বৈশ্বিক বন্ধনে ড্যাফোডিল অ্যালামনাই

বৈশ্বিক বন্ধনে ড্যাফোডিল অ্যালামনাই

  • মারুফ ইসলাম

ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ, সন্ধ্যা। জায়গাটা লন্ডনের পাম ট্রি ব্যাংকুয়েট হল। কিন্তু যে কেউ দেখে বলবেন এটা এক টুকরো বাংলাদেশ। মনে হবে যেন বাংলাদেশের কোনো অনুষ্ঠানে এসেছি। ‘আরে তন্বী না! কতদিন পর দেখা! ওমা, এটা দেখি এমদাদ ভাই। আপনি তো আগের চেয়ে আরো স্মার্ট হয়ে গেছেন! রঞ্জন দা! এতদিন পর আপনাকে দেখতে পাব, কল্পনাও করিনি!’

সেদিন পামট্রি ব্যাংকুয়েট হলের দৃশ্য ছিল এমনই। অনেক দিনের পুরনো বন্ধু, বড় ভাই, আপুদের কাছে পেয়ে এভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলেন আর নিমেষেই ফিরে যাচ্ছিলেন সেই পুরনো দিনগুলোতে। পুরনো দিন মানে ড্যাফোডিলে পড়ালেখা করার দিনগুলোতে। কি অনিন্দ্য সুন্দরই না ছিল দিনগুলো!

এরা সবাই ড্যাফোডিলের অ্যালামানাই। কেউ পড়েছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে, কেউ পড়েছেন ডিআইআইটিতে, কেউ পড়েছেন ড্যাফোডিলের অন্যকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এখন সবাই লন্ডনে। ‘ড্যাফোডিল অ্যালামনাই ইউকে পুণর্মিলনী ২০১৯’ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সবাই মিলিত হয়েছেন এই পামট্রি ব্যাংকুয়েট হলে।

অনুষ্ঠানটিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য ব্যারোনেস মঞ্জিলা পলা উদ্দিন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড্যাফোডিল পরিবারের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অক্সফোর্ড কালচারাল কানেক্টিভের চেয়ারম্যান ড. ডোনাল্ড স্নোয়ান, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর এস. এম জাকারিয়া হক এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ড. আজিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ড্যাফোডিল পরিবারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ড্যাফোডিল পরিবারের ১০০জন প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারবর্গ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনাকরেন ড্যাফোডিলের দুই অ্যালামনাই তাহমিনা ও সমর সাহা। আর অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিলেন ড্যাফোডিলের এইসব প্রাক্তন অ্যালামনাইরাই।

পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়…
অনুষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই যেন হয়ে উঠেছিল স্মৃতির পুণর্জাগরণী সভা। পুরনো দিনের বন্ধ-বান্ধব, শিক্ষক, মেন্টর, অভিভাবক, সহকর্মী ও প্রিয়জনদের সম্মিলনে অনুষ্ঠানস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। প্রত্যেকে অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে ফিরে যায় ড্যাফোডিলে পড়ালেখা করার দিনগুলোতে। শেখ মনিরুল আলম স্বজন নামের ডিআইআইটির এক প্রাক্তন কর্মী যখন তাঁর মানিব্যাগের ভেতর থেকে ডিআইআইটির পরিচয়পত্র বের করে দেখান তখন আবেগাশ্রুতে চোখ ছলছল করে ওঠে সবার—‘এখনো এই কার্ড আছে আপনার কাছে?’ স্বজন অশ্রু লুকিয়ে উত্তর দেন– ‘দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই আইডি কার্ড বহন করছি আমি। কর্মজীবনে অনেক আইডি কার্ড পেয়েছি, কিন্তু ড্যাফোডিলের এই কার্ড কখনো ফেলিনি। যখনই কার্ডটা স্পর্শ করি, আত্মাটা শান্তিতে ভরে যায়। ড্যাফোডিলের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যে আত্মার সম্পর্ক।’ স্বজন এখন লন্ডনের হাইলি স্কিলড মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে কাজ করছেন।

