‘পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মজার মজার ছড়া বলতাম’

‘পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মজার মজার ছড়া বলতাম’

  • লিডারশিপ ডেস্ক

অসংখ্য শিশু তাঁর হাতে নতুন জীবন পেয়েছে। শিক্ষক হিসেবেও তিনি অতুলনীয়। বাংলাদেশে শিশুচিকিৎসার পথিকৃৎ জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান। প্রতিষ্ঠানতুল্য এ মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়াল-এ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার। তাঁর আত্মজীবনী জীবনের জলছবি থেকে খানিকটা অংশ আজ থাকল পাঠকদের জন্য।


 ১৯৮৮ সাল। আইপিজিএমআর (বর্তমানে যেটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে আমার বিদায় নেওয়ার পালা এসে গেল। আমি হয়তো চেষ্টা করলেই চুক্তিভিত্তিক চাকরির মেয়াদ আরও বাড়াতে পারতাম। কিন্তু তা আমি করিনি। কারণ, তাতে আমার নিকটতম সহযোগী অধ্যাপকগণ সিনিয়র পজিশন-এ দায়িত্বলাভে বাধাগ্রস্ত হতেন। সেটা কোনো ক্ষেত্রেই কাম্য হতে পারে না। আর আমার অবসরজীবনের পরবর্তী সময়টা নিয়ে আমার তেমন ভাবনা ছিল না। কেননা চিকিৎসাসেবা ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার যে সুযোগ, সে ব্যবস্থা আমি আগেই করে রেখেছিলাম।

যাই হোক, ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে আমি আইপিজিএমআর থেকে তথা পাবলিক সার্ভিস থেকে অবসর গ্রহণ করলাম। আমার সব স্টুডেন্ট, সহকর্মী ডাক্তার, নার্স, সাধারণ কর্মচারী সবাই মিলে আমার জন্য একটা বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করলেন। এত বড় পরিসরে কোনো বিদায় অনুষ্ঠান ইতিপূর্বে আইপিজিএমআর-এ হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। চার দিন ধরে চলছিল এ বিদায় সংবর্ধনা আয়োজন। সকালে এক গ্রুপ তো বিকেলে আরেক গ্রুপ বা বিভিন্ন বিভাগের বিদায় সংবর্ধনা প্রদান পর্বে আমাকে থাকতে হচ্ছে। প্রথমে প্রফেসররা, তারপর ডাক্তার ও নার্সরা, পরে স্টুডেন্টরা, সব শেষে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা বিদায় সংবর্ধনা জানালেন। আমার সেই পরিণত বয়সে আবেগটা কমই থাকার কথা। তারপরও খুব খারাপ লাগছিল। কারণ, যে আইপিজিএমআর-এ প্রতিষ্ঠাকাল থেকে টানা প্রায় ১৮ বছর কাজ করেছি, সেখান থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়টাই তো কেটেছে এই আইপিজিএমআর-এ। সহকর্মীদের বেশির ভাগই ছিলেন বেদনা-ভারাক্রান্ত। এমনিতেই আমার সঙ্গে সব সহকর্মীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত ছিল। অনেকে বক্তৃতা করলেন। আমার কাজের, দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করলেন। কেউ কেউ বললেন, ‘স্যার, আপনি তো চলে যাবেন, কিন্তু আপনার মতো এমন দরদি মন পাব কি না জানি না…।’ …ছাত্রদের যখন পড়িয়েছি, তখন খেয়াল রেখেছি, যেন তারা ‘বোর’ ফিল না করে। যে কারণে আমি পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মজার মজার ছড়া বলতাম, জোকস বলে তাদের একঘেয়েমি দূর করার চেষ্টা করতাম। কথায় বলে—

বিশ্রাম কাজের অঙ্গ একসঙ্গে গাঁথা

নয়নের অঙ্গ যেমন নয়নেরই পাতা।

Dr-300x169তখন অনেকে বলতেন, আমি এটা কেন করি? উত্তরে বলতাম, এক-দেড় ঘণ্টার ক্লাসে লেকচার শুনতে শুনতে ওরা যাতে ‘বোর’ হয়ে না যায়। ওরা যেন বিরক্ত না হয়, তাই আমি এটা করি। কাজের মাঝে কিছুটা বিনোদন থাকলে কাজটা আনন্দের হয়ে ওঠে। এতে মনের বিশ্রাম হয়।

আরেকটা মজার ব্যাপার ঘটল ছাত্রছাত্রীরা যখন আমাকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে এল, তখন একজন ছাত্র একটা খাতা নিয়ে এল, বলল—গত এক বছরে স্যার যত ছড়া ও জোকস বলেছেন, সব এখানে নোট করা আছে। কথাটি বলে সে একটা একটা করে মোট ৩৬টি ছড়া পড়ে শোনাল। এতে সবাই খুব অবাক হলো। কারণ, অনেকেই ছড়া শুনেছে, কিন্তু খেয়াল রাখেনি। এই ছাত্রটি কাজের মাঝে বিনোদন জিনিসটাকে উপলব্ধি করেছে, তাই সে ছড়াগুলো লিখে রেখেছে।

