বস হিসেবে হয়ে উঠুন শ্রদ্ধাভাজন

বস হিসেবে হয়ে উঠুন শ্রদ্ধাভাজন

শামীম রিমু : কর্মক্ষেত্রে যারা অধীনস্থ কর্মচারীদের শ্রদ্ধা, প্রশংসা ও সম্মান অর্জন করে নেন, তাঁদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। ভবিষ্যতে কোনো একদিন আপনার অধীনেও অনেক কর্মচারী কাজ করবে, হয়তো বর্তমানেই করছে, তাই দেরী না করে আসুন চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক একজন শ্রদ্ধাভাজন বসের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের ওপর।


১. নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পথে কর্মচারীদের সঙ্গী করে নেওয়া

কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা তাঁর দলের নেতা। দলকে লক্ষ্যের দিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা তাঁর দায়িত্ব। সুস্থির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পথে ধাবিত হওয়ার জন্য চাই অনুপ্রেরণা, তাই একজন দক্ষ কর্মকর্তা তাঁর নিজ দর্শন ও অভিজ্ঞতা কর্মচারীদের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে দ্বিধা করেন না।

২. দক্ষ দল গঠন এবং সদস্যদের আরো দক্ষ করে তোলা

একজন দক্ষ কর্মকর্তা তাঁর কর্মচারী বাছাই করেন নিখুঁতভাবে। ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের প্রস্তুত করে তোলাও তাঁর দায়িত্ব। যেই কর্মকর্তা শুধুমাত্র তাঁর সুউচ্চ পদের অহংকার নিয়ে থাকেন ও হুকুম করা যার একমাত্র পারদর্শীতা, তার অধীনে কাজ করাটাও দূর্বিষহ হয়ে ওঠে।

৩. সময়ের মূল্যায়ন করা

একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নিজের এবং অন্যদের সময়ের মূল্যায়ন করতে জানেন। কর্মচারীদের অপেক্ষায় বসিয়ে রাখা তাঁর অপছন্দের কাজ, বিরক্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় মিটিং তিনি এড়িয়ে চলেন, কর্মক্ষেত্রে হাসি তামাশা করে অন্যদের চাঙ্গা করে রাখা তাঁর অভ্যেস।

৪. তথ্য গোপন না করা

অনেক কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি কর্মচারীদের কাছে গোপন রাখেন। এটি হীনমন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব ছাড়া কিছুই নয়। তবে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যসমূহ প্রকাশ করায় পারদর্শীতা অত্যাবশ্যক। একজন স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল কর্মকর্তা অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অধীনস্থদের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন।

৫. সিদ্ধান্তহীনতায় না ভোগা

একজন দক্ষ কর্মকর্তা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন না, সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেন না এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর সাজে না। কারণ তাঁর সিদ্ধান্তই অধীনস্থদের জন্য আদেশস্বরূপ।

৬. প্রশংসা করা

নতুন কর্মচারীরা প্রায়শঃই তাদের কাজ নিয়ে শঙ্কায় ভোগেন, কাজের মান নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করেন। কিন্তু একজন দক্ষ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে তাদের কাজের ইতিবাচক সমালোচনা ও প্রশংসা করে থাকেন, যা তাদের আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

৭. সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ

সাংসারিক ও আর্থ-সামাজিক চাপে ভোগা কর্মচারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে একজন দক্ষ বস কখনোই কুণ্ঠাবোধ করেন না। এতে তাঁদের আন্তঃসম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়, যা নিঃসন্দেহে পুরো প্রতিষ্ঠানে জন্য কল্যাণকর।

৮. ধন্যবাদজ্ঞাপন

ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কাউকে ছোট করে না এবং এটি সংক্রামক। ধন্যবাদজ্ঞাপনের এই সংস্কৃতি পুরো দলের মাঝে এক ধরনের উদ্যম এনে দেয়। তাই এই অভ্যেস চালু করে দেওয়ার কাজটাও কিন্তু দক্ষ কর্মকর্তার।

৯. বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করা

শ্রদ্ধাভাজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে ঢোল পেটান না, জোরপূর্বক বা ব্যাখ্যাতীত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াও তাঁদের কাজ নয়। তাই সরাসরি আদেশ না দিয়ে কর্মচারীদের করিৎকর্মা প্রশ্ন জিজ্ঞাস করায় তাঁদের পারদর্শীতা লক্ষণীয়। সাধারণত এসব প্রশ্নই তাঁর যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে এবং দলকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

১০. কাজের ওপরে জীবনের অগ্রাধিকার দেওয়া

কর্মক্ষেত্রে কাজের প্রাধান্য সর্বোচ্চ, কিন্তু কারো জীবন বিপন্ন করে নয়। তাই যাপিত জীবনের কঠোরতার বিপক্ষে কর্মক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদান একজন দক্ষ কর্মকর্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১১. ভুল স্বীকার করে নেওয়া

যদিও দক্ষ কর্মকর্তা সচরাচর ভুল করেন না, কিন্তু মরনশীল মানুষ হিসেবে দু’একবার যদি তা করেও ফেলেন, নির্দ্বিধায় তা প্রকাশ করেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করতে ভোলেন না।

১২. রসিকতাবোধ

একটি জাপানি প্রবাদ আছে- বেরসিক ব্যক্তির সঙ্গের চেয়ে নিঃসঙ্গতা ভালো। কর্মক্ষেত্রে নির্দোষ রসিকতা প্রাণচাঞ্চল্য বাড়িয়ে উদ্যম জোগায়, আর সেই রসিকতাটি যদি করেন দলনেতা, তাহলে তাঁর প্রভাব হয় আরো ইতিবাচক। কর্মক্ষেত্রে সংকোচ দূর করায় রসিকতার বিকল্প নেই।

১৩. সাফল্য উদযাপন ও সফলতার ভাগীদার করে নেওয়া

যেই ব্যক্তি দলীয় সফলতার গৌরব কুক্ষিগত করে নেন এবং ব্যর্থতার দায় চাপান অন্যদের ওপর, তার অধীনে কাজ করতে কেউ ভালোবাসে না। পক্ষান্তরে, একজন দক্ষ কর্মকর্তা দলগত প্রতিটি সাফল্য উদযাপন করেন উৎসবের মতো।

১৪. আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া ও নেতৃত্ব গড়ে তোলা

একজন কর্মকর্তা তাঁর আদর্শে অধীনস্থদের অনুপ্রাণিত করেন, উৎসাহিত করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের প্রস্তুত করে তোলেন। এ ব্যাপারে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করে না। তাঁর অধীনে কাজ করতে করতে কর্মচারীদের প্রত্যেকে একেকজন সুদক্ষ নেতা হয়ে ওঠেন, নিজের অজান্তেই।favicon594

Leave a Reply