‘আমৃত্যু আমি একজন ছাত্র’

‘আমৃত্যু আমি একজন ছাত্র’

  • লিডারশিপ ডেস্ক

২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সফল গানের স্বীকৃতি পেয়েছিল ফেরেল উইলিয়ামসের ‘হ্যাপি’। দশটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড আছে যাঁর ঝুলিতে, তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতে বোধ হয় খুব বেশি কিছু বলার দরকার পড়ে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির (এনওয়াইইউ) সমাবর্তনে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন এই মার্কিন গায়ক। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী, লেখক, মানবতাবাদী কর্মী, নোবেল বিজয়ী রসায়নবিদসহ বেশ কয়েকজন গুণী মানুষকে সম্মান জানানো হয়েছে। বক্তব্য দিতে গিয়ে ফেরেল তাই বারবার এই আত্মপ্রচারবিমুখ মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।


আজ বিশ্ববিদ্যালয় যাঁদের সম্মাননা দিচ্ছে, তাঁদের একজন হতে পারা আমার জন্য একটা অভাবনীয় ব্যাপার। মঞ্চে বসা প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে কথা বলতে বলা হয়েছে। জানি না আমি এই সম্মানের যোগ্য কি না। আজ মঞ্চে আমাদের সঙ্গে ইতিহাসনির্মাতারা আছেন। আছেন অলৌকিক কর্মক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। তাঁদের নামে এখনো হয়তো ভবন তৈরি হয়নি, তবে সেই দিন খুব দূরে নয়।

নিজেকে আমি সব সময় ছাত্র ভাবতে পছন্দ করি। আর আজ তোমাদের সামনে উপস্থিত এই মানুষগুলোর কাছ থেকেই আজীবন শেখা যায়। তোমরা তাঁদের জনতার সেবক বলতে পারো। কিন্তু তাঁরা আসলে কাজ করছেন মানবতার জন্য। এত গুণী মানুষের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার রীতিমতো মাথা ঘুরে যাচ্ছে!

মানবতার জন্য কাজ করাই যে মানুষের দায়িত্ব, আজকের দিনে আমরা সেটা ভুলতে বসেছি। গণমাধ্যম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই অবক্ষয়ের পেছনে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। মঞ্চে উপবিষ্ট মানুষগুলো কিন্তু বড় বড় কথা বলে সময় নষ্ট করেননি। নজরকাড়া সব শিরোনামের ভিড়ে তাঁদের কাজ হয়তো গুরুত্ব পায়নি। আদতে তাঁদের কাজগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যে চট করে এক শিরোনামে সেটা বোঝানো সম্ভব নয়। আমাদের সমাজে কম গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোই আমরা নিয়মিত ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উদ্‌যাপন করতে ব্যস্ত। এত সবের মধ্যেও এই মানুষগুলোর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটা সুযোগ আজ তৈরি হয়েছে, এমন মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত।

ভেবে দেখো, এই বিজ্ঞানী, জনসেবক, অ্যাকটিভিস্টরা কিন্তু ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার বাড়াতে ব্যস্ত হননি। ইউটিউবে কত ‘ভিউ’ জুটল, এসব নিয়ে তাঁরা ভাবেন না। কিন্তু তাঁরা সত্যিই আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলছেন। তাঁদের কাজ আমাদের জীবনকে সুগঠিত, নিরাপদ, উন্নত ও আধুনিক করছে। সমগ্র মানব জগতের উন্নতির জন্য তাঁরা কাজ করছেন, স্রেফ নিজের জন্য নয়। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ তাঁদের লক্ষ্য নয়; বরং মানবজাতির জীবনে উন্নতি আনাই তাঁদের লক্ষ্য। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটা খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক মনে হয়। তোমরাও হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবে।

তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পেরে আজ বেশ চাঙা অনুভব করছি। এটা ভেবে খুব স্বস্তি পাই যে এই প্রজন্মই প্রথম নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। এমন একটা পৃথিবী কল্পনা করো, যেখানে নারী-পুরুষের অধিকারে অসামঞ্জস্য নেই। কত সম্ভাবনাই না লুকিয়ে আছে এর মাঝে! যেসব কুসংস্কার, ভুল মূল্যবোধ নারীদের পিছিয়ে রাখে, তোমরা সেসব ভেঙে ফেলছ। এই উদ্যোগ নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আমাদের একটা সুন্দর পৃথিবী দেবে।

আগেই বলেছি, আমৃত্যু আমি একজন ছাত্র। আমি বিশ্বাস করি, এই বৈশিষ্ট্য আমাদের সবার মধ্যে থাকা উচিত। তবে এটাও ঠিক, আমরা এমন একটা সময়ে বসবাস করছি, যখন সুশিক্ষা অর্জন করা খুব কঠিন। কিন্তু মনে রেখো, আর সবকিছুর মতোই সুশিক্ষার ক্ষেত্রেও একটা কথা সত্য—যদি যথেষ্ট চাহিদা থাকে, তাহলে সরবরাহও থাকবে। প্রিয় স্নাতক, তোমরা ভাবতে পারো তোমাদের শিক্ষাজীবন শেষ। কিন্তু আমি তোমাদের অনুরোধ করব, এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পৃথিবীব্যাপী সুশিক্ষার ক্ষুধা তোমরা আরও জোরদার করবে। ব্যক্তিগতভাবে কিংবা দলবদ্ধ হয়ে লেগে পড়ো, মানুষকে অনুপ্রাণিত করো। তোমার অর্জন সম্পর্কে কথা বলো। বিনত হও, কিন্তু অতি বিনত হয়ো না। অদৃশ্য হয়ে থেকো না। স্রেফ অংশগ্রহণ করবে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব জানান দেবে না, তা হবে না। যদি শুধু পর্দার আড়ালেই থাকো, মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে কীভাবে? আমাদের আগের প্রজন্মে হয়তো সেটা সম্ভব ছিল, এখন আর সম্ভব নয়।

তোমার কার্যক্রম যেন পৃথিবীজুড়ে সুশিক্ষার ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দেয়। সুশিক্ষা না থাকলে মানবতা থাকবে না। আর যদি সুশিক্ষার যথেষ্ট চাহিদা না থাকে, তবে তা তুমি পাবে না। এনওয়াইইউর শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের আবারও ধন্যবাদ। ধন্যবাদ মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের। আপনাদের অবদান, নেতৃত্ব, অনুপ্রেরণার জন্য জানাই অসীম কৃতজ্ঞতা।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. সাইফুল্লাহ

সূত্র: টাইম সাময়িকীfavicon59-4

Leave a Reply