একজন ছাত্র বিদায়ের আগে তাদের কিছু উপদেশ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করল। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমিও নিজের কথা কিছু বললাম, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রতি আমার কিছু উপদেশ দিলাম। চিকিৎসকদের প্রতি উপদেশ হলো—তোমরা তো চিকিৎসক। রোগী ও তাঁর স্বজনেরা যখন বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়, তাঁদের জানা উচিত—রোগটা কী হয়েছে, সারবে কত দিনে, সারবে কি না, বা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো কী—এসব বিষয়ে কিন্তু বিস্তারিত আলোচনা সব সময় করা হয় না। ফলে রোগীর আত্মীয়স্বজন অন্ধকারে থাকেন। এতে রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম সংকটজনক হয়।

কোনো কোনো ডাক্তার সাধারণভাবে ধরে নেন, রোগী বা তাঁর আত্মীয়স্বজন তাঁরা রোগ সম্পর্কে কী বোঝেন! যা করব, তা তো আমরা ডাক্তাররাই করছি। কিন্তু এতেই মাঝেমধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হয়। রোগী এল, চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল, সেই সব ক্ষেত্রে তেমন কোনো কথা হয় না। কিন্তু রোগী ভর্তি হলো, ডাক্তাররা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, রোগীর আয়ু নেই বলে মারা গেলেন। কিন্তু রোগীর স্বজনেরা যদি বাড়ি ফেরার সময় বলতে বলতে যান, ডাক্তারদের অবহেলায় রোগী মারা গেছেন; আমি তখন এখানে থাকব না, কিন্তু এই কথাটা আমার কানে এলে আমি দুঃখ পাব।

সুতরাং ডাক্তারদের চেষ্টা করতে হবে, যাতে রোগী এবং আত্মীয়স্বজনকে রোগীর শরীরের প্রকৃত সমস্যাটি তুলে ধরে তাঁর চিকিৎসার সামগ্রিক বিষয়াদি স্পষ্টভাবে জানানো হয়। এটা যদি করা যায়, তাহলে আমি বলব, ডাক্তার হিসেবে আপনি সার্থক। এই পরামর্শ আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের দিয়েছিলাম। কারণ, আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে এ সমস্যাটিই প্রকট। রোগী ও তাঁর স্বজনদের জানানোর চেষ্টাটা খুব কম হয়। তাঁর রোগের প্রকৃত অবস্থা কী এবং তাঁর নিরাময় পুরো সম্ভব, কি সম্ভব না বা তাঁর চিকিৎসার জন্য কত দূর করা যাবে, কত দূর যাবে না অথবা তাঁর সুচিকিৎসা কোথায় যথাযথভাবে হওয়া সম্ভব। এগুলো আগেই স্পষ্ট করে অর্থাৎ কাউন্সেলিং করে নিলে ডাক্তার, রোগী ও রোগীর আত্মীয়স্বজনদের সম্পর্কে কোনো তিক্ততা সৃষ্টির সুযোগ থাকে না। প্রতিটি চিকিৎসকেরই উচিত রোগী বা তাঁর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ঠিকমতো কাউন্সেলিং করে নেওয়া।

আরেকটা বিষয় আমি বর্তমান প্রজন্মের চিকিৎসকদের প্রতি বলব, আপনার জন্য অপেক্ষমাণ কোনো রোগী বা তাঁর আত্মীয়স্বজনকে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। যতই ব্যস্ততা থাকুক আগে, তাঁকে দেখুন, তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, তাঁর অবস্থাটা বুঝে তবে একটা ব্যবস্থা দিয়ে যান। যদি বোঝেন যে সিরিয়াস কিছু না, তাহলে তাঁকে পরবর্তীতে সময় দিন। কিন্তু আপনার অমনোযোগিতার কারণে কোনো রোগীর ক্ষতি হলে এ অপরাধবোধ আপনার মনোকষ্টের কারণ হবে।

আমি ব্রিটেনে প্রায় সাড়ে ছয় বছর উচ্চতর চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম, সেখানে দেখেছি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা হাসপাতালগুলোতেও ঘুরে দেখেছি, উন্নত বিশ্বের ডাক্তাররা রোগী ও তাঁর আত্মীয়স্বজনকে সামগ্রিক খুঁটিনাটি বিষয়াদি জানিয়ে, তাঁদের সঙ্গে কাউন্সেলিং করে চিকিৎসাসেবা দেন। কিন্তু আমাদের দেশে রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা প্রায়ই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকেন যে তাঁদের রোগ সম্পর্কে কোনো ধারণা না দিয়েই চিকিৎসা কার্যক্রম চলে, তাঁরা ভালো-মন্দ কিছুই বুঝতে পারেন না। যে কারণে ডাক্তারদের সম্পর্কে অভিযোগ উঠছে। তবে এ কথা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অনেকেই আছেন রোগীদের সঙ্গে নিয়মিত কাউন্সেলিং করে চিকিৎসা দেন। তবে রোগীকে বা তাঁর আত্মীয়স্বজনকে সাধারণ ভাষায়, তাঁরা যেন সহজে বুঝতে পারেন এমন ভাষায় বোঝাতে হবে। আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে ডাক্তারদের এ বিষয়টার প্রতি নজর দিতে হবে। চিকিৎসাশাস্ত্রের নৈতিকতার স্বার্থেই সেটা করতে হবে।

সূত্র: প্রথম আলোfavicon59-4

Leave a Reply