শিক্ষা কর্মজীবনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না

শিক্ষা কর্মজীবনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না

  • ওবায়দুল করিম খান

শিক্ষা ও মেধা কি কর্মজীবনে সাফল্য বয়ে আনতে পারে? বিষয়টি বিদেশের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করছি।

ইউরোপ ও আমেরিকায় মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সফট স্কিল এখন বহুল আলোচিত বিষয়। সব দেশেই সফট স্কিলস বাড়ানোর জন্য কোর্স ও ট্রেনিংয়ের প্রসার হচ্ছে। ডেনমার্কে সফট স্কিলের ওপর অনেক প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে। এমন একটা কেন্দ্রে আমি নিজেও খণ্ডকালীন শিক্ষক। তাই বিষয়টি দেশি পাঠকদের কাছে তুলে ধরছি।

সফট স্কিল কী? সফট স্কিল হলো ব্যক্তিগত গুণাগুণ যা জীবনে সাফল্যের জন্য আবশ্যক। বিভিন্ন গবেষণ ও জরিপে দেখা গেছে, শুধুমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতায় উচ্চপদের চাকরি পাওয়া যায় না। আবার চাকরি পাওয়া গেলেও পদোন্নতি কম হয়।

ক্যারিয়ারে সফলতার জন্য শিক্ষা ও মেধা ছাড়াও কিছু ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্থাৎ সফট স্কিল প্রয়োজন হয়। সফট স্কিলের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু এর মধ্যে দুটি একেবারে মৌলিক—কমিউনিকেশন (পারস্পরিক যোগাযোগ) ও নেগোসিয়েশন (আলোচনা ও সমঝোতা)।

কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন সমকর্মীদের সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন আছে। যা করতে হলে দরকার হয় অন্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়া, মনোযোগসহ শোনা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা ও আস্থার সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করা। চাকরি ও ব্যবসায় পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব দূর করে মতৈক্যে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।

আমরা দেশে বাল্যকাল থেকে শুনে আসছি শিক্ষা, মেধা ও কঠোর পরিশ্রম জীবনে সফলতার চাবিকাঠি। অভিভাবক ও শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরাও তাই শিখেছি। আমরা যখন অভিভাবক হয়েছি তখনো আমাদের সন্তানদের একই শিক্ষা দিয়ে চলেছি। শিক্ষার ব্যাপারটা জীবন মরণ সমস্যার মতো নেওয়া হয়। কোন স্কুলে গেলে ভালো হবে, কোন কোচিং সেন্টারটা ভালো। বাবা-মার মাথায় শুধু এই চিন্তা। তারা সন্তানের শিক্ষার জন্য সব রকমের ত্যাগ স্বীকার করছেন। সন্তানও বাবা-মাকে খুশি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। সন্তান ও পিতামাতার একটাই উদ্দেশ্য তা হলো, ভালো রেজাল্ট করে জীবনে সফল হওয়া।

কিন্তু শিক্ষা ও মেধা দিয়ে কি ভালো চাকরি পাওয়া যায় কিংবা জীবনে সফল হওয়া যায়? সফলতার ধারণা সমাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনশীল। সফলতার সমসাময়িক ধারণা। জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানো এবং পারিবারিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আরামদায়ক জীবন, আর্থিক সচ্ছলতা ও সমাজে জনপ্রিয়তা সফলতার উপাদান।

আমার ডেনমার্কের সুদীর্ঘ কর্মজীবনে আমি অনেক সফল ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছি ও অনেক পরামর্শ নিয়েছি। কর্মজীবনে অনেক রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও ধনী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। অনেকের সফলতার পথগুলো আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি কখনই সফলতার সঙ্গে মেধার ও শিক্ষার সম্পূর্ণ সম্পৃক্ততা দেখিনি।

পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ব্যক্তিদের স্কুলের পরীক্ষায় পাস করার মতো মেধা নেই। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যক্তি ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ ও বিল গেটস কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে পারেননি।

কার্নেগি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সফলতার সঙ্গে মেধার কিছু সম্পৃক্ততা আছে। আর সিংহভাগ অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ সফলতা এসেছে আলাপ-আলোচনা, সমঝোতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার পারদর্শিতা থেকে। যার অর্থ কমিউনিকেশন ও নেগোসিয়েশন স্কিল দিয়ে সাফল্য এসেছে।

