শিক্ষার ডানায় উড়ে ছুঁতে হবে আকাশ

শিক্ষার ডানায় উড়ে ছুঁতে হবে আকাশ

  • অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত
আজ তোমরা ১৭ থেকে ১৯ বছরের টগবগে যুবক-যুবতী, অর্থাৎ টিনএইজ। যেদিন থেকে তোমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলে, স্বপ্ন দেখেছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তুলতে। এনসাইক্লোপিডিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বা University বলতে বোঝায় ‘an institution of higher education and research which grants academic degrees’. ল্যাটিনে universitas magistrorum et scholarium, যার অর্থ ‘community of teachers and scholars’. আর এক্ষেত্রে তোমরা হলে ক্ষুদে পণ্ডিত বা ইয়ং জিনিয়াস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা জাতীয় শিক্ষা নয়, এটা হল আন্তর্জাতিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হল আন্তর্জাতিক ছাত্র অর্থাৎ গ্লোবাল সিটিজেন। অর্থাৎ বিদ্যালয় নয়, উচ্চবিদ্যালয় নয়, মহাবিদ্যালয় নয়- তোমরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্থাৎ বিশ্ব নাগরিক।

অত্যন্ত মূল্যবান একটি ধারণা হল, বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক ফ্রিডম বা মুক্ত শিক্ষা ও চেতনার জায়গা। ১৯৮৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর ৪৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকটার স্বাক্ষর করেন Magna Charta Universitatum-এ। এখনও পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকটর এতে স্বাক্ষর করছেন। একই চার্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জ্ঞান অন্বেষণের জন্য অচেনা, অজানা ও অনাবিষ্কৃত পথে ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে। একেই বলে একাডেমিক ফ্রিডম। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, রাজনীতি, দর্শনসহ সর্বক্ষেত্রেই জ্ঞান অন্বেষণের চিন্তা করতে সাহায্য করে। আর্থিক দিক বিবেচনা করলে বলতেই হবে, পাক-ভারত উপমহাদেশে সরকারি অর্থাৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি ফ্রি পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায়।

আমার বাবা-মা যেমন আমার দেবতা, তেমনি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আরও অনেক মনীষী আছেন এবং এমন কিছু শিক্ষক আছেন যারা দেবতুল্য। কিন্তু আমার দেবতার সিঁড়িতে সর্বশেষ সংযোজন হলেন ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ভারতরত্নএ পি জে আবদুল কালাম। পৃথিবীতে একাধারে বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক, চিন্তাবিদ বা মনীষী, সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি হওয়া একজনের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে, তিনি হলেন ভারতের জনগণের অবিসংবাদিত রাষ্ট্রপতি। ‘Uncontroversial peoples president’.

কালামজীর একটা বক্তব্য দিয়ে শুরু করছি : ‘Life has to be built on a great Ideal’ এবং সেজন্য তোমাদের চিন্তা করতে হবে, আবিষ্কার করতে হবে নিজেকে অর্থাৎ You identify what is unique in you.

তোমরা এখন যে মাঠে বসে অভিষেকে সংবর্ধিত হচ্ছো, তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমাদের Induction করা হচ্ছে। তোমরা যখন দেখ আলো ও বৈদ্যুতিক বাল্ব, তখন ভাবছ টমাস আলভা এডিসনের কথা, যিনি এ জিনিসগুলোর আবিষ্কারক। এ মুহূর্তে যদি একটা উড়োজাহাজের শব্দ শোন, তখনই রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের কথা মনে করবে। তাই নয় কি?

আমি কিছুদিন আগে একটা মেডিকেল কলেজে শিক্ষক এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ষের ছাত্রদের সামনে এক বক্তৃতায় বলেছিলাম, read, read & read- ‘co, co Ges co’ এটা কার উক্তি? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, একজন ছাত্রও বলতে পারেনি এটা মহামতি লেনিনের অমোঘ বাণী। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বিপ্লব করে বুর্জোয়া শ্রেণী অপসারণ করা হয়েছে, পুঁজিবাদের গোড়া উৎপাটন করা হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব উৎকর্ষ সাধনের জন্য পড়ালেখার কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ ছাত্রনং অধ্যয়ননং তপঃ। You must want to be you. অর্থাৎ তুমি একটা আদর্শকে সামনে রেখে শুধু তুমিই হতে চাও। তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা লুকায়িত আছে। যা সমষ্টিগত সততা, গবেষণা, অধ্যয়ন, উচ্চ নৈতিকতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে অনেক কিছু এনে দিতে পারবে।

একইভাবে মাদার তেরেসা বলেছিলেন give, give & give, until it hurts. যিনি মানবতার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ কথা দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দিয়ে যাও, দিয়ে যাও এবং দিয়ে যাও, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি নিঃশেষ হচ্ছো। কারণ তুমি যখন পৃথিবীতে এসেছ, তখন শূন্য হাতে বিবস্ত্র অবস্থায় নিঃস্ব হিসেবেই এসেছিলে। যত ধন-সম্পদের মালিকই তুমি হওনা কেন, তোমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতেই হবে এবং সেই বিদায়ও শূন্য হাতে, নিঃস্বভাবে।

