পুরান ঢাকার পুরাকীর্তি

পুরান ঢাকার পুরাকীর্তি

  • অভিজিৎ দাস

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ নগরী। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই শহরের ইতিহাস ৪০০ বছর ধরে রচিত হয়েছে। মুঘল শাসন, ব্রিটিশ শাসন ও পাকিস্তান শাসনামলে এই শহর যেমন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনই এই নগরী ছিল অনেক প্রতিবাদ ও পরাধীনতাবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। ঢাকার শিল্পকলার মধ্যে মসলিন কাপড় জগদ্বিখ্যাত ছিল। এছাড়া বাংলা অঞ্চলে সাহিত্য সংস্কৃতি প্রসারে ঢাকার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মসজিদ-মন্দির, জমিদারবাড়ি, প্রাচীন স্থাপত্যকলার বিভিন্ন নিদর্শনের সংখ্যাও ঢাকায় প্রচুরসংখ্যক ছড়িয়ে আছে।

১। সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি

বিংশ শতকের শুরুতে জমিদার রেবতীমোহন দাস এই চমৎকার প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। এটি সূত্রাপুরের আর এম দাস রোডে অবস্থিত।

রেবতীমোহনের পুত্র সত্যেন্দ্র কুমার দাস সূত্রাপুরের ওয়াল্টার রোডে বৈদ্যুতিক বাতি বসানোর জন্য অর্থপ্রদান করেন, তাই রোডটির একাংশের নাম তার পিতা রেবতীমোহনের নামানুসারে আর এম দাস রোড রাখা হয়। দেশবিভাগের সময় এখানের বাসিন্দারা ভারতে চলে যান আর প্রাসাদটি শত্রুসম্পত্তি হিসেবে সরকারের মালিকানায় আসে। বর্তমানে এটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও সিভিল ডিফেন্স এর কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পুরো ভবনটি দুটি তিনতলা দালান, যাদের দক্ষিণপাশের ভবনটি বেশি পুরানো। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও বাড়িটি এক একর জায়গা জুড়ে নির্মিত। প্রতিটি দালানে প্রায় ৩৫টি ছোটবড় ঘর আছে।

সূত্রাপুর জমিদারবাড়ি

২। শঙ্খনিধি স্থাপত্য

শঙ্খনিধি হাউজের সামনের অংশ

বিশ শতকের শুরুর দিকে লালমোহন সাহা বণিক, ভজহরি সাহা বণিক ও গৌর নিতাই সাহা বণিক ব্যাবসায় বেশ উন্নতি লাভ করেন। বিত্তশালী হওয়ার পর তারা বণিক উপাধি বর্জন করে ‘শঙ্খনিধি’ (শঙ্খের বাহক) উপাধি গ্রহণ করেন। ১৯২০-১৯২৬ সালের দিকে তাঁরা ঢাকার কিছু ভূসম্পত্তির মালিক হন এবং সেখানে কিছু ভবন নির্মিত হয়। ঢাকার টিপু সুলতান রোড থেকে ওয়ারীর র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে এই ভবনগুলো গড়ে ওঠে। এসব ভবনের মধ্যে নিম্নলিখিত চারটি ভবন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হয়:

ক) শঙ্খনিধি হাউজ

খ) শঙ্খনিধি নাচঘর

গ) ভজহরি লজ

ঘ) রাধাকৃষ্ণ মন্দির

এসব স্থাপনার মধ্যে ভজহরি লজ আর শঙ্খনিধি নাচঘর পুরোপুরি ভাঙ্গা, রাধাকৃষ্ণ মন্দির অর্ধেক ভাঙ্গা আর শঙ্খনিধি হাউজ পুরোপুরি দখলকবলিত।