এরপর স্মৃতির খাতা মেলে ধরেন ড্যাফোডিলের প্রথম ব্যাচের প্রথম শিক্ষার্থী রঞ্জন চক্রবর্তী—‘আমি যখন ড্যাফোডিলে পড়াশেনা করেছি তখন একটি ফ্যামিলির মতো পরিবেশ পেয়েছি। নিজের বাসায় আর কতক্ষণ থাকতাম? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ড্যাফোডিলেই পড়ে থাকতাম। ক্লাস শেষ হয়ে গেলেও ক্যাম্পাসে থাকতাম। শিক্ষকরা ছিলেন ফ্যামিলির মানুষের মতো। এজন্য স্কুল, কলেজের স্মৃতি আমার তেমন মনে নেই, কিন্তু ড্যাফোডিলকে মনে আছে। এর পেছনে একটাই কারণ—আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশ।’

তারপর তিনি অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার খুবই ভালো লাগছে যে ড্যাফোডিলের পুরনো শিক্ষার্থী আমরা যারা ইংল্যান্ডে আছি তাদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের মধ্যে সংযুক্ত থাকতে পারব। আমাদের উচিত প্রতি বছর এই অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে আয়োজন করা।’
আরেক অ্যালামনাই সায়মা হোসেন তন্বী বলেন, ‘আমি ড্যাফোডিল থেকে পাশ করে বের হয়েছি দশ বছর আগে। এই অ্যালামনাই প্রোগ্রামে কাজ করতে গিয়ে অনেক বড় ভাই, আপুদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ হয়েছে। সবার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণই বলে দেয় ড্যাফোডিলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কতটা গভীর। ড্যাফোডিলকে আমরা কতটা অনুভব করি। এই অ্যালামনাই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমাদের পারস্পরিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে।’

তন্বীর কথা শেষ হলে হাস্যমুখে মাইক্রোফোন তুলে নেন ডিআইআইটি আরেক শিক্ষার্থী এমদাদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে। তবে এখনও যে বন্ধন রয়েছে তা অন্যদের জন্য ঈর্ষণীয়। আমি যখন প্রথম লন্ডনে আসি তখন কয়েকজন বড় ভাই পেয়েছিলাম যারা ড্যাফোডিলে আমার সিনিয়র ছিলেন। লন্ডনে আসার পর তারা আমাকে এতটা আপন করে নেন এবং এতটা সহযোগিতা করেন যে আমার থাকা, খাওয়া, পড়ালেখা কোথাও কোনো সমস্যা বুঝতে দেননি। একদম আপন বড় ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন। আমি মনে করি এটাই ড্যাফোডিলের শক্তি। ড্যাফোডিল সবাইকে একটি পারিবারিক সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে।’

এমদাদ যাকে বিয়ে করেছেন তিনিও ড্যাফোডিলেরই শিক্ষার্থী। এটাই প্রমাণ করে, ড্যাফোডিলের বন্ধন কতোটা শক্তিশালী।

অপরদিকে আনোয়ার হোসেন নামের একজন অ্যালামনাই শোনালেন তার গর্বের কথা। ড্যাফোডিলের কোন বিষয়টি তাকে গর্বিত করে সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি সেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রকৌশলী ড্যাফোডিলের। এটা আমার জন্য খুবই গর্বের ব্যাপার। আমি ড্যাফোডিলের চেয়ারম্যান স্যার এবং অনান্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাই যে তারা আমাদেরকে গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করেছিলেন বলেই আমরা কর্মজীবনে এতটা সফল হতে পেরেছি।’

আইন বিভাগের এক অ্যালামনাই বললেন অনুপ্রেরণার কথা। তার ভাষ্যমতে, ‘আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান স্যার ড. মো. সবুর খানের বক্তব্য শুনতাম। ইউটিউব থেকেও তার কথা শুনতাম। স্যারের কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করত। জীবনে কিছু হতে হবে—এই অনুপ্রেরণা আমি স্যারের মধ্য থেকেই পেয়েছি। এখন আমি লন্ডনে বার অ্যাট ল পড়ছি। আইন বিভাগের আমিই সম্ভবত প্রথম শিক্ষার্থী যে বাট অ্যাট ল পড়তে লন্ডনে এসেছি।’

