ভারত ভ্রমিয়া…

ভারত ভ্রমিয়া…

  • সাকীব মৃধা

চারজন মানুষ, চারটি শহর, চারটি হোটেল, চারটি ক্যামেরা, সাতটি ব্যাগ, সাতটি ফোন, এগারো রাত, বারোটি দিন, শত প্রকার খাবার, প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার আর অজস্র স্মৃতি!

হ্যাঁ, এমনই ছিলো আমাদের ভারত সফর। বাসে, ট্রেনে, প্লেনে বিরামহীন এক ভ্রমণ।

আমাদের সফর শুরু হয় ফেব্রুয়ারির ১৬তারিখ দিবাগত রাতে। কলাবাগান থেকে কোলকাতার বাস ছাড়ার নির্ধারিত সময় ১০:৪৫ এ হলেও ফেরির জ্যাম ছেড়ে আসতে দেরী হয়ে যায়, বাস ছাড়ে রাত ১:৩০ মিনিটে। এরপর ফেরিতে টানা চার ঘণ্টায় আমরা ফেরি পারাপার হই। আর বেনাপোল বর্ডারে পৌঁছুতে সূর্য বরাবর মাথার উপর। ইমিগ্রেশন পার হয়ে যাই কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই।

ভারতের পেট্রাপোলে প্রবেশের পর বাসস্ট্যান্ডে আমাদের বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করতে হয় ট্রানজিট বাসের জন্য। ওই বাস এলে আমরা কোলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হই এবং পৌঁছুতে প্রায় রাত ৮টা বেজে যায়। সম্পূর্ণ সফরটাই ঝোঁকের মাঝে হওয়ায় আগে থেকে আমরা কোথাও কোনও হোটেল বুক করিনি। তাই কোলকাতায় নেমে হোটেল খুঁজতে হলো, আর মনমতো পাওয়াও গেল।

বরফের বুকে স্কেটিং।

পরদিন সকালে উঠে প্রস্তুত হয়ে গেলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখতে। শ্বেত-মার্বেল পাথরে বানানো এই ভবনটি রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে বানানো হয়।

দুপুরে এক রেস্তোরাঁয় খেলাম কলিজা, সবজি, গরু-ভুনা। বলাই বাহুল্য, কোথাও কোনও মেন্যু আমরা একবারের বেশি চেখে দেখিনি, আর যতোবার যত জায়গায় গিয়েছি, চেষ্টা করেছি নতুন কিছু খাবার।

এরপর চলে গেলাম শিয়ালদহ রেলস্টেশনে, পরের গন্তব্য দিল্লী। ট্রেনের টিকেট দেশে থেকে কেটে যাওয়ায় খুব একটা হ্যাপা পোহাতে হয়নি। তবে, ফেরার টিকেট মেলেনি ভাগ্যে! তাই স্টেশনেই সবার মনস্থির করতে হয়েছে যে ফেরার সময় প্লেনে ফিরতে হবে।

সন্ধ্যার ট্রেন সঠিক সময়ে ছেড়ে যায় স্টেশন। প্রায় ১৫০০ কিলোমিটারের, ১৭ ঘন্টার যাত্রা। পরদিন দুপুর ১টায় দিল্লী স্টেশনে পৌঁছোয় আমাদের ট্রেন। সেখান থেকে ওই দিনই আমরা মানালির উদ্দেশ্যে রওনা হই! হ্যাঁ, বলাই হয়নি, মানালিই আমাদের ট্যুরের প্রধান গন্তব্য।

দিল্লি থেকে মানালিতে বাসে যেতে সময় লাগে আরো ১৫ ঘন্টা। ১৮ তারিখ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ছাড়ে মানালির বাস। বাসে ওঠার আগেই আমরা উষ্ণ কাপড় বের করে নেই ব্যাগ থেকে, কেননা ঢাকা আর  কোলকাতায় যখন প্রায় ৩০ডিগ্রি সেলসিয়াস, তখন দিল্লিতে ২০ এর মত, আর মানালিতে ২, আর বরফ পড়ার সম্ভাবনা!

মানালিতে পৌঁছুতে পারিনি, তার অনেক আগেই আমাদের বাসের চালক বাসের এসি বন্ধ করে দিয়েছেন, বাইরে এতোটাই ঠান্ডা। রাতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো দেখতে না পেলেও, বাস যেভাবে চলছিলো তাতে অনুমান করে নেয়া গেছে!