লালমোহন সাহা ও গৌর নিতাই সাহা ঢাকার ৩৮ টিপু সুলতান রোডের এই প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকতেন। সম্ভবত এটি ১৯২১ সালে নির্মাণ করা হয়। আয়তাকার ভাবে চারিদিকে দ্বিতল দালানের কাঠামোয় সজ্জিত শঙ্খনিধি হাউজ। এর মাঝে একটি খোলা উঠান আছে। এর স্থাপত্যে গোথিক ইন্ডিয়ান ও ইন্দোসারাসিন রীতির প্রভাব দেখা যায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এর হিন্দু অধিবাসীরা ভারতে চলে যায় এবং ভবনটির মালিকানা পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে বহুবিধ দোকান, কলকারখানা ও লতাপাতার আচ্ছাদনে এককালের প্রাসাদসদৃশ বাড়িটি শ্রীহীন হয়ে কোনরকম টিকে আছে।

৩। কলম্বো শাহীব জোসেফ প্যাগেট সমাধি

পুরান ঢাকার নারিন্দায় (বর্তমান প্রবেশদ্বার ওয়ারীতে, শঙ্খনিধি হাউজের খুব কাছেই) ৩০০ বছরের পুরনো একটি খ্রিস্টান কবরস্থান রয়েছে। এই কবরস্থানে সংখ্যাতীত পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির সমাধি দেখতে পাওয়া যায় যেগুলোর মধ্যে কলম্বো শাহীব ও জোসেফ প্যাগেট এর সমাধি অন্যতম।

এই কবরস্থানের সবচেয়ে সুন্দর সমাধিসৌধটি হল কলম্বো শাহীব (সাহেব?) এর সমাধি। কলম্বো শাহীব কে, তার প্রকৃত পরিচয় জানা যায়নি। ১৭২৪ সালে তাকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়। সমাধিতে দ্বিতল কাঠামোর উপর একটি বড় গম্বুজ আছে। এর বিভিন্ন ধাপে আলঙ্কারিক মুক্ত স্তম্ভ রয়েছে। ভিতরে অনেকগুলো শিলালিপি দেখা যায়, যেগুলো অনেকাংশে ক্ষয়প্রাপ্ত। বর্তমানে এটি গাছপালা দিয়ে প্রায় সম্পূর্ণ আবৃত হয়ে পড়েছে।

কবরস্থানের সবচেয়ে পুরনো কবরটি হল জোসেফ প্যাগেট (প্যাজেট?) এর। তার পুরো নাম চ্যাপলিন রেভারেন্ড জোসেফ প্যাগেট। কলকাতার মন্ত্রী জোসেফ প্যাগেট ২৬ বছর বয়সে ১৭২৪ সালের ২৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

কলম্বো শাহীব সমাধি

৪। রোজ গার্ডেন

রাজপ্রসাদসদৃশ এই সুদৃশ্য স্থাপনাটি টিকাটুলীর কে এম দাস লেন (হৃষিকেশ দাস রোড) এ অবস্থিত। ১৯৩০ সালে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস সাত একর জায়গার উপর এই অট্টালিকা নির্মাণ করেন। ভবনের চারপাশে ফুলের বাগান ও একটি পুকুর খনন করেন। বাগানে গোলাপের আধিক্যের কারণে এটি রোজ গার্ডেন নামে পরিচিতি পায়।

এই ভবনের মালিকানা বহুবার বদল হয়। ১৯৩৭ সালে কাজী আবদুর রশীদ এটি ক্রয় করে নাম রাখেন রশীদ মঞ্জিল। ১৯৬৬ সালে এর মালিকানা পান হুমায়ূন বসির। ১৯৭০ সালে এটি বেঙ্গল স্টুডিয়োকে লিজ দেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালে এটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৯৩ সালে হুমায়ূন বসিরের বংশধর এর মালিকানা ফিরে পান।

ভবনটির ক্ষেত্রফল প্রায় সাত হাজার বর্গফুট আর উচ্চতা ৪৫ ফুট। এর বাইরের চোখজুড়ানো সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভিতরের কারুকার্যও মনোহর। দ্বিতীয় তলায় একটি আকর্ষণীয় বলরুম বা নাচঘর আছে। বেঙ্গল স্টুডিয়োর অধীনে এখানে বহু জমিদার ও পুরনো যুগের দৃশ্য চিত্রায়িত করা হয়েছে।