এমনিভাবে ড্যাফোডিল হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। তাদেরই একজন রাজবানুল হক। তিনি তার অনুভূতি ব্যাক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি এখানে প্রকৌশলী হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি সেখানে দক্ষিণ ভারতীয় প্রকৌশলীদের প্রাধান্য বেশি। আমিই একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এখানে কাজ করছি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা আমার যোগ্যতা ও দক্ষতার কারণে হয়েছে এবং আমাকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলেছে ড্যাফোডিল।’

এইসব চোখভেজানো অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি অঅনুষ্ঠানে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো মজার দৃশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সবার ঐক্যবদ্ধ শপথ গ্রহণ পর্ব। অনুষ্ঠানের শুরুতে ড্যাফোডিল পরিবারের অ্যালবাম থেকে নেয়া ছবির উপস্থাপনা অনুষ্ঠানটিকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করে তোলে।

ড্যাফোডিল যাবে অনেকদূর…
ড্যাফোডিল গ্রুপের অগ্রযাত্রা বহুদূও পর্যন্ত বিস্তৃত হবে বলে মনে করেন ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য ব্যারোনেস মঞ্জিলা পলা উদ্দিন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘ড্যাফোডিল ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী। ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে।’ অতি অল্প সময়ের মধ্যে ড্যাফোডিল যে সাফল্য অর্জন করেছে তাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এটা ভীষণ গর্বের একটা ব্যাপার। বাংলাদেশে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তার মধ্যে ড্যাফোডিল শীর্ষস্থানীয়দের কাতারে রয়েছে। এটা যে দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই হয়েছে তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না।’

ব্যারোনেস আরও বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে এসে নিজেকেও ড্যাফোডিলের একজন সদস্য বলে মনে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও ড্যাফোডিলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রাখবেন বলে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

যা বললেন ড্যাফোডিল চেয়ারম্যান
বক্তব্যের শুরুতেই সকল অ্যালামনাইদের ধন্যবাদ জানিয়ে ড্যাফোডিল ফ্যামিলির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান বলেন, ‘সকল এলামনাইদের ধন্যবাদ জানাই, কারণ আপনারা ছাড়া ড্যাফোডিল কিছুই না। এখানে আমাদের প্রথম ব্যাচের প্রথম শিক্ষার্থী আছেন। এটাই প্রমাণ করে যে আমাদের বন্ধন কতটা শক্তিশালী। এই যুক্তরাজ্যে ড্যাফোডিলের প্রায় ১৫০০ এলামনাই রয়েছে। কিন্তু এটা আমাদের এক বড় দুর্ভাগ্য যে এত বড় একটি কমিউনিটিকে এতদিনেও আমরা একটি সুতোয় বাঁধতে পারিনি। তবে আশার কথা হচ্ছে, দেরিতে হলেও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। আজকের আয়োজন সেই উদ্যোগেরই বহিঃপ্রকাশ। এখন আমাদের সকলের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমে উদ্যোগটিকে সফল করতে হবে।’

প্রবাসীদের প্ল্যাটফর্ম : নন রেসিডেন্স ড্যাফোডিল অ্যালামনাই
ড. মো. সবুর খান বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা একটি উন্নত বাংলাদেশ চাই। বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকি না কেন, আমরা প্রত্যেকের বুকের ভেতর বাংলাদেশকে লালন করি এবং সর্বোতভাবে চাই যে বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত দেশে পরিণত হোক। আমরা যাতে সম্মিলিতভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি সে জন্য ‘নন রেসিডেন্স ড্যাফোডিল অ্যালামনাই’ নামে একটি ওয়েবসাইট ইতোমধ্যে তৈরি করেছি। এটিই হবে প্রবাসে বসবাসকারী ড্যাফোডিল অ্যালামনাইদের সাধারণ প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবেন, নিজেদের আইডিয়া শেয়ার করতে পারবেন, মন্তব্য, পরামর্শ, অভিযোগ, অনুযোগ, সাহায্য, সহযোগিতা সবকিছুই করতে পারবেন।

আপনারা জানেন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে দীর্ঘদিন ধরেই নন রেসিডেন্স বাংলাদেশি, নন রেসিডেন্স অমুক তমুক ইত্যাদি নামে এই প্রবাসী সম্প্রদায়কে একত্রিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। তবে ড্যাফোডিল যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেটি সফল করতে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করব।

