সাফল্যের ছয় শর্ত : আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার

সাফল্যের ছয় শর্ত : আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার

হলিউড অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৩০ জুলাই। শোয়ার্জনেগার পৃথিবীব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন ‘দ্য টার্মিনেটর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এছাড়া ‘কোনান দ্য বার্বারিয়ান’, ‘প্রিডেটর’ তাঁর বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র। একাধারে তিনি একজন অভিনেতা, বডিবিল্ডার, মডেল ও রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রদেশের গভর্নর। ২০০৯ সালের ১৫মে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’র সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এই বক্তব্য প্রদান করেন।


তোমাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! কেন না, অভিনয় ছাড়ার পর এত হাততালি আমি আর কখনো পাইনি!

এত মেধাবীদের একসঙ্গে দেখাটা সত্যিই অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। শুনেছি, আজ এখানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী রয়েছে, যেটা সত্যিই অপূর্ব। এখানে মোট ২ হাজার ২০০ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ৩০০ জন নারী রয়েছে।

আজকের এই সমাবর্তন উদযাপনের মানে এটা নয় যে তোমাদের বাবা-মাকে এরপর আর কোনো পড়াশোনার খরচ দিতে হবে না, আমি সেটা বলতেও চাচ্ছি না। আমি কেবল তোমাদের এই বিশাল অর্জনের খুশি উদযাপনের কথা বলছি। ২০০৯ সালে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার জন্যে তোমাদের এই যোদ্ধাশ্রেণিকে অভিন্দন।

আমি জানি, আজকের এই দিনকে সত্যি করে তোলার পেছনে তোমাদের বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ভাই-বোন আর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্যেও সমানভাবে বিশেষ একটি দিন। আমি একইভাবে বলতে চাই, যে শিক্ষকেরা তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, তাদের মূল্যবান জ্ঞান, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা তোমাদের সাথে বিনিময় করেছেন, তাদের কথা ভুললে চলবে না।

এ পর্যায়ে আমি প্রেসিডেন্ট স্যাম্পলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, আমাকে এত চমৎকার একটা ডিগ্রী দিয়ে সম্মানীত করার জন্যে। ওয়াও, আর্নল্ড শোয়ার্নেজগার, ডক্টর অব হিউম্যান লেটারস! তবে আজ আমি তোমাদের সামনে ডক্টর শোয়ার্জনেগার, প্রশাসক শোয়ার্জনেগার, টার্মিনেটর অথবা কোনান দ্যা বারবারিয়ান হয়ে আসিনি, এসেছি ট্রোজান পরিবারের একজন সদস্য হয়ে।

তোমাদের কেউ কেউ হয়তো জেনে থাকবে মাত্র কিছুদিন আগেই আমার মেয়ে এখানে তার শিক্ষাজীবন শেষ করেছে। আমার মেয়ে আমাকে উদাহরণ হিসেবে, ভিক্টোরি বেলের কথা বলেছে। সে আমাকে বসিয়েছে এবং বলেছে যে এর ওজন ২৯৫ পাউন্ড এবং কীভাবে উইএসসি আর উইসিএলএর ভেতরের বাৎসরিক ফুটবল খেলার বিজেতারা এই বেলটিকে নেয় আর নিজেদের স্কুলের রঙে রাঙিয়ে দেয়। আমি তাকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম- ‘একটু থামো ক্যাথরিন, একটু পেছনে যাও। ইউসিএলএর ফুটবল দল আছে?’

আমার মেয়ের ইউএসসির সময়টা এখন মাত্র শুরু, আর তোমাদের শেষ। এখন অনেকটা চাপ তোমাদের ভেতরে থাকলেও আমি বলব সামনে তোমাদের জন্যে জীবনের একটা নতুন অধ্যায় পড়ে আছে। এর বাইরে আমি তোমাদেরকে অন্যকিছু বলতে চাই। আমি মনে করি মোটের ওপর এটা তেমন কিছুইনা, এটা আমেরিকা। পৃথিবীর ওপরে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দেশ। এটা একটা বিষয়, যদি তুমি আফগানিস্তান বা সোয়াত উপত্যকায় জন্ম নিতে যেখানে তালেবান সংগঠনে যোগ দিতে তোমাকে বাধ্য করা হতো কিংবা মেরে ফেলা হতো।

