যানজটে নতুন মাত্রা উবার-পাঠাও

যানজটে নতুন মাত্রা উবার-পাঠাও

  • জাওয়াদ মো. অর্ণব

যানজটের কবলে পড়ে যান্ত্রিক জীবনের গতি যখন ক্রমশ স্থবির, ঠিক তখনই যানজট সমস্যায় যেন এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে আ্যাপসভিত্তিক পরিবহনসেবা। রাজধানীবাসীর কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই পরিবহনসেবাই হয়তো একদিন যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে এখন রাজধানীবাসীর মনে।

বর্তমানে ঢাকায় একাধিক স্মার্টফোন আ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক পরিবহনসেবা চালু থাকলেও, এর প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর। বিশ্বের অন্যতম বড় অনডিমান্ড রাইড শেয়ারিং কোম্পানি উবার সর্ব প্রথম বাংলাদেশে এই পরিবহনসেবা চালু করে। উবারের পর ‘পাঠাও’ নামে আরেক প্রতিষ্ঠান একই ধরনের সেবা চালু করেছে। প্রাথমিকভাবে আইনি বৈধতা না পেলেও গত ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকে এটির অনুমোদন দেয়া হয়।

বৈধতা পাবার সাথে সাথেই পরিবহন সংখ্যা বেড়ে চলেছে আ্যাপসভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার দেয়া তথ্য মতে, এ পর্যন্ত উবারে ৫০ হাজার গাড়ি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এতে করে রাস্তায় গাড়ির চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। যা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই যানজটের জন্য একটি বড় উপসর্গ হয়ে উঠবে।

উবারে রেজিস্ট্রেশনকৃত গাড়ি মালিক মো. বিপ্লব হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার গাড়িটি ব্যক্তিগত কাজ ছাড়া আগে প্রায় বেশির ভাগ সময়ই পার্কিংয়ে থাকতো কিন্তু উবারে গাড়ি দেওয়ার পর থেকে দিনে ১০ ঘন্টার মতো গাড়িটি রাস্তায় চলাচল করে। বিপ্লব হোসেনের মতো রাজধানিতে এমন অসংখ্য গাড়ি মালিক রয়েছেন, যাদের ব্যাক্তিগত গাড়িটি এখন পার্কিংয়ের চেয়ে রাস্তায় বেশি চলাচাল করেন। ফলে রাজধানিতে ব্যাক্তিগত গাড়ির চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

২০১৭ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই)  প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলকারী ৬ শতাংশ মানুষ ঢাকার ৭৬ ভাগ সড়ক দখল করে আছে। মোট সড়কের ৬-৮ শতাংশ থাকে গণপরিবহন এর দখলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত গাড়ির এই চাপ যানজট ভোগান্তির অন্যতম কারণ।

বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান তার লেখা ‘ঢাকাকে একটি আধুনিক নগরী বানানোর সুযোগ’ প্রবন্ধে বলেন, দশবছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিলো ঘন্টায় ২১ কিলোমিটার, বর্তমানে তা ঘন্টায় সাত কিলোমিটারে নেমে এসেছে। যানবাহনের সংখ্যা বর্তমান হারে বাড়তে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে যানবাহনের গতি ঘন্টায় চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের জাতীয় সংসদে দেয়া তথ্য অনুসারে, একটি আধুনিক শহরের ২০ থেকে ২৫ ভাগ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন। সেখানে ঢাকা শহরে আছে মাত্র সাত থেকে আট ভাগ। যা প্রয়োজন এর তুলনায় মাত্র এক তৃতীয়াংশ।

এসব প্রবন্ধ ও গবেষণায় বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বল্প পরিমাণ রাস্তায় যানজটের মোকাবেলা সম্ভব একমাত্র পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা এবং সড়কে গণপরিবহেনর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। আ্যাপস ভিত্তিক এসব পরিবহনসেবার দ্রুত জনপ্রিয়তা সড়কে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে তুলছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। এভাবে চলতে থাকলে, হয়তো এই সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর যানবাহনই রাজধানীর যানজট সমস্যাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলবে।

Leave a Reply