একদিন জলে ভেসে…

একদিন জলে ভেসে…

আসাদুজ্জামান : ‘চল না ঘুরে আসি-অজানাতে/ যেখানে নদী এসে থেমে গেছে’- নতুন কোনো জায়গায় দুজন মিলে ঘুরে আসা বোধহয় অনেক মজার। কিন্তু এক পরিবারের শতশত সদস্যদের একসঙ্গে ভ্রমণে বের হওয়া যেন তার চেয়ে অনেক বেশী মজার। এমন এক অভিজ্ঞতা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক ঝাঁক নবীণ-প্রবীণের মহামিলনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম আবর্তন থেকে শুরু করে ৪৩ তম আবর্তনের অংশগ্রহণে হয়ে যাওয়া নৌ বিহারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা-পুরো একটি দিন জলের ওপর ভেসে ভেসে কাটালেন তাঁরা।

আয়োজনটা চলে অবশ্য ঘটা করেই। অনেক আগ থেকেই চলে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের তোলপাড়। কখনও টি শার্টের ছবি, কখনও লঞ্চের ছবি, কখনও বা আয়োজন করার তাগিদে মিটিংয়ে বসে গল্পের ছলে কাটিয়ে দেয়ার অলস ছবি। কারও বাড়িতে আবার আয়োজনের নামে চলে আড্ডার ধুম, কিছু অন্ন সাবাড় করার পাঁয়তারা! এভাবেই চলে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই দিন-১২ ফেব্রুয়ারি।

ঘুমটা ভাঙলেই শুরু হয় নৌবিহারে যাওয়ার মহাপ্রস্তুতি। এ জন্য নাকি রাতে ঘুমও হয়নি এমন অভিযোগ ৩৮তম আবর্তনের শিক্ষার্থী কাজী তাসলিমা কাকন, ৪৩ ব্যাচের শহীদ, সাদমান সাকিব ও ফজলে রাব্বিদের। সেদিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বাস ছাড়ে। ক্যাম্পাস থেকেও দুটি। শিশির ভেজা ঘাস মারিয়ে পূব আকাশে সূয্যি মামা উঁকি দেওয়ার আগেই ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্র ট্রান্সপোর্ট চত্বরে হাজির প্রায় সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।

এবার বাসে উঠার পালা। বাসে উঠেই শুরু হয় প্রিয়জনকে নিয়ে পাশাপাশি সিটে বসার মহাধুম। যাদের আবার প্রিয়জন নেই তারাও কিন্তু বসে নেই। চলছে মহাসমারোহে গান আড্ডা আর সেলফি তোলার হিড়িক। একটু পরে জুনিয়রদের মধ্যে ৪৩ ব্যাচের মেহেদী, আদিত্য, ৪২ তম ব্যাচের ছোটন, বরণরা শুরু করেন কন্ট্রাকটরগীরি। এর সাথে যোগ দেয় ৪১ ব্যাচের নাজমুল, শাফি, আপনসহ আরও অনেকে। ‘কাপল হলে ভাড়া বেশী’, সিঙ্গেল হলে আরও বেশী, চাকুরিজীবি হলে তো কথাই নেই।’ তবে ৩৮ ব্যাচের আপুদের থেকে টাকা ইঠাতে রীতিমত গলদঘর্ম হতে হয়েছে বলে অভিযোগ টাকা উত্তোলনরত কৃতি সন্তানদের।

একদিন জলে ভেসে…নবীন-প্রবীণ একসাথে। ছবি : লেখক।
একদিন জলে ভেসে…নবীন-প্রবীণ একসাথে। ছবি : লেখক।

এভাবে ঢাকা শহরের জ্যাম নামক পরিচিত এক আত্মীয়ের মেহমানদারীর মাধ্যমে বাস পৌঁছাল সদরঘাটে। একে একে তিনশতাধিক সদস্য উঠে পড়ল বন্ধন-৫ নামের বড় এক লঞ্চের পেটে। সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হল স্মৃতির পাতা ভারী করার চেষ্টা। ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক আওয়াজ। অনেককে আবার একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় ও কোলাকুলিতে ব্যস্ত দেখা গেল। জুনিয়ররা ব্যস্ত বড়দের সাথে পরিচিত হতে। ছেলের বয়সের জুনিওরদের সাথে একসাথে ছবি উঠানো, আড্ডা দেয়াতে প্রবীণরা যেন তারুণ্য ফিরে পেল ক্ষণিকের জন্য। কেউ আবার হাজির হয়েছে পরিবারের ছোট্ট মেহমানটিকে নিয়ে। এমন মহামিলনে বাদ যাবেন কেন নতুন প্রজন্মে এ সাধকেরা! তবে তারা যাতে পানিতে না পড়ে তা দেখতে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের মাসহ বিয়ে না করা অন্য শিক্ষার্থীরাও। হয়ত সামনের প্রস্তুতির কথা ভেবে সাব্বির, শরীফ, মিদূল ভাইদের মতো আছেন যারা।