অতএব বিশ্বাস কর, এটা তোমাদের জন্যে একটা সত্যিই গর্বের ব্যাপার যে, তোমরা আমরিকায় বাস করছ আর তোমাদের এতদিনের শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছ। এটা উত্তেজনাময়, এটা প্রচণ্ড দুর্ধর্ষ এবং এটা তোমার জীবনের নতুন ধাপ। এই পথে অবশ্যই বিফলতা, বাজে ব্যাপার আর হতাশা থাকবে। কিন্তু এটাই জীবন। এ জীবনকে মোকাবেলা করতে তোমরা প্রস্তুত এবং তোমরা যোগ্য। কারণ তোমরা প্রস্তুত না হলে আজকের এ জায়গায় ডিগ্রি নিতে আসতে পারতে না।

অতএব, এখন আমি তোমাদের চলার পথে শোয়ার্নেজগারের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ যে উপহারটি দিতে পারি সেটা হচ্ছে সফল হওয়া নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত কিছু ধারণা। অভিভাবকেরা, দয়া করে কান বন্ধ করে রাখুন, কারণ এখন আমি এমন কিছু বলতে যাচ্ছি যেটা হয়তো আপনার ভালো নাও লাগতে পারে।
আমি কীভাবে সফল হয়েছি? শোনো তবে। ডক্টর শোয়ার্নেজগার হতে গিয়ে আমাকে ছয়টি নিয়ম মেনে চলতে হয়েছে।

শুরু করার আগে আমি তোমাদেরকে বলতে চাই, এগুলো কেবল আমার নিয়ম। এটা যে কেউই প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু তুমি করবে কিনা সেটা তোমার সিদ্ধান্ত।

আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার
আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার

০১. প্রথমত নিজেকে বিশ্বাস কর: বলার অপেক্ষা রাখে না, এখনকার তরুণেরা বাবা, মা, শিক্ষক এবং অন্যদের কাছ থেকে অনেক বেশি উপদেশ পাচ্ছে। কিন্তু তোমার সবচাইতে দরকারী কাজ হচ্ছে নিজের ভেতরটা তলিয়ে দেখা আর জিজ্ঞেস করা তুমি কী হতে চাও? তোমার যেটা ভালো লাগে সেটা ঠিক করার কথা বলছি, সেটা শুনতে যতটাই অদ্ভূত শোনাক না কেন।

আমি ভাগ্যবান, কারণ আমার সময় টেলিভিশন বা টেলিফোন ছিল না। আমার কম্পিউটার ছিল না এবং আইপড ছিল না। টুইটার তখন জানালার বাইরে পাখির কিচিরমিচির ছিল। আমার এত বেশি ব্যস্ততা ছিল না। আমি অনেকটা সময় নিজের জন্য খরচ করতে পেরেছি এবং বুঝতে পেরেছি যে আমার মাথায় কী আছে আর আমার মনে কী আছে।

অতএব প্রথম নিয়ম হচ্ছে, নিজেকে বিশ্বাস করা। কে কীভাবে তোমাকে নিয়ে চিন্তা করছে সেটা ব্যাপার নয়।

০২. এবার নিয়ম ভাঙো: আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রচুর নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই নিয়মগুলোকে ভাঙতে হবে। তবে সাবধান; আইন ভেঙো না, নিয়ম ভাঙো। আমার স্ত্রীর একটি টি-শার্টে লেখা ছিল- ভালো আচরণের নারীরা কখনো কখনো ইতিহাস তৈরি করতে পারে। এই কথাটা পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। খুব বেশি ভালো হলে এবং নিয়ম ভাঙতে না চাইলে তোমার পক্ষে ‘সত্যিকারের তুমি’ হওয়াটা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তোমাকে বৃত্তের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে। মোটের ওপর, পৃথিবীতে থাকার কী মানে আছে যদি এমন কাজই করতে চাও যেটা সবার পছন্দ হচ্ছে এবং ঝামেলা এড়িয়ে যাচ্ছে? আমি কখনোই নিয়মকে পাত্তা দেইনি। আর বাকীটা ইতিহাসই বলে দেবে।

