ব্যবস্থাপকের ভুলে কর্মী যায় চলে

ব্যবস্থাপকের ভুলে কর্মী যায় চলে

শামীম রিমু : ভালো কর্মচারীরা চাকরি ছেড়ে চলে যান- ব্যবস্থাপকদের এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু তাঁরা এটা স্বীকার করতে চান না যে একজন ভালো কর্মচারী চাকরি নয়, আসলে ছেড়ে যান প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে। চলুন, দেখে নেয়া যাক একজন ব্যবস্থাপকের সেইসব ভুলগুলো, যার কারণে দক্ষ কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। 


১। অত্যধিক খাটানো

যে কর্মচারীটি মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করে, তাকে সার্বিকভাবে চাপ দিয়ে কাজ করান একজন ব্যবস্থাপক; কারণ ব্যবস্থাপক চান দায়িত্বশীল কারো কাঁধে কাজটি চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে। কিন্তু কাজের চাপ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে একজন কর্মচারী নিজের গুণাবলীকে অভিষাপস্বরূপও দেখতে পারেন। স্ট্যানফোর্ডের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, সপ্তাহে ৫০ ঘন্টা শ্রমদান উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে, এবং তা ৫৫ ঘন্টায় পরিণত হলে উৎপাদনশীলতা এমনভাবে হ্রাস পায় যে সেখান থেকে আর নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনাই থাকে না। তাই দক্ষ কর্মচারীদের দিয়ে অতিরিক্ত খাটাতে হলে তাঁদের পদমর্যাদায় পরিবর্তন আনা উচিৎ। কাজের চাপ নিতে তাঁরা অস্বীকার করেন না, কিন্তু দমবন্ধ করার মত পরিস্থিতিতে সেসব কাজ ছেড়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। বেতনবৃদ্ধি, পদোন্নতি এসবের মাধ্যমে সহজেই দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়া যায়। কিন্তু কোনরকম পদোন্নতি ছাড়া শুধুমাত্র কাজের চাপ বাড়ালে নিজ প্রাপ্তিটুকু বুঝে নিতে চাকরি পরিবর্তন করতেও দ্বিধাবোধ করেন।

২। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অনীহা ও পুরস্কৃত না করা

কোন কোন কর্মচারী শুধুমাত্র প্রকাশ্য প্রশংসাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, আবার কাজের মাত্রা অনুসারে কেউ কেউ বোনাস বা বেতনবৃদ্ধি আশা করেন। একজন ভালো ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব এসব সম্পর্কে অবহিত থাকা। প্রশংসা করা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে কৃপণ হলে ভালো কর্মচারী হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশংকা থেকে যায়।

৩। কর্মচারীদের প্রতি খেয়াল না রাখা

যে সকল কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দেন, তাঁদের অর্ধেকের বেশী কারণ হিসেবে কর্মকর্তার সাথে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বেহাল পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। একটি ভালো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক নিজের পেশাদারিত্বের সাথে মানবিকতার এক অদ্ভুত মিশেলে নিজেকে গড়ে তোলেন। এছাড়া, ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছাড়া কোন কর্মচারীকে দিয়ে দৈনিক আট ঘন্টার বেশী সময় ধরে কাজ করানো প্রায় অসম্ভব।

৪। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা

কোন কর্মচারীর প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার দু’টি ফলাফল হতে পারে; প্রতিশ্রুতি পূরণের ফলে হয় কর্মচারীটি খুব সন্তুষ্ট থাকবে নতুবা অসন্তোষের কারনে পদত্যাগ করা ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকবে না। যদি ব্যবস্থাপক নিজে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করেন, তাহলে একজন কর্মচারীও নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে বেখেয়ালী হয়ে উঠবেন।

৫। ভুল ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়া

দক্ষ ও পরিশ্রমী ব্যক্তিরা সম মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে কাজ করতে ভালোবাসেন। একজন ব্যবস্থাপক যদি নিজে কঠোর পরিশ্রমী না হন তবে অধীনস্থরা কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। এছাড়া ভুল ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান বা পদোন্নতি দেয়া দক্ষ কর্মচারীর জন্য অপমানজনকও বটে।

৬। আবেগের মূল্যায়ন না করা

দক্ষ ও প্রতিভাধর কর্মচারী সাধারণত আবেগপ্রবন হয়ে থাকেন। একজন ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব কর্মক্ষেত্রে তার আবেগের মূল্যায়ন করা। নতুবা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেতে পারে। পক্ষান্তরে, আবেগের সঠিক মূল্যায়ন হলে কর্মচারী আরো উদ্দীপ্ত হয়ে কাজ করে এবং উৎপাদনশীলতা বেড়ে যায়।

৭। দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার সঠিক ব্যবহারে ব্যর্থতা

একজন কর্মচারীকে নির্দিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ করে রাখলে তার দক্ষতা শানিত হয় না। উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে কোন কার্যপদ্ধতি ও সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করলে সৃষ্টিশীলতাও আত্মবিশ্বাসের অভাবে পরিনত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কর্মচারী নিজের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেতে চায়, ফলাফলে প্রতিষ্ঠান একজন সম্ভাবনাময় কর্মচারী হারায়।

একজন ব্যবস্থাপক যদি চান তার মূল্যবান কর্মচারীদের ধরে রাখতে, তবে তাঁদের সাথে যে কোন প্রকার যোগাযোগ স্থাপনে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যদিও এটি বেশ কঠিন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা অত্যাবশ্যক। favicon594

Leave a Reply