এখানে অধ্যাপক জাকির রয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। তারপর ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। যুক্তরাজ্যেও তিনি একজন সফল পেশাজীবী। এটাই হচ্ছে আমাদের বন্ধন। এটাই হচ্ছে আমাদের শক্তি।’

ওরা চেয়েছিল ভৃত্য বানাতে
বাংলাদেশি হিসেবে আমরা একইসঙ্গে সৌভাগ্যের অধিকারী এবং দুর্ভাগ্যের অধিকারী—এমন মন্তব্য করেন ড. মো. সবুর খান। তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ আমাদেরকে শাসন করেছে এবং তারপর ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান আমাদেরকে শাসন করেছে। দুটি দেশেরই উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি ভৃত্য দেশে পরিণত করা। তারা কেউই চায়নি আমরা একটি উদ্যোক্তা জাতিতে পরিণত হই। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমাদের অনেকেই উদ্যোক্তার পথে পা বাড়িয়েছে এবং সফল উদ্যোক্তা হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে কিন্তু নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবং সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে দেশের অর্থনীতি মসৃন পথে এগোতে পারেনি।

আপনারা জানেন বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর যে বাজেট প্রণয়ন করে সেখানে আয়ের উৎস হিসেবে ৯০ শতাংশজুড়ে থাকে ট্যাক্স বা কর।
এখন সময় এসেছে দেশের পরিবর্তনে অবদান রাখার। দেশে বিদেশে যেখানেই থাকি না কেন, দেশের পরিবর্তনে সবারই অবদান রাখা উচিত। নন রেসিডেন্স ড্যাফোডিল অ্যালামনাই সেই কাজটিই করবে। মজার বিষয় হচ্ছে, বাঙালি তিন থেকে চারজন এক জায়গায় মিলিত হলেই একটা সংঘ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো অবদান রাখতে পারে না। এক্ষেত্রে নন রেসিডেন্স ড্যাফোডিল এলামনাই সেরকম কোনো সংঘ হবে না, ইনশা আল্লাহ। আমরা বলতে চাই এটি হবে একটি নেটওয়ার্কিং ফোরাম। এই ফোরাম কোনো রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির অংশ হবে না। ‘আমরা বাংলাদেশি’ এটিই হবে এই ফোরামের পরিচয়।’

ড্যাফোডিল হবে উদ্যোক্তা উন্নয়নের মডেল
ড. মো. সবুর খান আরো বলেন, ‘এখানে উপস্থিত অ্যালামনাইদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই উদ্যোক্তা। বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সুতরাং ব্রিটিশ, পাকিস্তান থেকে শুরু করে সারা বিশ্ব এখন বাংলাদেশের উত্থান দেখছে। এখানে অর্ধশতাধিক তরুণদের দেখছি যারা ইতিমধ্যেই উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হয়েছে। এটাই হচ্ছে ড্যাফোডিলের সাফল্য। আপনারা জানেন, আমি প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরি করতে চাই। কারণ আমি বিশ্বাস করি উদ্যোক্তারাই পারবে দেশকে দ্রæত উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। সেজন্য বিগত কয়েক বছর ধরে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ড্যাফোডিলের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরি করেছি। উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য আমাদের রয়েছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেড, বিজনেস ইনকিউবেটর, স্টার্টআপ মার্কেটসহ নানা কিছু। দক্ষ জনবল তৈরি ও সরবরাহের জন্য রয়েছে স্কিলজবস। এইসবই করা হয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার জন্য। সর্বোপরি একটি দক্ষ জাতি তৈরি করার জন্য। আমি যখন ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ছিলাম তখন দেশব্যাপী দুই হাজার উদ্যোক্তা তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম।’

সেই দিন দেখার অপেক্ষায়…
বাঙালি হিসেবে আমাদের কিছু জাতিগত সমস্যার কথাও বলেন ড. মো. সবুর খান। একইসঙ্গে ড্যাফোডিলকে নিয়ে স্বপ্নের কথাও বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেকোনো ভালো কাজ করতে গেলে নানা ধরনের সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমালোচনাকে হজম করার শক্তি থাকতে হবে। আমরা ভালো কিছু করতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য সৎ। আর উদ্দেশ্য সৎ ছিল বলেই ড্যাফোডিল আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি। আপনারা জানেন কিউএস র‌্যাংকিংয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চতুর্থ অবস্থান অর্জন করেছে।

