বন্যার পূর্বাভাস মিলবে ৬ মাস আগেই

বন্যার পূর্বাভাস মিলবে ৬ মাস আগেই

  • লিডারশিপ ডেস্ক

বন্যা, খরা ও জলোচ্ছ্বাসের আগাম বার্তা পাওয়া যাবে ছয় মাস আগেই। কথাটি অবাস্তব মনে হচ্ছে? না, কথাটি সত্য এবং যে মডেল এমন তথ্য দিতে সক্ষম ইতিমধ্যে তা ১১ বছর ধরে সফলতার সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক বিজ্ঞানী এমন একটি মডেল আবিষ্কার করতে যখন ব্যর্থ তখন আবিষ্কারক হিসেবে চমক জাগালেন নরসিংদী জেলার ছেলে জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী।

দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বিপদকে কিছুটা লাঘব করতে সক্ষম। তবে ক্ষয়ক্ষতি যা হওয়ার দুর্যোগকালীন হয়ে যায়। আর সে কারণেই দুর্যোগ-পূর্ববর্তী ব্যবস্থা নেওয়া থাকলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শূন্যতে আনা সম্ভব। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ড. রাশেদ চৌধুরী ছয় মাস আগে দুর্যোগ পূর্বাভাস প্রদানের মডেল আবিষ্কার করেন। রাশেদ চৌধুরী এল নিনো ও লা নিনার গতিবিধি পরীক্ষা করে বন্যা পূর্বাভাসের নতুন এই পদ্ধতিটি বা মডেল উদ্ভাবন করেন। তার উদ্ভাবিত ‘এনসোভিত্তিক আগাম পূর্বাভাস’ হয়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য। দু-তিন দিন আগে পূর্বাভাস দিলে বন্যা-আক্রান্ত এলাকার মানুষ ফসল ও সম্পদ রক্ষা করার প্রয়োজনীয় সময় পান না। ফলে যত আগে পূর্বাভাস দেওয়া যাবে, সাধারণ মানুষের জন্য তত বেশি সুবিধা হবে। তখন মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দুই থেকে তিন মাস আগে থেকে পূর্বাভাস পাওয়ার চাহিদা রয়েছে বলেও দেখতে পান।

সাধারণ জীবনযাপন করা রাশেদ চৌধুরীর ছোট থেকে বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরেই। গ্রামের সঙ্গে সম্পর্কটা আগাগোড়াই ভালো ছিল। ঢাকায় মাধ্যমিক পাস করে চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সম্মান ও বুয়েট থেকে সম্মানোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার পাট শেষ করে ১৯৮৩ সালে রাশেদ চৌধুরী যোগ দিয়েছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে। শুরুতে তিনি পানি নিয়ন্ত্রণ প্রকৌশল বিভাগে যোগ দিলেও পরে তাকে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন থেকেই তার চিন্তা ছিল এমন কিছু করার, যাতে মানুষ দুর্যোগের পূর্বাভাস যথাযথ সময়ে পেয়ে সঠিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সে সময় খুব বেশি কিছু করতে সক্ষম হননি। এরপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশে ১৯৯১ সালে জাপানে চলে যান। প্রথমে ট্রেনিং পরে পিএইচডি করার সুযোগ মেলে।

১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে রাশেদ চৌধুরী বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করেন। তখন ৪৮ ঘণ্টা আগে পূর্বাভাস দেওয়া হতো। উজানের পানি ও বৃষ্টিপাতের ধরন দেখে তারা বলে দিতেন, দেশের কোন কোন নদীতে পানির প্রবাহ বাড়বে। কোথায় কোথায় বন্যার পানি আসতে পারে। সেই পূর্বাভাস যখন দেওয়া হচ্ছিল তখন রাশেদ ভাবছিলেন, কীভাবে সাত-আট দিন আগে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া যায়। কিন্তু তার উদ্যোগ বাস্তবায়নের তেমন সুযোগ মেলে না। ছয় মাস পরে আবার তিনি জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর আর্থ সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন সেন্টারে দুই বছর মেয়াদি পোস্ট ডক্টরাল করতে জাপান ফিরে যান। ওই সময় তিনি ঢাকার বন্যার পানির গভীরতা ও ধরন নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাও করেন। এরপর দেশে এসে আবার সরকারকে তার কাজের জন্য অনুরোধ করেও কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি।