০৩. ব্যার্থ হতে ভয় পেয়ো না: তুমি সবসময়ই জিতবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। তবে মনে রেখো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় পেলে চলবে না। ব্যার্থ হওয়ার ভয়ে জড়োসড় হয়ে গুটিয়ে যেও না। আর হ্যা, নিজের ওপর জোর করতে যেও না। নিজের ওপর তখনই জোর করতে পারবে যখন তুমি নিজের লক্ষ্য স্থির করতে পারবে। এই কাজ যদি ঠিকঠাকভাবে করতে পারো তবে সফলতা আসবেই। অতএব, ব্যার্থ হতে ভয় পেয়ো না।

০৪. নেতিবাচক কথা শুনো না: তুমি নিশ্চয় অনেকবার শুনেছো যে এটা তুমি করতে পার না, ওটা করতে পার না। শুধু একবার ভাব, বিল গেটস যদি সবার নেতিবাচক কথা শুনেই থেমে যেতেন তাহলে কী হতো! আমি এটা শুনতে ভালোবাসি যে, এই কাজ এর আগে কেউ করেনি। কারণ তখন আমি এটা করলে প্রথম কেউ হব। অতএব, সেসব মানুষের দিকে তাকানো বন্ধ করে দাও যারা বলে তুমি করতে পারবে না। আমি সবসময় নিজেকে বলেছি, ‘তুমি পার।’ এবং এটাই আমাকে আমার পঞ্চম নিয়মে এনে দিয়েছে, যেটা সবচাইতে দরকারি নিয়ম।

আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার।
আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার।

০৫. পঞ্চম নিয়ম: কঠোর পরিশ্রম কর: তুমি নিশ্চয় কাজ না করে কখনোই ব্যার্থ হতে চাইবে না। আমি কখনোই কঠোর পরিশ্রম না করার জন্যে প্রতিযোগিতা বা নির্বাচনে হারতে চাইনি। যদি তুমি জিততে চাও তাহলে কঠোর, কঠোর পরিশ্রম করার বিকল্প নেই। আমার সফলতার কোনো নিয়মই কাজ করবেনা যদি না তুমি কাজ কর। আমি দিনকে ২৪ ঘন্টায় ভাগ করে কাজ করি। তুমি যদি ৬ ঘন্টা ঘুমাও তবু তোমার হাতে ১৮ ঘন্টা সময় থাকবে।আমি অবশ্য আট বা নয় ঘন্টা ঘুমাই। সেক্ষেত্রে আমি বলব, দ্রুত ঘুমাতে যাও। এই কারণে এড টার্নার সবসময় বলতেন- ‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ, ওয়ার্ক টু হেল এন্ড অ্যাডভার্টাইজ।’ আমি জানি তোমরা সবাই এই জিনিসগুলোকে জানো, তা না হলে তোমরা আজ এখানে বসে থাকতে না। শুধু মনে রেখ, পকেটে হাত ভরে রেখে তুমি কখনোই সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পারবে না।

এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা বলি।

০৬. ফিরিয়ে দিতে শেখো: তুমি জীবনে যে পথটাই অবলম্বন করো না কেন তোমাকে অবশ্যই জীবনের একটা সময় এসে কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। তোমার সম্প্রদায়কে ফিরিয়ে দিতে হবে, তোমার রাষ্ট্র বা দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। আমার শ্বশুর, সার্জেন্ট শ্রীভার, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- ‘আয়নাটাকে ভেঙে ফেল। তাহলেই তুমি এর বাইরের জিনিস দেখতে পাবে। দেখতে পাবে সেই কোটি কোটি মানুষকে যারা তোমার সাহায্যের আশায় বসে আছে।’

সুতরাং বন্ধুরা, পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় এই ছয়টি নিয়ম মনে রাখবে। নিজেকে বিশ্বাস করো, নিয়ম ভাঙ্গো, ব্যার্থ হতে ভয় পেয়ো না, নেতিবাচক চিন্তাধারীদেরকে এড়িয়ে চল, কঠোর পরিশ্রম কর আর কিছু ফিরিয়ে দাও। favicon

Leave a Reply