আমরা মাঝে মাঝে পানির উদাহরণ দেই। পানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী? পানিকে যে পাত্রে রাখা হয়, পানি সেই পাত্রেরই আকার ধারণ করে। পানির এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমাদের নিজেদের মধ্যে ধারণ করা উচিত। কারণ সারাবিশ্বে আমাদের পরিচিতি ছড়িয়েছে সমালোচনাকারী জাতি হিসেবে। আমরা যেকোনো ঘটনার বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই সমালোচনা করতে পছন্দ করি। এইসব চর্চা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত।

তিনি আরও বলেন, পানির বুকে যখন পাথর বা ঢিল ছোঁড়া হয়, তখন পানিতে ঢেউ ওঠে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ পানিকে যতই আঘাত করা হোক না কেন, পানি তা মেনে নিতে পারে। আমাদেরকেও পানির মতো সকল আঘাত ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে শান্ত থাকা শিখতে হবে।

এখানে ড্যাফোডিলের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অনেক পুরনো শিক্ষার্থীই আছেন। আপনারা নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে ড্যাফোডিলের কোনো কাজে কোনো ধরনের অসততা কিংবা অস্বচ্ছতা ছিল না। এখনো নেই। ড্যাফোডিল কোনোদিনই সার্টিফিকেট বিক্রি করেনি। এসব কারণেই ড্যাফোডিল আজ সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছে।

প্রফেসর জাকির ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজের চাকরি ছেড়ে ড্যাফোডিলে যোগ দিয়েছেন। ডিআইআইটি শুরুর সময়ে নূরুজ্জামান যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে এখনো ড্যাফোডিলের সঙ্গে আছেন। আমরা ড. তৌহিদ ভূঁইয়ার কথা বলতে পারি। ড. ফখরে হোসেনের কথা বলতে পারি। তারা সেই শুরু থেকে এখনো ড্যাফোডিলের সঙ্গে আছেন। এসবই আামাদের সৌন্দর্য ও শক্তি। আমি স্বপ্ন দেখি, ড্যাফোডিলের অ্যালামনাইদের মধ্য থেকে কেউ একজন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ভিসি হবেন। আমি সেই দিন দেখার অপেক্ষায় আছি।’

ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি…
স্বাগত বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ড্যাফোডিল ফ্যামিলির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে এত এত পুরনো মুখ দেখে আমি সত্যিকার অর্থেই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এরা সবাই আমাদের শিক্ষার্থী। ড্যাফোডিলের একেবারে প্রথম দিকের শিক্ষার্থীও আছে এখানে। দীর্ঘদিন পর ফ্যামিলির মানুষদের সঙ্গে মিলিত হলে যেকোনো মানুষ যেমন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, আমিও তেমনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এখানে উপস্থিত প্রায় ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আমি চিনি, তাদের প্রত্যেকের নাম পর্যন্ত আমি বলতে পারব। এই মুখগুলো দেখে আমার মনে পড়ছে সেই শুরুর দিনগুলোর কথা। তখন ধানমন্ডি ২৮ নম্বরে আমাদের একটি ক্যাম্পাস ছিল। ক্লাস করতে ওই ক্যাম্পাসের পিছনের দিকে একটি ভবনে যখন যেতে হত তখন শিক্ষার্থীরা বলত, চলো গ্রামে যাই। এটা ৯৮, ৯৯ সালের কথা বলছি। তখন আমাদের পড়াশোনার পরিবেশটাই ছিল এমন। এখন ড্যাফোডিল সেই সময়ের তুলনায় সহ¯্রগুণ বড় হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেড়েছে এর বিস্তৃতি।