২০০১ সালে রাশেদ পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং সায়েন্টিস্ট হিসেবে। সেখানে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে জলবায়ু পূর্বাভাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দুই বছর মেয়াদি ওই গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ছয় মাস আগে থেকে ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া। বাংলাদেশের বন্যা ও ঝড়ের পূর্বাভাসও ওই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ধরন ও পানিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিমাপ করে বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি।

২০০৩ সালে দেশে ফিরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রে আবারও যোগ দেন রাশেদ। বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনাও করেন। কিন্তু তখনো ইতিবাচক ফল আসে না। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে এ বিষয়ে গবেষণা যখন বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তখন রাশেদের ডাক আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারে কাজ করার। নিজের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাজে লাগানোর এই সুযোগে সাড়া দিয়ে তিনি আবারও যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। গবেষণাকাজে যোগ দেন হাওয়াই দ্বীপের বিশ্ববিদ্যালয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া বিভাগ ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা নিয়ে গবেষণা করতে ওই অঞ্চলের হাওয়াই দ্বীপের হনুলুলুতে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দ্বীপবাসীকে দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দেওয়া। একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি ২০০৩ সালে যোগ দিলেন হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সেবা বিভাগের আওতায় প্রতিষ্ঠিত ওই গবেষণা সংস্থায় খুব দ্রুতই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।

পূর্বাভাস পেয়ে ওই দ্বীপবাসী বন্যা-ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারছে। ফলে ফসলের চাষ করা থেকে শুরু করে মাছ ধরার পরিকল্পনা নেওয়ার মতো বিষয়ে ওই পূর্বাভাস তাদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওই দ্বীপগুলোর সম্পদ ও প্রাণহানির পরিমাণও কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দ্বীপগুলো থেকে এই পূর্বাভাস দেওয়ার আবেদন আসছে। প্রশান্ত মহাসাগর-তীরবর্তী অনেক দেশ এই পূর্বাভাসব্যবস্থা চালু করার জন্য রাশেদের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছে। ছয় মাস আগেই যখন এ ধরনের পূর্বাভাস পাওয়া যায় তখন বিজ্ঞপ্তি, রেডিও, টিভি, সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা হয়। তারা আগে থেকেই দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন হয়।

মানুষের কল্যাণে রাশেদ চৌধুরী সবসময় কাজ করতে চেয়েছেন। এখনো সেই ইচ্ছা থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের দেশের জন্য কাজ করতে বার বার ফিরে এসেছেন। প্রতি বছর তিনি দেশে আসেন এবং আবহাওয়ার উপাত্ত ও তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে প্রতি বছরই দেশের জন্য পূর্বাভাস দিচ্ছেন। তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে দুর্যোগ-পরবর্তী মোকাবিলা অনেকটা এগিয়ে গেছে। উল্লেখ করার মতো সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছেন দুর্গতরা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমার আবিষ্কৃত এই মডেলের সুফল তারা সরকারি স্বীকৃত মাধ্যমে উপভোগ করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘দেশে কাজ করার সুযোগ পেলে এখনো করতে চাই। দেশের বন্যা, খরা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসকবলিত মানুষের জন্য পূর্বাভাস দিয়ে তা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করতে চাই।’ দেশের টানে মাটির টানে প্রতি বছর একবার করে হলেও তিনি ছুটি কাটাতে আসেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার পূর্বাভাস দিয়ে যান। তিনি চান শুধু সরকার নয়, এই বিষয়ে সচেতনতার জন্য গণমাধ্যমের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। তাই পূর্বাভাস পাওয়া মাত্রই সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এতে বিপদ অনেকাংশে কমবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিনfavicon59-4

Leave a Reply