ভোলানাথ মন্দির। ছবি: লেখক

সূর্যোদয় যখন হচ্ছিলো তখন আমরা প্রথম বরফ দেখলাম পাহারগুলোর চূড়ায়। সূর্যের আভায় চকচক করছিলো বরফ। মানালিতে আমরা যখন পৌঁছুই তখন সূর্য উঠে গেছে অনেকখানি! নামতেই দালালরা ঘিরে ধরে, কোথায় যাবেন, কোন হোটেল বুকিং নিয়েছেন, কতোদিন থাকবেন, কোথায় কোথায় ঘুরবেন, ট্যাক্সি লাগবে, নানান প্রশ্ন।

আগেই বলেছি, আমরা আগের থেকে কিছুই ঠিক করিনি। তাই এদের মধ্যেই একজনকে বেছে নিতে হলো আমাদের হোটেল খোঁজার জন্য। নিরাশ হতে হয়নি। চারজনের জন্য ভদ্রলোক একটা হোটেলে সুইটের ব্যবস্থা করে দিলেন, তাও আমাদের খরচসীমার মধ্যেই। আর হোটেলটা ছিলো বাজারের একেবারেই কাছে। সেখানে আমাদেরকে একটা প্যাকেজ বেছে নিতে হলো। এর মধ্যে ছিলো আমাদের থাকা, সকালের নাস্তা, রাতের খাবার আর সারাদিন ট্যাক্সি সার্ভিস।

প্রথম দিনে প্রথমে আমরা গেলাম সোলাং ভ্যালি। একগাদা কাপড়, হাতমোজা, পা-মোজা, আর বয়লার স্যুটের মতো কিছু একটা পরে পুরো এস্কিমো সেজে! সেখান থেকে আমরা চলে যাই জামুলা মন্দিরে। কাঠের কারুকাজে তৈরি মন্দিরটিতে উষ্ণ প্রস্রবণ আছে, সবাই সে গরম পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নেয়, সেখানে গোসল করারও ব্যবস্থা আছে। মন্দিরের পাশেই দুপুরের খাবার সেরে আমরা চলে যাই হিদিম্বা মন্দিরে। এই মন্দিরের সব থেকে বড় বিশেষত্ব পুরো মন্দির ঘিরে রয়েছে বিশেষ জাতের বিশাল বিশাল দেবদারু গাছ।

দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে যায়, হু হু বাতাস ঠান্ডার জানান দেয়। আমরাও ফিরে যেতে থাকি আমাদের হোটেলে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আমরা বাজারে যাই স্থানীয় খাবাবের খোঁজে।

আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিলো আমরা যতোটা সম্ভব স্থানীয় খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবো। মানালিতে আসার সময় হরিয়ানাতে যখন আমাদের বাস থামে, সেখানেও আমরা স্থানীয় সবজি আর ডাল দিয়ে লুচি খেয়েছিলাম। বলে রাখি, ওরা লুচিকে পুড়ি বলে! সে রাতের জন্য আমরা ক্ষান্ত হই, কেননা পরদিন আমাদের জন্য বড় আকর্ষণ অপেক্ষা করছিল।

পরদিন সকালে উঠে আমরা প্যারাগ্লাইডিং, রিভার র‌্যাফটিংয়ের জন্য বের হই। আকাশ থেকে ঝাপ দিয়ে কিছুক্ষণ পর নৌকায় পাথুড়ে নদী পাড়ি দিবো। সবার মধ্যেই শিহরণ কাজ করছিলো। কিন্তু সকালে বের হবার সময়ই টের পেলাম, আবহাওয়া ভালো না! প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফিরে আসতে হয় সেদিন, কেননা তীব্র বাতাস আর বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে প্যারাগ্লাইডিং করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এমনেই পাহাড়ি এলাকা, প্রায় ১০ মিনিট ধরে বাতাসে ভেসে ২৫০০ ফুট নিচে নেমে আসতে হয়। ঝড়ো বাতাসে যেকোনরকম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

অগত্যা নেমে আমরা চলে গেলাম রিভার র‌্যাফটিংয়ের জন্য। আমাদের চারজনের সাথে আরও দুজন স্থানীয় ছিলেন যারা র‌্যাফটিংয়ে পারদর্শী। খুব বন্ধুবৎসল রবিন আর সাগর নামের দুই সারেঙের সাথে আমরা বরফঠান্ডা পানিতে বেলুনের নৌকা নিয়ে ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম। যদিও সবাইকে লাইফজ্যাকেট ও হেলমেট দেয়া হয়েছিল। আমাদের সফরসঙ্গী তামজিদ সাঁতার না জানায় বেশখানিকটা ভয়ে ছিল। তবে, মুখে ছিলো তৃপ্তির হাসি।

আহা! র‌্যাফটিং !!