বিজ্ঞানের আরেকজন মহীয়সী নারীর নাম তোমাদের সবারই জানা, যিনি রেডিয়েশন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে নিজের শরীরের ওপর রেডিয়েশনের বিক্রিয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা করে রসায়নে নোবেল পেয়েছেন, যা শুধু সম্ভব হয়েছে গবেষণার জন্য। এমনকি এ রেডিয়েশনের প্রভাব তার শরীরে এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল, যার জন্য তিনি সানন্দে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। এ মহৎ ব্যক্তিদের আদর্শ তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম ‘The challenge is that you have to fight the hardest battle that aû human can, ever fight and never stop fighting until you arrive at your destination’.

dr-pran-gopal-datta-lrg20150913224311সর্বশেষ তোমাদের উদ্দেশে আমার বলার আছে, কীভাবে তুমি বা তোমরা তোমাদের জীবনের উৎকর্ষ লাভ করতে পারবে এবং নিজ গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। এখানে চারটি ধাপ রয়েছে : প্রথমত, কুড়ি বছরের আগে জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সার্বক্ষণিক শুধু জ্ঞান আহরণ করতে হবে। অর্থাৎ মনে রাখতে হবে, লেখাপড়ার কোনো শেষ নেই। তৃতীয়ত, কঠোর পরিশ্রম, সততা, নিয়মানুবর্তিতা দিয়ে যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে হবে। চতুর্থত, যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে ক্ষুদ্র এবং মহৎ সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ঊনবিংশ শতাব্দীর ফারসি সুফি কবি জালাল উদ্দিন রুমির নিচের পঙ্ক্তিগুলো স্মরণ করছি :

‘I am born with potential.

I am born with goodness & trust

I am born with Ideas & dreams

I am born with greatness

I am born with confidence

I am born with wings

So I am not meant for crawling

I have wings I will fly

I will fly & fly.’

তরুণ বন্ধুদের প্রতি আমার নিবেদন হল, শিক্ষা তোমাদের উড়বার ডানা দেয়- সাফল্য তখনই আসবে যখন তোমার চেতন ও অবচেতন মন বিশ্বাস করবে যে ‘আমি জিতবই।’

বিদ্যা অমূল্য ধন, যা অর্জনের কোনো শেষ নেই এবং অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করেও শেষ করা যায় না। সুতরাং প্রাণ দিয়ে মনে রাখবে, মন দিয়ে অর্জিত শিক্ষা বিতরণ করবে।

মনে রাখবে, পৃথিবীতে কিছু জিনিসের কোনো বিকল্প নেই- লেখাপড়া, মা-বাবা, পুত্র-কন্যা। হ্যাঁ, বিকল্প আছে, যা শুধু উল্টিয়ে বলতে পারি- পড়ালেখা, বাবা-মা, কন্যা-পুত্র। আজ থেকে তোমাদের স্বপ্ন হল, ৪ বছর পর সমাবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে জাতীয় নাগরিক থেকে আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হবে। বিশ্ব নাগরিক বা গ্লোবাল সিটিজেন হতে হলে তিনটি মন্ত্র প্রাণে ধারণ করতে হবে- ‘মিথ্যা বলবে না, প্রতারণা করবে না এবং চৌর্যবৃত্তি করবে না।’

শুধু এটা মনে রাখলেই তুমি তোমাকে সীমিত প্রাপ্তিতে (লিমিটেড ডিমান্ড) সন্তুষ্ট রাখতে পারবে। তোমাদের অনেক কিছু করার শখ জাগবে। যখনই তুমি কিছু করবে, একটু থাম, চোখবুজে তোমার মা-বাবা, প্রতিবেশী দরিদ্র মানুষটি যার শ্রমে আমাদের অন্ন জোগাচ্ছে তাদের চেহারা কল্পনা করো, চিন্তা করো তুমি যা করতে যাচ্ছ তাতে তোমার মা-বাবা বা দরিদ্র মানুষটি বা সমাজের কিছু উন্নতি হবে কিনা। আর এ সমাজটি হতে হবে সুসমাজ। ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে ভরপুর নয়।

সুসমাজ সৃষ্টি করতে হলে প্রয়োজন সুশাসন। সুশাসন আসবে সুনেতৃত্বের কাছ থেকে। সুনেতৃত্ব সম্ভব যখন তুমি বা তোমরা হবে সুনাগরিক। সুনাগরিক হতে হলে প্রয়োজন সুশিক্ষা। সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন সুচিন্তিত জ্ঞান অর্জন। সুচিন্তিত জ্ঞান অর্জন তখনই সম্ভব যখন অধ্যবসায়সহ সুপাঠ্য বই ও সুস্বাস্থ্যকে তুমি গ্রহণ করে সুস্থ জীবনের অধিকারী হয়ে নিজের মধ্যে জ্ঞানচর্চা করে অন্যকে বিলিয়ে দেবে।

ভাগবত গীতার উক্তি দিয়ে শেষ করছি : ‘ফুলকে দেখ, নিঃশব্দে ফুটে সৌন্দর্য ও সুগন্ধ বিলিয়ে দিচ্ছে এবং যখন তার কাজ শেষ হচ্ছে, তখন রাতের অন্ধকারে কারও মনে আঘাত না দিয়ে নিঃশব্দেই ঝরে যাচ্ছে।’ তোমরাও একটি ফুলের মতো হও। মনে রাখবে, পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, যা ফুল ও শিশুকে ভালোবাসে না।

জয় হোক শিক্ষার, জয় হোক মানবতার।

গত ৩ জানুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতা (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত : সাবেক ভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়favicon59-4

Leave a Reply