বিল গেটসের কাছাকাছি জেফ বেজোস

বিল গেটসের কাছাকাছি জেফ বেজোস

  • লিডারশিপ ডেস্ক

দিন দশেক আগে বিল গেটসকে হটিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিশ্বের শীর্ষ ধনী হয়েছিলেন জেফ বেজোস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। শীর্ষ ধনীর আসন ধরে রাখতে না পারলেও মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর ‘রিয়েল টাইম’ শীর্ষ ধনীর তালিকায় বিল গেটস ও বেজোসের অবস্থান এখন খুব কাছাকাছি। বেজোসের সম্পদের পরিমাণ এখন ৮ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার আর গেটসের সম্পদমূল্য ৯ হাজার কোটি ডলার।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে যে হারে জেফ বেজোসের সম্পদ বেড়েছে তাতে ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির মর্যাদা তাঁর দখলেই থাকবে। স্বাভাবিকভাবে বেজোসের সম্পদ, ব্যক্তিজীবন, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, মানবকল্যাণে উদ্যোগ—সবকিছু নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রমিনেন্টের পাঠকদের জন্য ভবিষ্যতের শীর্ষ ধনী জেফ বেজোসের জীবনের নানা দিকের কিছু দিক তুলে ধরা হলো:


শুরুর জীবন

জেফ বেজোসের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১২ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কে। ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিকসের প্রতি ছিল তাঁর ব্যাপক আগ্রহ। ১৯৬০-এর দশকের জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক’-এর বিশেষ ভক্ত তিনি। স্কুলে পড়ার সময়েই নিজেদের বাড়ির গ্যারেজে তৈরি করেন একটি ছোট গবেষণাগার। বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কীভাবে কাজ করে তার খুঁটিনাটি জানতে দিনের বেশির ভাগ সময় ওই গ্যারেজেই পড়ে থাকতেন তিনি।

স্কুল ও উচ্চ মাধ্যমিক পেরোনোর পর জেফ বেজোস নিজের প্রিয় বিষয় কম্পিউটার অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ভর্তি হন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৬ সালে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রিন্সটন থেকে কম্পিউটার অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেন তিনি। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ওয়াল স্ট্রিটের তিনটি কোম্পানিতে কাজ করেন। ডিই শ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে ইন্টারনেটের অপার সম্ভাবনার কথা। ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে নতুন কী ব্যবসা দাঁড় করানো যায়, তখন সেটিই ছিল তাঁর মূল ভাবনা।

aaa26688888dfed378a715c83c708a79-5984ab137d5e2১৯৯৪ সালে ডিই শ-এর চাকরি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে চলে যান তিনি। সেখানে এক বছর গবেষণার পর নিজের বাড়ির গ্যারেজে ১৯৯৫ সালের ১৬ জুলাই প্রতিষ্ঠা করেন আমাজন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইনে বই বিক্রি করাই ছিল বেজোসের প্রথম ব্যবসা। প্রথম এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪৫টি দেশে অনলাইনে ২০ হাজার ডলার বা ১৬ লাখ টাকার বই বিক্রি করে আমাজন। সে সময় অনলাইনে বইয়ের এমন বিক্রি ছিল অনেকটা অভাবনীয়।

এরপর শুরু হয় আমাজনের জয়যাত্রা। ১৯৯৮ সালে বইয়ের বাইরে গান ও সিনেমার সিডি বিক্রি করতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৭ সালে ডিজিটাল মাধ্যমে বই পড়ার যন্ত্র ‘কিন্ডেল’ বাজারে নিয়ে আসেন বেজোস। স্ক্রেপহিরো নামের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আমাজনের পণ্যসম্ভারে ৪০ কোটি পণ্য আছে। নিত্যনতুন উপায়ে আমাজনের ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে ২৫ কোটি ডলারে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাটি কিনে নেন তিনি। বেজোস দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকাটি।

ট্রাম্পের সঙ্গে দাকুমড়ো

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেফ বেজোসের দা-কুমড়ো সম্পর্কের কারণ ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের যোগ্যতা নিয়ে বরাবরই সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছে বেজোসের মালিকানাধীন পত্রিকাটি। বিষয়টিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে ট্রাম্প এখন সুযোগ পেলেই বেজোস ও আমাজনকে আক্রমণ করেন। ট্রাম্প পত্রিকাটিকে ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘দ্য আমাজন ওয়াশিংটন পোস্ট’। তাঁর ভাষায়, ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর পরিবেশনকারী এই পত্রিকাটি ঠিকভাবে ইন্টারনেট কর দেয় না। ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্টিফেন মানুচিন সম্প্রতি ঘোষণা দেন, আমাজনের কর আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখা হবে।

বিলিয়নিয়ার হয়েও কৃপণ!

জেফ বেজোসের একটি বড় সমালোচনা হলো, বিলিয়নিয়ার বা শত কোটিপতি হলেও নিজের সম্পদ দান করার ব্যাপারে খুবই কৃপণ তিনি। এ ক্ষেত্রে বিল গেটস বা ওয়ারেন বাফেট, এমনকি ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের ধারেকাছে নেই তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫ ধনীর মধ্যে জেফ বেজোসই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ‘গিভিং প্লেজ’ কার্যক্রমে যোগ দেননি। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের আয় করা মোট সম্পদের অর্ধেক বা তার বেশি সম্পদ দান করার পরিকল্পনাই হলো গিভিং প্লেজ।

বিল গেটস যেখানে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দান করেছেন ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার, সে তুলনায় ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেজোস দান করেছেন মাত্র ১০ কোটি ডলার। অবশ্য গত জুনে নিজের সম্পদ কীভাবে মানবকল্যাণে ব্যয় করা যায় সে জন্য টুইটারে সবার পরামর্শ চান বেজোস। তবে ‘ব্লু অরিজিন’ নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেটি মহাকাশে পরিবহনের খরচ কমিয়ে আনার জন্য গবেষণা করছে। এ ছাড়া বেজোস ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন নামের পারিবারিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানেও অর্থ দেন তিনি।

চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন

বিজনেস ইনসাইডারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসায়িক সাফল্য জেফ বেজোসের বাহ্যিক চেহারা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। প্রমাণ হিসেবে বেজোসের ১৯৯৮ ও ২০১৭ সালের দুটি ছবি পাশাপাশি প্রকাশ করেছে গণমাধ্যমটি। সেটির তুলনা করে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে জেফ বেজোস ছিলেন এমন একজন যাকে দেখলে সাধারণ একজন ব্যবসায়ীর চেয়ে বেশি কিছু মনে হতো না। এর বিপরীতে বর্তমান সময়ের সানগ্লাস ও বিশেষ জ্যাকেট পরিহিত ন্যাড়া মাথার বেজোসকে দেখলে মনে হবে, তাঁকে দিয়ে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ, ফোর্বস, বায়োগ্রাফিডটকম, সিএনবিসিfavicon59-4

Leave a Reply