এবার যাত্রা শুরু। একটু পরেই সকালের নাস্তা। নাস্তা শেরে সবাই গিয়ে হাজির লঞ্চের ছাদে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে। অন্যদিকে ক্যামেরা হাতে সবাইকে স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধতে ব্যাস্ত দেখা গেল ডিএসএলআর ক্যামেরাধারী আসিফ ফারুক, বর্ষণ, তন্ময়, শাওন, শাহরিক ভাইসহ মুঠোফোন হাতে অগনিত বিশিষ্ট ফটোগ্রাফারদের। এর মাঝে দেখা গেল বিশিষ্ট টিভি উপস্থাপক সালাউদ্দিন আহমেদ ভাইকে বুড়িগঙ্গা নদীর কালো পানির বেহাল অবস্থার একটু উল্টো সুনাম করতে। কর্তৃপক্ষের যেন এদিকে খেয়াল নেই এমন মন্তব্য আতিয়া ফেরদৌসী চৈতী’র।

শুধু আড্ডা গল্প নয়। কথা হয় ক্যারিয়ার নিয়ে বড়দের সাথে ছোটদের। কথা হয় ২৮ ব্যাচের ইয়াসির ভাই, ৩০ ব্যাচের গালিব, ফজলু ভাইসহ অনেকের সাথে। যারা কাজ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

আমিন মাসুদ আলী, ফরিদ আহমেদ বাবু, শিপনভাই সহ নামকরা সব শিল্পীদের নস্টালজিক হওয়ার গান —কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আর নেই-আর নেই—লা –লা’গান শুনে অনেকেই হারিয়ে যায় স্মৃতির অতল তলে। এক পর্যায়ে ৪১ ব্যাচের সাইমুন ভাইয়ের গান। ‘ইস্টিশনের রেলগাড়িটা…এর পরিবর্তে ‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা, প্রেম করে ১০-১২টা/ হলে বসে ভাবে- কারে দেবে মনটা, কারে দেবে মনটা —–এতে মেয়েরা খানিকটা লজ্জায় পড়লেও রওশন আরা পলি আপুর উপস্থাপনায় ৪৩ ব্যাচের মুন ও প্রিয়ার গানের মাধ্যমে প্রতিবাদটা বেশ জমেই ওঠে। পরে আবার সেরা কাপলদের পারপরম্যান্সের সুবাদে অনেকের হাতে ওঠে পুরস্কারের গুচ্ছগুলো। শেষে লটারির আয়োজনটাও বেশ মজার হয়ে উঠে। এতে নবীনের হাতে প্রবীনের পুরস্কার নেয়া যেন এক আত্মার বন্ধনের কথা বলে।

অন্যদিকে আরিফ ফারুক ভাইয়ের গুনে গুনে ৬২৩ টি ছবি একসাথে ফেসবুকে আপলোড দেয়া দেখে মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী জিহান ভাই প্রশংসা করতে ভুললেন না। তার মতে ‘এভাবে প্রোগ্রাম যে যাই করুক না কেন আমার বিচারে সবচেয়ে পরিশ্রম করেছে আসিফ।’ ৬২৩টির ও বেশী ছবি আপলোড দেওয়ায় এমন মন্তব্য তার।  তার সাথে তাল মিলেয়ে চললেন আসফাক মুস্তফা,  শিপন ও মনিরুজ্জামান ভাইয়েরা।

আবু হায়দার আল মাসুম, কল্লোল ভাই, মেহের, তারেক আনাম সুমন ভাইসহ যারা এমন অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি তাদের দেখা গেল ফেসবুক ওয়ালে নতুন পরিকল্পনা। সামনে কোন দিকে নৌভ্রমণে যাবে? বরিশাল না সেন্টমার্টিন এমন বিতর্ক চলছে বেশ জোরেশোরেই।favicon594

Leave a Reply