উচ্চশিক্ষা: কী পড়ব, কেন পড়ব

উচ্চশিক্ষা: কী পড়ব, কেন পড়ব

  • . নিয়াজ আহম্মেদ

উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখন শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হচ্ছে। আর উচ্চশিক্ষা যেখানে অবৈতনিক নয় ও শিক্ষা শেষে চাকরির নিশ্চয়তা শতভাগ নেই, সেখানে বিবেচনায় আনা স্বাভাবিক। শিক্ষা শেষে চাকরি পাওয়া না পাওয়া, আরো উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকা না থাকা বিবেচ্য বিষয় হয়ে দেখা দেয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শিক্ষার মূল হওয়ায় এখানেও চিন্তার বিষয় রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর একজন শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবক ভাবেন কোথায় ও কোন বিষয়ে ভর্তি হলে পরবর্তী জীবন অর্থাৎ কর্মজীবনে প্রবেশ করা সহজ হবে। শিক্ষা খরচের বিষয়টি সামনে আসায় ভাবনাটি এতটা বেশি কাজ করে যে ভালো শিক্ষার সুযোগ থাকলে যত কষ্টই হোক না কেন, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। কেননা এর সঙ্গে তার ও তার পরিবারের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

গত দুই দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর চাকরির সুযোগ দেশে ও দেশের বাইরে তৈরি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার তুলনায় প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের ঝোঁক বাড়ছে। কারণ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ মানের চাকরির সুযোগ ব্যাপক তৈরি হচ্ছে না, যেমনটি হচ্ছে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে। এখন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজন। ফলে এখানেও সাধারণ কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েটের পরিবর্তে প্রযুক্তি জ্ঞানে শিক্ষিত তরুণদেরও আকৃষ্ট করছে। কেননা তারা মেধা ও প্রযুক্তি জ্ঞানে বেশি দক্ষ। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকতে দেখা যায়। মনে করা হয়, যেহেতু বিজ্ঞান ও গণিতে ভালো নয়, সেহেতু কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান পড়াই উত্তম। আবার রাষ্ট্রীয় নীতি এমন, যেখানে বেশি করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা প্রদান করা এবং এর জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নতুন নতুন বিভাগ খোলারও ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; যদিও অন্য বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, তবে তা সীমিত আকারে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, দর্শন কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে পাঠদান করানো হয় না। সুযোগ দেওয়া হলেও শিক্ষার্থী পাওয়া দুষ্কর হবে। অথচ এ বিষয়গুলো জানা খুব দরকার।

034513D_niaj_ahmad
ড. নিয়াজ আহম্মেদ। ছবি: সংগৃহীত।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পড়ার আগ্রহ বেশি হওয়ায় সমস্যা দেখা দেয় সেই পরিমাণ মানসম্মত বিষয়ে পড়ার সুযোগ না থাকায়। আবার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাড়তি সুযোগ থাকে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানে পড়ার। সুযোগ থাকলেও তারা কেন পড়তে চাইবে? নিতান্ত আগ্রহ নিয়ে দু-চারজন পড়তে চাইলেও বেশির ভাগই অনাগ্রহ কিংবা বাধ্য হয়ে পড়ে। কেননা তাদের জন্য আমরা বিজ্ঞানে ব্যাপক সুযোগ তৈরি করতে পারছি না। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে কলা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে ভর্তি হয় তখন তার মধ্যে প্রচণ্ড হতাশা কাজ করে। তার হয়তো আর্থিক সামর্থ্য নেই বিধায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়তে পারছে না। তাকে পড়তে হচ্ছে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো মানিয়ে নিতে পারে, আবার অনেকে পরেরবার সুযোগ নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চলে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপট এমন যে মৌলিক বিজ্ঞানে পড়ার আগ্রহও কমে যাচ্ছে। একমাত্র শিক্ষা যেন প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও মেডিক্যালে।

বাস্তবতা এমন, একজন মেডিক্যালের শিক্ষার্থী একসময় ডাক্তার, একজন প্রযুক্তিতে পড়া শিক্ষার্থী প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত হয়; কিন্তু অন্যদের পরিচয় কোথায় কিভাবে হবে তা নির্দিষ্ট নয়। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারছি না। ফলে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে পছন্দহীন বিষয়ে অনেককে পড়তে হচ্ছে। অনেকের পুরো শিক্ষাজীবনই দুশ্চিন্তা ও হতাশায় কাটছে। মন দিয়ে লেখাপড়া করতে পারছে না। অনেকের শিক্ষাজীবন ঝরে পড়ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের বড় বিষয় হওয়া উচিত তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু শিক্ষার্থীদের তীব্র চাপ মোকাবিলা করার সামর্থ্য আমাদের থাকা দরকার। বেসরকারি শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মানও আস্তে আস্তে বাড়ছে; কিন্তু পড়ার সামর্থ্য সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে যেমনটি হচ্ছে একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে পড়তে হচ্ছে। আমরা যদি উচ্চ মাধ্যমিকের পর বড় একটি অংশকে টেকনিক্যাল শিক্ষার দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারতাম এবং সেই অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হতো, তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভর্তির চাপ অনেকটা কমত। দ্বিতীয়ত, নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বিশেষায়িত বিষয়ে পাঠদান করানো সম্ভব। পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে বর্তমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শিফট চালু করা যেতে পারে। এখনকার সময়ে অভিভাবক ও তাঁদের সন্তানরা এতটাই সচেতন যে উচ্চশিক্ষায় যদি বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় সেখানে তারা চিন্তা করবে। কোনো কোনো বিষয়ে পড়ার আগ্রহ এতটাই বেশি যে এক জায়গায় সুযোগ না মিললে অন্য জায়গায় সুযোগ খুঁজতে হয়। কেননা বিষয়টি চাকরির নিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আবার এমন বিষয় রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থী আদৌ ভর্তি হতে চায় না। এমনটি আমরা লক্ষ করেছি এবার রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের চাহিদা মাথায় রেখে বিষয় খোলার ব্যাপারে মনোনিবেশ করা উচিত।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: কালের কণ্ঠfavicon59-4

Leave a Reply