র‌্যাফটিং শেষে আমরা একটা তিব্বত আশ্রমে যাই। আশ্রমটা পাহাড়ের কোলে এক অসাধারণ স্থাপত্য। আমরা পুরো বিকেলটাই সেখানে কাটিয়ে দিয়ে সন্ধ্যার পর রওনা দিয়ে ক্লান্ত শরীরে ফিরি হোটেলে। এর মধ্যে প্যারাগ্লাইডিং আর ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্যে আমাদের মানালিতে থাকার দিন একদিন বেড়ে গেছে।

পরদিন সকাল সকাল সবাই বেরিয়ে পড়ি প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্য। শুনেছিলাম আবার বৃষ্টি হতে পারে, হলেই আমাদের আকাশ থেকে লাফানো শেষ!

বেজ থেকে প্রায় ২৫০০ মিটার উপরে নিয়ে যাওয়া হয় ছাদখোলা জীপে। সবাইকে একজন অভিজ্ঞ প্যারাগ্লাইডারের সাথে যেতে হয়, তিনিই বাতাসের সাথে উড়িয়ে ঘুড়িয়ে নেন আমাদের মতো কিছু ভ্রমনপিপাসু মানুষদের।

প্রথমের শরীরে পড়ানো অনেকগুলো জিনিসপত্র, ব্যাগ খুব ভারী মনে হচ্ছিলো। কিন্তু, পাহাড় থেকে লাফ দেয়ার পর এমন আর কিছুই মনে হচ্ছিলো না। জীবনে অনেক অনেকবার শুনেছি, বলেছি, ‘মনে হচ্ছে আকাশে বাতাসে ভাসছি’। সেদিন সত্যিই আকাশে ভাসছিলাম। চারিদিকে পাহাড়, নিচে বেস নদী, গাছ গাছালী, পাহারের উপর নানান রঙের বাড়িঘর; এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। প্রায় ১০মিনিট আকাশে ভেসে যখন মাটিতে নেমে এলাম, নিজেকে অন্য এক মানুষ মনে হলো।

যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছি!

সে রাত থেকে পরদিন চলে গেলাম দিল্লি। এবারের গন্তব্য আগ্রা। আগ্রার তাজমহল না দেখে ভারত ছাড়বো তো ভাবাই যায় না। কিন্তু সেদিন বিকেলে পৌঁছাতে রাতটা থেকে গেলাম আগ্রায়। পরদিন সকালে তাজমহল আর আগ্রাদুর্গ দেখব।

ভাবা অনুযায়ীই কাজ করলাম, সকালে উঠে নাস্তা সেরে আমরা তাজমহল দেখতে চলে গেলাম। সে এক অনবদ্য স্থাপনা। ছোটবেলা থেকে এর নাম শুনে এসেছি, ভেবেছিলাম খুব ভালো লাগবে না বোধহয়, হয়তো মানুষ বাড়িয়ে বলে। কিন্তু, সামনে গিয়ে টের পেলাম আমার ধারণা কতোটা ভুল ছিল। সম্পূর্ণ শ্বেত মার্বেল-পাথরে তৈরি তাজমহল যেকোনো দিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। এ এক অন্যরকম অনুভূতি।

তাজমহলের পর আমরা আগ্রা দুর্গে আসি। আগ্রা দুর্গ দেখা শেষে আমরা আবার দিল্লির উদ্দেশ্য রওনা হয়ে দিল্লিতে যখন পৌঁছাই তখন মাঝরাত।কোনরকম একটা হোটেলে রাতযাপন করে পরদিন দেখলাম দিল্লি গেট, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার আর দুপুরে খেলাম দিল্লির বিরিয়ানী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশে আমরা দিল্লিকা লাড্ডু বলতে বলতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেললেও, স্বয়ং দিল্লিবাসীই জানেন না দিল্লিকা লাড্ডু কী জিনিষ!

আগ্রা দুর্গ। ছবি: লেখক

সে যাই হোক, ওই রাতেই আমরা প্লেনে করে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর থেকে কোলকাতার নেতাজি সুভাস চন্দ্র বোস বিমানবন্দরে আসি। আর পরের সকালে দেশের উদ্দেশ্যে বাসে উঠি। আর এভাবেই শেষ হয় আমাদের ১২ দিনের ভারত সফর!

Leave a Reply