কান্তের জীবনটাও কম রোমাঞ্চকর নয়!

কান্তের জীবনটাও কম রোমাঞ্চকর নয়!

  • নিলয় বিশ্বাস

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ফ্রান্স দলের সবাই যখন উল্লাসে ব্যস্ত, তখন এক তরুণ উৎসবের একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সবার উদযাপন দেখছিলেন। সতীর্থ, কোচ, স্টাফ—কারোরই নজর পড়েনি তার ওপর। কিন্তু লুকাস রুদ্রিগেজের চোখটা ফাঁকি দিতে পারেননি ছেলেটি! রুদ্রিগেজ এক মুহূর্ত কি ভেবে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেন সেই তরুণের হাতে। আর সঙ্গে সঙ্গে ছবিশিকারী সাংবাদিকরা ক্যামেরার সাটার চাপতে থাকেন। ক্লিক! ক্লিক!

সেই তরুণের নাম এন’গোলো কান্তে। চেলসির এই মিডফিল্ডারের জন্ম ১৯৯১ সালের ২১ শে মার্চ, ফ্রান্সের প্যারিসে। মি. অ্যান্ড মিসেস কান্তের বড় ছেলে বেড়ে উঠেছেন প্যারিসের অদূরে রুয়েলম্যালমাইসন নামের একটি ছোট্ট উপশহরে। বাবা-মা দুজনেই মালির নাগরিক। ১৯৮০ সালে ভাগ্য বদলাতে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। দ্রারিদ্রতা যেন পিছনে লেগেই ছিল। পরিবারের হাল ধরতে ৫ বছর বয়সেই রাস্তা থেকে আর্বজনা কুড়িয়েই তার দিন চলতো। প্যারিসে কোনো টুর্নামেন্ট হলে, খেলার পর বোতল সংগ্রহে নেমে পড়তেন। সাত বছর পর্যন্ত মাঠে মাছে বোতল কুড়িয়ে গেছেন কিন্তু একদিনও মাঠে খেলা দেখার ভাগ্য তার হয়নি। সেই এন’গোলো কান্তের হাতে এখন বিশ্বকাপ ট্রফি!

এন’গোলো কান্তে জীবনের সবচেয়ে বড় সিন্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন ৮ বছর বয়সে। মনে মনে জীদ করে বসলেন ফুটবলার হবেন। তারপর নাম লেখালেন জেএস সুরানেস ক্লাবে। ওই ক্লাবের সবার থেকে উচ্চতায় ছোট ছিলেন তিনি। সবাই ঠাট্টা করত এই ছেলে ৯০ মিনিট মাঠে দৌড়াতে পারবে তো? হাসি ঠাট্টা কান্তের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে, তবে তিনি পাত্তা দেননি। সবসময় নিজের হৃদয়ের কথাই শুনেছেন। নিজের সবটা উজাড় করে দিয়ে খেলেছেন ক্লাবে। হয়েছেন ক্লাবের যুব তারকা। কান্তে দলে যোগ দেয়ার পর পর যেন ক্লাবের কপাল খুলতে লাগল। ভালভাবেই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ান হতে থাকল কান্তের ক্লাব। ছোটবেলা থেকে যেন একটু লাজুকতা কাজ করত তার মাঝে। সবাই যখন জয়ের উল্লাসে আনন্দ করত পাশে দাঁড়িয়ে সেটা উপভোগ করাটাই যেন তার কাছে ভাল লাগত। সেই ভাল লাগাটা বিশ্বকাপের মঞ্চে উপস্থিত ছিল।

ছোটবেলার ক্লাবে কান্তের কোচ ছিলেন পিয়েরে ভিলে। কান্তের বাবা মারা যাওয়ার পর পিয়েরে ভিলের অবদান অনেকখানি। ভিলে একবার এক সাক্ষাৎকারে তার প্রিয় শিষ্যর ব্যাপারে বলছিলেন—‘আমার কোচিং ক্যারিয়ারে কান্তের মতো পরিশ্রমী খেলোয়াড় খুবই কম দেখেছি। দলের আর দশটা খেলোয়ায়ের মতো তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। অনেক সময় খেলার সরঞ্জাম কেনার টাকা আমি নিজ পকেট থেকে দিয়েছি। কান্তে অনেক আগেভাগেই বড় ক্লাবের হয়ে খেলতে পারত, যদি উচ্চতা আরেকটু বেশি হত!’

২০১০ এ কান্তে তার দল জেএস সুরানেস থেকে বোউলগ্নেতে পাড়ি জমান। ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত খেলেন বোউলগ্নেতে। এরপর তার উপর লিস্টার সিটির চোখ পড়লে সোজা ফ্রান্স থেকে পাড়ি জমান ৩০ বছর বয়সী ফুটবলার। ২০১৫-১৬ মৌসুমে লিস্টার সিটিরে ভাল খেলার সুবাদে ডাক পান চেলসি থেকে। ৩০ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি-তে ২০১৭ তে পাড়ি জমান চেলসিতে।

বাবা-মা বংশগতভাবে মালীর হওয়ার, আফ্রিকান নেশন কাপ খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন মালির হয়ে। খেলার সুযোগও ছিল মালির হয়ে। কারণ তখন পর্যন্ত কান্তে ফ্রান্স জাতীয় বা বয়সভিত্তিক কোনো দলের হয়েই খেলেননি। কিন্তু মালির হয়ে আর খেলাই হয়নি নিজের ইচ্ছাতেই। ফ্রান্সের ঘরোয়া লীগের খেলায় মন দিতে চাচ্ছিলেন। হয়তো ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সি গায়ে পড়ার স্বপ্ন বুনছিলেন মনে মনে। দেশম সম্ভবত তার মনের কথা বুঝে নিয়েছিলেন। ২০১৬’র ১৭ মার্চ ডাক পান ফ্রান্সে জাতীয় দলে। এরপর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হয়ে গেলেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান দলের সদস্য। ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন। হয়তো সেদিন মালীর হয়ে খেলার আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে খারাপ কিছু করেনি!

Leave a Reply