সিআর সেভেনের গল্প

সিআর সেভেনের গল্প

  • পারভেজ

৭ জুলাই, সাল ২০০৯! সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে সেদিন দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রায় আশি হাজার দর্শক। না, কোনো ম্যাচ সেদিন ছিল না। শুধু একটি নাম, তার জার্সি এবং খোদ সেই মানুষটিকেই দেখার জন্য ১ লক্ষ ৪০ হাজার চোখ গ্যালারিতে অপেক্ষা করছিলো। ফুটবল ও রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে এটি একটি বিশেষ দিনই ছিল হয়তো। এমন বিশেষ দিন ফুটবল বিশ্বে সবসময় আসে না। পঁচিশ বছর আগে গ্রেট দিয়েগো ম্যারাডোনাকে স্বাগত জানানোর মুহূর্তে নাপোলি’র মাঠে পঁচাত্তর হাজার দর্শক জড়ো হয়েছিল, সেই রেকর্ডও সেদিন ভেঙে গেল। এমন বিশেষ দিন ফুটবল বিশ্বে সবসময় আসে না।

তো যার জন্য এতো আয়োজন, এতো সমাগম, এতো অপেক্ষা, তিনি হলেন-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা সিআর সেভেন। ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে আসা একজন যাদুকর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ ঘাসে পা রাখলেন, হাসলেন, হাত নাড়ালেন। পুরো স্টেডিয়াম যেন উল্লাসে কেঁপে উঠলো! কিছু বললেন তিনি, সবশেষে বললেন ‘আলা মাদ্রিদ’!

রাইভালদের একক রাজত্ব, আধিপত্য, জয়জয়কার, পরাক্রমশীলতার বিরুদ্ধে তিনি এলেন বিশ্বাস, আশা, শক্তি ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে।

নিজ দলের টালমাটাল অবস্থা, সামলিয়ে উঠার কিংবা হাল ধরার কেউ নেই। সদর্পে তিনি এগিয়ে এলেন। দলের আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিলেন, দলকে টানলেন একাই। না সবসময় ঠিক পেরে উঠেননি। ব্যর্থ হয়েছেন অসংখ্যবার, ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে সেটা দলগত হোক কিংবা ব্যক্তিগত! আফসোস করলেন, অনুশোচনায় ভুগলেন, ‘আহা এদের যে আমার কাছ থেকে আরো কিছু পওনা আছে!’ প্রত্যাশার বারুদ যে চারিদিকে, পারদ সে তো আকাশচুম্বী… এ পর্যন্ত একাই পঞ্চাশ গোল করে খানিকটা প্রত্যাশার চাপ মেটাতে পারছিলেন, তবে পুরোপুরি না।

জর্জ বেস্ট, এরিক ক্যান্টোনা কিংবা ডেভিড বেকহাম এর ‘সাত’ নম্বর জার্সি পড়ে পাহাড়সম চাপকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, বল পায়ে তুলেছিলেন উত্তাল শৈল্পিকতার ঢেউ, সাথে জন্ম দিয়েছিলেন বিস্ময় ও প্রশংসার সাগরের। দেখলে মনে হতো যেন, মাঠের দুই ফ্ল্যাংক দিয়ে এক প্রজাপতি ছন্দময় গতিতে উড়ছে! এমন অপ্রতিরোধ্য প্রাণকে হারাবে কে! তিনি এমন এক মানুষ যিনি তাকে নিয়ে সকলের ‘ফুরিয়ে যাওয়ার কল্পনা’কে উড়ন্ত বলের মতো এক হেড কিংবা জোড়ালো শট দিয়ে একপ্রান্তে ছিটকে দেন, তৈরি করেন ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র! বিদ্রুপ রূপ নেয় মুগ্ধতায়। শত ঘৃণা, অপবাদকে মুছে দেন পায়ের তুলির আঁচড়ে। এডিট করা চার প্যাকেট শ্যাম্পুর জায়গায়, সত্যিকারের ‘ব্যালন ডি-অর’ শোভা পায়।

রোনালদো হেরে যাননি।বরং অনবদ্য কারিশমায় এনে দিয়েছেন দলগত সাফল্য, রিয়াল মাদ্রিদের হ্যাট্রিক ইউরোপ সেরার মুকুট জয়ে তৈরি হয়েছেন নতুন ইতিহাস। গত শতাব্দীর সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ফিরে পায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব! যেন প্রমাণিত হয় প্রতিপক্ষ পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে একপক্ষে কেবল রিয়াল মাদ্রিদের নামই উচ্চারিত হতে হবে বারংবার।

শেষ পাঁচ বছরে চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগ। আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের জায়গা যেন এক নিমিষেই শেষ। কিয়েভের ফাইনালে রোনালদোও যেন এক অর্থে বলে বসলেন, ‘কাটানো মুহুর্ত ও সময়গুলো অসাধারণ ছিল। হয়তো অনেক হলো, আর নয়। সুখস্মৃতি নিয়ে বিদায় নেয়ার বুঝি এখনই সময়। নিজ ঘরে চ্যাম্পিয়নস লীগ ট্রফি ঘিরে আনন্দ উদযাপনের মুহুর্তে প্রায় লক্ষ সমর্থক গেয়ে উঠলো, ‘রোনালদো স্টে!’ সাথে যোগ দিয়েছিলেন মার্সেলো,  রামোসরাও। তাও বুঝি অভিমান কমলো না।

Leave a Reply