৫। ধানমণ্ডি শাহী ঈদগাহ

এই ঈদগাহটি ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম এটি নির্মাণ করেন। এটি ঢাকার প্রথম ঈদগাহ।

ঈদগাহের পশ্চিম প্রাচীরটিই কেবল মুঘল স্থাপত্যের অংশ; ১৯৮৮ সালে সংস্কার করার সময় অন্য তিনদিকের প্রাচীর তৈরি করা হয়। এটি প্রায় ১৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৩৭ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট। মাটি প্রায় ৪ ফুট উঁচু করে ঈদগাহটি নির্মিত হয়েছিল। প্রথমে এখানে কেবল অভিজাতশ্রেণির লোকজন নামায পড়তেন, পরে তা সবার জন্য উন্মুক্ত হয়। এখানে একটি কালো পাথরের শিলালিপি রয়েছে। ১৯৮১ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর রক্ষণাবেক্ষণ করছে। সাড়ে তিনশতাধিক বছরের পুরনো এ ঈদগাহটি এখনও ঈদের নামায আদায়ে ব্যবহৃত হয়।।

৬। নায়েব নাজিমদের সমাধি

আঠার শতকের শুরুতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দূরবর্তী প্রান্তে মুঘল শাসন স্তিমিত হয়ে পড়ে। এসময় মুর্শিদ কুলী খান বাংলায় কার্যত স্বাধীন প্রশাসন গড়ে তোলেন। তখন প্রশাসনের সুবিধার্থে, বিদ্রোহ দমনে, রাজস্ব সংগ্রহে প্রভৃতি কার্যে নওয়াবকে সহায়তা করার জন্য নায়েব নাজিম নামে পদ সৃষ্টি করা হয়। মুর্শিদকুলী খান বাংলা ও উড়িষ্যার অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুবাহদার হলে সম্ভবত ১৭১৬-১৭১৭ সাল থেকে ঢাকা শহর নায়েব নাজিমের প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

নায়েব নাজিমদের সমাধি

পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতা হারানোর পর ইংরেজরা পদটি বিলুপ্ত না করে নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগ দেয় এবং পদটি এর ঐতিহ্য ও গুরুত্ব হারায়।

শেষ কয়েকজন নায়েব নাজিম হলেন নসরত জং (১৭৮৫-১৮২২), শামসুদ্দৌলা (১৮২২-১৮৩১), কমরুদ্দৌলা (১৮৩১-১৮৩৪) ও গাজীউদ্দিন(গিয়াসউদ্দিন?) হায়দার (১৮৩৪-১৮৪৩)। বন্ধনীভুক্ত সময়সীমা তাদের নায়েব নাজিম পদের কার্যকাল নির্দেশ করছে। এঁরা সকলেই নামের পূর্বে ‘নওয়াব’ উপাধি ধারণ করতেন।

হোসেনী দালানের পশ্চিম পাশে এই চারজন নায়েব নাজিম সহ আটটি কবর রয়েছে। হতাশার কথা হল এর একটিতেও নামফলক নেই তাই কোনটি কার কবর তা জানা অসম্ভব। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ চারজন নায়েব নাজিমের সমাধিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এই কবরগুলো খুব সাদামাটা, কোন বাহুল্য বা সমাধিসৌধ নেই। ইসলাম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সাধারণত কবরের উপরে কোন ছাউনি দেওয়া হয় না কেননা মৃতব্যক্তির সৎকর্মই কেবল তাকে ছায়া প্রদান করতে পারে [পরীবিবির সমাধি ব্যতিক্রম]। এই ঐতিহাসিক কবরগুলো দেখতে হলে নাজিমউদ্দিন রোডের শাখা হোসেনী দালান রোডে হোসেনী দালান এর ভিতর চলে আসতে হবে। মূল ইমামবাড়ার ঠিক পাশেই সমআকৃতির আটটি কবর চোখে পড়বে।

সূত্র: শিক্ষা সভা

Leave a Reply