নাসা অ্যাপস প্রতিযোগিতা : বিজয়ী ১১ উদ্যোগ

নাসা অ্যাপস প্রতিযোগিতা : বিজয়ী ১১ উদ্যোগ

  • বিজ্ঞান প্রযুক্তি ডেস্ক

টানা ৩৬ ঘণ্টার নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের বাংলাদেশ পর্বে অংশগ্রহণ করেছে আলিফ বিনতে শাহীন। সে স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। নাসার নভোচারীদের জন্য দারুণ একটি খাবারের জোগান নিয়ে এসেছে তাদের টিম। মঙ্গলগ্রহের উপযোগী একটি ফলের গাছ তাদের উদ্যোগ। তারা জয়ী না হলেও এমন উদ্যোগ নিয়েই কাজ করতে চায় আলিফ। এমনই সব উদ্যোগ নিয়ে গত ২৯ এপ্রিল ৫০টি টিম অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ পর্বে। যাদের মধ্যে থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নাসার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে ১১টি উদ্যোগ। বিজয়ী উদ্যোগগুলো হচ্ছে- আত্ম-উন্মেষ, ব্ল্যাক স্যুট, ড্রোন ফর গ্রিন, অ্যারে সিটিজি, নেস্ট, এভোসেভ, অগ্রপথিক, টিম ইংরাইটাস, বিডিস্টার ওয়েব ডেভেলপার গ্রুপ, জোয়াপথ এবং ইকো-পিএসটিইউ। এই উদ্যোগগুলো ভার্চুয়ালি নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে অংশ নেবে। যাদের মধ্যে থেকে নাসা খুঁজে বের করবে চূড়ান্ত পর্বের প্রতিযোগীদের। এবারের প্রতিযোগিতায় সহযোগিতায় ছিল বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফোরাম ও ক্লাউড ক্যাম্প বাংলাদেশ। নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন প্রোগ্রাম। বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশের ২২০টি সিটিতে একই সঙ্গে হ্যাকাথন প্রোগ্রামটি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৪৫০টি উদ্যোগ থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্বের মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ৫০টি দল।

আত্মউন্মেষ
দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। তবে সতর্ক থাকতে হবে সব সময়। কিন্তু কাজে আর কতটুকুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভবে রূপ দিয়েছে আত্ম-উন্মেষ ঢাকার দলটি। তাদের উদ্যোগ টাইম প্লাস। আপনার যে কোনো বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়াবে তাদের বিশেষ অ্যাপ। যেমন আপনার বিল্ডিংয়ে আগুন ধরেছে। তখন মাত্র একটি বার্টন ক্লিক করে জানিয়ে দিতে পারেন পরিবার বা প্রয়োজনীয় মাধ্যমগুলোতে। যেন আপনাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আসিফ ইমরুলের গ্রুপের সদস্য চারজন। যাদের মধ্যে তিনজন বুয়েট এবং একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

ব্ল্যাক স্যুট
ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। এর অন্যতম কারণ ম্যানহোলগুলো ঠিক না থাকা। তাই শাহরিয়ার হৃদয়ের গ্রুপটি এর সমাধানে একটি অ্যাপ এবং ডিভাইস তৈরি করেছে। যার নাম দিয়েছে ‘স্মার্ট সেনসিবল ম্যানহোল’। স্যুয়ারেজ পাইপলাইনে ১ মিটার পরপর এটি সার্কিট বসানো হবে যা যুক্ত থাকবে অ্যাপের মাধ্যমে। ফলে কোনো জায়গা পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেলে অ্যাপ জানিয়ে দেবে। ফলে যে জায়গাটিতে এই সমস্যা হয়েছে, সেখানে খুঁড়লেই হবে। আবার আমাদের রাস্তায় সচরাচর ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হতে দেখা যায়। এটা প্রতিরোধে একটি সেন্সর ঢাকনায় লাগানো থাকবে। কেউ যদি ঢাকনাটি খোলে তাহলে রাস্তার পাশে থাকা সিগন্যাল লাইট এবং সাইরেন বেজে উঠবে। ফলে এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। দলটির পাঁচজন নটর ডেম এবং একজন ভিকারুননিসার শিক্ষার্থী।

ড্রোন ফর গ্রিন
স্যাটেলাইট থেকে পুরো বিশ্বের এই বিষয়টি পরিমাপ করা হয়েও তা সবসময় সঠিক হিসাব দেয় না। কারণ সেখান থেকে শুধু সবুজ কিছু দেখলেই গাছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এজন্য ড্রোনকে কাজে লাগিয়ে স্যাটেলাইটের কাজকে আরও সহজ করে দিতে চায় ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীরা। এজন্য তারা তৈরি করেছে বিশেষ ড্রোন। এটি অনেক নিচ থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে তথ্য ধারণ করতে পারে। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিজস্ব একটি সফটওয়্যার, যেখানে পরিবেশের পরিবর্তনগুলোকে খুব সহজে ধারণ করতে এবং সমস্যা নির্ণয় করতে পারে।

অ্যারে সিটিজি
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ভূমিকম্প। তাই এই দলটি কীভাবে ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় তা নিয়ে একটি সমাধনের চেষ্টা করেছে। তাদের প্রজেক্টের নাম ‘আর্থ কোয়াট’। এখানে মূলত একটি বিল্ডিংয়ের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে। যেখানে পুরো বাড়িটি একটি কাঠামোর ওপর থাকবে। কোনো ভূমিকম্প হলে সেই কাঠামো নড়বে, তবে বাড়িটি সোজাভাবে অবস্থান করবে। আর যদি বাড়ি বিম বা পিলার না নড়ে, সে ক্ষেত্রে ভাঙার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক তলা বাড়ি করা সম্ভব যা ভূমিকম্প সহনীয় হবে।

নেস্ট
বিশ্ব উন্নয়নের জন্য কলকারখানা তৈরি হচ্ছে। আর এসব কারখানা চালানোর ফলে পরিবেশের ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা গ্রিনহাউসের ক্ষতিসাধন করছে। তবে এসব কারখানা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চারজনের দলটি গ্রিনহাউসের ক্ষতি কীভাবে কমানো নিয়ে কাজ করছে। তারা মূলত একটি মেশিন তৈরি করছে, যার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাসগুলো গ্রহণ করতে পারবে। তারপর সেগুলো আবার পরিশোধিত করে পরিবেশে ছেড়ে দেবে।

অগ্রপথিক
সমুদ্রে পর্যটকদের নিরাপদ রাখতে চট্টগ্রামের দল ‘অগ্রপথিক’ তৈরি করেছে ‘বিচ অ্যালার্ট’ অ্যাপ। অ্যাপটি আবহাওয়া সম্পর্কে সব ধরনের ধারণা দেবে। একই সঙ্গে আপনাকে বিপদ সংকেত থাকলে তা জানিয়ে দেবে আগে থেকেই।

এভোসেভ
বিশ্বজুড়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণিকুল এমনকি পরিবেশও। কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ঠিক রাখার দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু আমাদের ব্যক্তি পর্যায়ে এর মাত্রা জানাটা সহজ নয়। এই কাজটি সহজ করে দিতে ‘এভোসেভ’ নিয়ে কাজ করেছে রংপুরের দল গ্গ্নাসিয়ার্স। তারা একটি সেন্সর এবং একটি ডিভাইসের মাধ্যমে পুরো কাজটি সম্পাদনা করবে। একটি এলাকায় সেন্সর লাগানো থাকবে এবং ডিভাইসে ওই জায়গার কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা জানিয়ে দেবে। তখন তারা এলাকা প্রতিনিধিদের এসএমএসের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে দেবে। তারা উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সরকারকে জানানো হবে।

টিম ইংরাইটাস
পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি আর একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে, তা হলো পানি দূষণ। নদী বা সাগরে নানা ধরনের প্লাস্টিক, পলি ব্যাগের কারণে পানি দূষণ হচ্ছে। এটা প্রতিরোধে কাজ করতে টিম ইংরাইটাস ‘সেভ ওয়াটার সেভ লাইভ’ প্রজেক্টের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে নদী বা সাগর থেকে পলি ব্যাগ বা প্লাস্টিক সংগ্রহণ করবে। তারপর এগুলো দিয়ে ব্লগ তৈরি করা হবে। এসব ব্লগের বিদেশে অনেক চাহিদা রয়েছে। ফলে এর মাধ্যমে অর্জন করা যাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

বিডিস্টার ওয়েব ডেভেলপার গ্রুপ
বেস্ট ডাটা অব ইউস ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত প্রলয় বিশ্বাসের এ উদ্যোগটি। তার দললের সদস্য ছয়জন। তারা পৃথিবী নয়, পুরো মহাবিশ্বের সঙ্গে তাদের ডাটা সমন্বয় করেছে। ইতিমধ্যে তারা বিশ্বের নাসা অ্যাপ চ্যালেঞ্জে পঞ্চমে অবস্থান করছে। তাদের অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে বিজ্ঞানীদের। কারণ মহাবিশ্বে অন্য গ্রহের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের তুলনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক হিসাব করা যাবে খুব সহজে।

ইকোপিএসটিইউ
মহাকাশে প্রাণীর বেঁচে থাকার অন্তরায় হচ্ছে সেখানে নেই অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া কি আর মানুষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে। এমনই সমস্যার সমাধান করতে চায় ‘ইকো ফ্রেন্ড’ প্রজেক্টের মাধ্যমে। এখানে তারা শনাক্ত করার চেষ্টা করেছে মানুষের শরীরের জিনগুলো। এই জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে বাঁচার মাধ্যমের পরিবর্তন আনা সম্ভব। যেমন আমরা বেঁচে আছি অক্সিজেনের মাধ্যমে। এটা ঠিক করে জিন। তাই ভিন্ন গ্রহে বসবাসের জন্য জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে অনায়াসে জীবন-যাপন করা সম্ভব। এরই একটি সমাধান দিয়েছে বরিশালের হাবিবুল্লাহ নুর এবং তার দল।

জোয়াপথ
গ্রামের মাটির কলসি ব্যবহারের কারণ অনেকেই জানেন নিশ্চয়। এটা ব্যবহার করা হয় পানি ঠাণ্ডা রাখার জন্য। কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই পানি ঠাণ্ডা হওয়ার এই কৌশলকে বাণিজ্যিকভাবে রূপ দিতে চান বরিশালের জোয়াপথের শতরূপা হৃদি এবং তার দল। তারা এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সিএফসি ফ্রি রেফ্রিজারেটর তৈরি করবে। যার চারপাশে থাকবে কাঠ আর সামনে গ্লাস। ভেতরে থাকবে খাবার অথবা পানি, যা নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করবে। আর এত কিছু হবে বিদ্যুৎ ছাড়াই।favicon59-4

Leave a Reply