, হাতে কলমে শেখা হয়ে যায় পৃথিবী৷ বিশ্ব -ব্রম্মান্ডের পরিচিতির জ্ঞান অর্জনে দেশের দীর্ঘ দেড় যুগের বিদ্যার ফাঁকা ঝুলি মনে হচ্ছে এক বছরে তার অনেকটাই পূর্ণ হয়েছে৷ চোখ মুদলে যেন দেখতে পাই কোথায় ‘বৈকাল হ্রদ’ আর কোথায় বা কৃষ্ণ সাগর।

ext
শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর রুদেন ক্যাম্পাস।

এখানে শিক্ষক ছাত্রের সম্পর্কে সিঁড়ি থাকলেও এক সিঁড়িতে দাঁড়ানো যায়, সেমিনারে দেখেছি শিক্ষার্থী তার যুক্তির বাণে শিক্ষকের পুরাতন ভাবনা আর মতবাদকে চূর্ণ করে দিচ্ছে। অধ্যাপক সাহেবও নব্য চেতনা ধারায় নিজেকে সিক্ত করে নিচ্ছেন। প্রশ্নকর্তার মুখ দেখে নয়, প্রশ্নের ওজন অনুযায়ী ব্যক্তিকে পরিমাপ করা হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি অতি সহজ। ঠিকমত উপস্থিতি, বাড়ির কাজ, উপস্থাপনা থাকলে পরীক্ষার সামনে ‘সর্দি জ্বরে’ পড়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। লিখিত পরীক্ষার পর দিতে হয় মৌখিক সাক্ষাৎকার। প্রশ্ন প্রায় জানানোই থাকে—শৃধু ভালমতো প্রস্তুতি নিতে হয়। অসংখ্য প্রশ্ন থেকে র‌্যান্ডমলি দুইটার উত্তর দিতে হয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ইংরেজির পাশাপাশি বিদেশি ভাষা শিখার সুযোগ থাকে। ফলে স্কুলের ক্লাসেই পরিচয় ঘটে ফ্রেঞ্চ, জার্মান, স্প্যানিশ প্রভৃতি বিশ্ব মানের ভাষার সাথে। একজন রাশিয়ান বালক শিশু বয়স থেকেই দেশের সচেতন নাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার পাশাপাশি নিজেকে পরিণত করে নেয় বিশ্ব নাগরিক হিসেবে।

আমাদের দেশে ইংরেজদের শত বছর আগে প্রণীত কেরানী বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি ছাড়া অন্য বিদেশী ভাষা শিক্ষা ও চর্চার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিদেশ বলতে হয়ত এখনো আমরা কেবল ইংল্যান্ড আর আমেরিকাকেই বুঝি। ভাষা যেহেতু যোগাযোগের বড় একটা সেতু তাই বিশ্বের সাথে অর্থনৈতিক–সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করে জাতির উন্নয়নের গতি বেগবান করতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির পাশাপাহি অন্য বিদেশি ভাষা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মনে করি। বাংলার জন্য রক্ত দিয়েছি মানে এই নয় যে অন্য ভাষা চর্চা করলে এই মহা দান বৃথা হয়ে যাবে। বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে যে দেশের নাগরিকেরা যত বেশি অন্য দেশের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম, তাদের অর্থনীতির সুচক ততই উপরে উঠতে পারছে। ইংরেজ আমলে বাংলার মুসলিমেরা ইংরেজি ইহুদি নাছারাদের ভাষা বলে গাল ফুলিয়ে বসে থেকে হিন্দুদের তুলনায় একশো বছর পিছিয়ে পড়েছিল। আজো সেই পিছিয়েই আছে, এখনও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ফেল করা বিষয়ের সিংহ ভাগ হলো ইংরেজি। তার মানে দুশো বছরেও আমাদের ইংরেজি শিক্ষা লাভ হয়নি। রাশিয়ায় বহু ফ্রেঞ্চ বা স্প্যানিশ কলোনির মানুষ দেখেছি, কথা শুনেছি, ওরা নিজেদের মাতৃ ভাষার পাশাপাশি এসকল ভাষায় এতটাই স্বাচ্ছন্দ্য যে মনেই হয় না এটা ওদের মাতৃভাষা নয়। আর আমরা ইংরেজদের সাথে এত দীর্ঘ সময় থেকেও ইংরেজি বলতে গিয়ে মাথা চুলকানো ছাড়া গতি থাকে না। সময় এসেছে ইতিহাস থেকে নতুন করে শিক্ষা নেবার। এই সরল সত্য রাশিয়া বোঝে, আমরা বুঝি না কেন?

সাজিদ উল ইসলাম: গবেষক শিক্ষার্থী, রুদেন বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো রাশিয়াfavicon59-4

1 Comment on this Post

  1. Onek valo lekhesen!

    জবাব

Leave a Reply