আমাদের অ্যালামনাইরা বিশ্বের নামীদামী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কেউ মাইক্রোসফটে ডাটা সায়েনটিস্ট হিসেবে কাজ করছেন, কেউ লন্ডনের বড় প্রতিষ্ঠানে অ্যাডভোকেসি করছেন, যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন কেউ কেউ। ড্যাফোডিলের এই যে অগ্রযাত্রা দিনকে দিন আরো গতিশীল হচ্ছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি ইউআই গ্রিন ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হয়েছে। বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ র‌্যাংকিং কিউএস র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৪র্থ অবস্থানে রয়েছে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি। দেশের সবচেয়ে বড় অডিটোরিয়াম রয়েছে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে ড্যাফোডিলে। ড্যাফোডিল গ্রুপের ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই এতসব অর্জন সম্ভব হয়েছে ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থীদের কারণে। তারাই ড্যাফোডিলের মূল চালিকাশক্তি। আর সম্ভব হয়েছে এর চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খানের বিচক্ষণ দিক নির্দেশনার কারণে।

আমরা সর্বশেষ একত্রিত হয়েছিলাম ২০১৬ সালে। কিন্তু সেটা এত বড় আয়োজন ছিল না। এখন থেকে এই আয়োজন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে বলি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, এর অ্যালামনাইরা যখন সারা পৃথিবীর বড় বড় প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে, কর্মজীবনে সফল হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা হিসেবে গর্বে বুকটা ভরে যায়।

সবশেষে শুধু এটুকু বলি, ড্যাফোডিলের এই অগ্রযাত্রায় আপনাদের সাপোর্ট, সাকসেস ও সেক্রিফাইস একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে।’

জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর এস. এম জাকারিয়া হক। তিনি বলেন, ‘লন্ডনে অনেক মেধাবী তরুণের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। পরে জানতে পারি তারা ড্যাফোডিলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ড্যাফোডিলের এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। নানা বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করেই তাকে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষাকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশের দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে ড্যাফোডিল যে অবদান রেখে চলেছে তা সত্যিই অভিনন্দনযোগ্য। একটু পেছন ফিরে যদি তাকাই, সেই নব্বুই দশকে তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা ছিল সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ। সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করেই ড. মো. সবুর খান আজ সফল হয়েছেন। সফল হয়েছে তার ড্যাফোডিল গ্রুপ। এখানে আজ দেখতে পাচ্ছি সেই সাফল্যের কিছু অংশ। সফল অ্যালামনাইদের উজ্জ্বল মুখ দেখে আমি ভীষণ আনন্দিত। ড্যাফোডিলের এ জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক, সেই কামনাই করি।’

যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ ব্যবসায়ী ড. আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বেশি দিন নয়, মাত্র পাঁচ ছয় মাস আগে আমি ড্যাফোডিলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়েছি। এই প্রতিষ্ঠান প্রধানের নেতৃত্বগুণ দেখে আমি বিস্মিত। তারপর আজ ড্যাফোডিলের এতগুলো সফল অ্যালামনাই দেখি আরো বিস্মিত হচ্ছি। অনেক অ্যালামনাই যেমন সফল পেশাজীবী হয়েছেন তেমনি অনেকই হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। এইসব তরুণদের যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। অনুপ্রাণিত হচ্ছি তাদের দেখে দেখে।’

এইসব নানা বক্তব্য ও স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ড্যাফোডিল অ্যালামনাই ইউকে পুণর্মিলনী। একে একে বিদায় নেন অ্যালামনাইরা। তবে এ বিদায় মানে প্রস্থান নয়, বরং আগামীতে বিপুল সমারোহে ফিরে আসবার জন্যই এ বিদায়। তাই বিদায়ের আগে বাংলাদেশে থাকা ড্যাফোডিলের সেই পুরনো শিক্ষক ও সহকর্মীদের জন্য উপহারের বাক্স তুলে দিয়েছেন কেউ কেউ। সেইসব শিক্ষকদের এখনো মনে রেখেছেন তারা। ড্যাফোডিলের বন্ধন এমনই দৃঢ়, এমনই শক্তিশালী।

এই ফাঁকে দিয়ে রাখি সম্পূরক তথ্য: ড্যাফোডিল পরিবারের প্রায় ৬০ হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা পর্যায়ে কর্মরত রয়েছে। ড্যাফোডিল থেকে পাস করা প্রায় পাঁচ শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী দেশের বাইরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে এবং তাদের নিজ নিজ দেশে বিচার বিভাগ, উপাচার্য, মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা বিভাগসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।

Leave a Reply