গুগল ও মাইক্রোসফটে হাজার হাজার মেধাবী, পিএইচডি, পোস্ট পিএইচডি ডিগ্রিধারী কর্মী আছেন। কিন্তু গুগলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানানো হলো সুন্দর পেচাইকে যার পিএইচডি ডিগ্রি নেই। মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলার পিএইচডি নেই। তাদের কেন সিইও করা হলো? শুধু সফট স্কিলের জোরে।

মানুষ যাকে ভালো লাগে, যাদের বিশ্বাস ও দায়িত্বশীল মনে করে তাদের পছন্দনীয় মনে করে ও তাদের সঙ্গে ব্যবসা করে। এমনকি সেই পছন্দের ব্যক্তিটি বেশি দামে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করলেও তারা তা মেনে নেয়। গবেষণা না হলেও বাংলাদেশের চিত্রও মোটামুটি একই বলা যায়। যারা বাকপটু, কথাবার্তায় সবাইকে খুশি করতে পারে, এক কথায় যারা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। কর্মক্ষেত্রেও তাদের দ্রুত পদোন্নতি হয়।

তারা যেকোনো অফিস থেকে নিজেদের যেকোনো কাজ সহজে করিয়ে নিতে পারে। বুদ্ধি, বিবেচনা, যুক্তি দিয়ে কথা বলা এ ক্ষেত্রে তেমন কাজে লাগে না। আমাদের দেশে তথাকথিত ভালো ছাত্ররা যদি গতানুগতিক গণ্ডি থেকে না বের হয়, তাহলে তাদের জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কর্মদিবসে এক গাদা ফাইলের মধ্যে ডুবে থাকা, রুটিন মাফিক বাড়ি আবার কাজে যাওয়া, এমন জীবনকে সফল বলা যায় না।

আমরা যাকে মেধা বলি তা বলতে শুধু গাণিতিক ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা বোঝায়। প্রচলিত মেধার বাইরেও যে মেধা এ যুগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তা হলো আবেগীয় মেধা।

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার বলতে ব্যক্তির আবেগ বোঝার ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, মূল্যায়ন ও প্রকাশ করার ক্ষমতা বোঝায়। এই বুদ্ধিমত্তা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, অন্যদের সঙ্গে সংযোগ এবং আলোচনা ও আপস করার পারদর্শিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সফট স্কিলসের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর মেধার বুদ্ধিমত্তা প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বড় বড় কোম্পানিগুলো সফট স্কিল ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে একটা সম্পদ মনে করছে। নতুন কর্মী খোঁজার সময় প্রার্থীর সফট স্কিল বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে।

আমি নিজে ডেনমার্কে অনেকগুলো কোম্পানিতে খণ্ডকালীন চাকরি করেছি। সব কোম্পানিতেই দেখেছি, যে তরুণদের ব্যক্তিত্ব আকর্ষণীয়, অন্যদের কনভিন্স করার দক্ষতা বেশি, তারা অন্যদের টপকে কোম্পানি প্রধান হয়ে যায় আর যারা পুরোনো ধারণার মেধাবী তারা পেছনে পড়ে থাকে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবেগীয় মেধায় একজন জিনিয়াস কিন্তু তাঁর প্রচলিত আইকিউ বেশি নয়।

প্রচলিত মেধা অনেকটা গাণিতিক, সংখ্যা বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে সামাজিক দক্ষতা অনেকটা বর্ণনামূলক।

সফলতার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু শিক্ষাকে যতটা অতিরঞ্জিত করা হয়, অত আবশ্যক নয়। ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য শিক্ষার যতটুকু প্রয়োজন আছে, তার চেয়ে বেশি মানবসভ্যতা বিকাশের জন্য।

যুগ যেভাবে পাল্টাচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রথাগত শিক্ষা ও বুদ্ধি দিয়ে চাকরি ও পেশায় ভালো করা সম্ভব হবে না। অভিভাবকেরা সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন ও সবকিছু করেন। এখন তাদের একটু ভিন্ন ভাবে ভাবতে হবে।

ওবায়দুল করিম খান: ডেনমার্ক।

সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply