চীন-ভারত পেরেছে, আমরা কেন পারব না?

চীন-ভারত পেরেছে, আমরা কেন পারব না?

  • . মো. নাছিম আখতার

বিশ্বকে যে জয় করে, তাকে বলা হয় দিগ্বিজয়ী। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বিশ্বকে জয় করেছিলেন তাঁর সাহস, পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে। প্রাচীনকালে যখনই কোনো জাতি আরামপ্রিয় ও শিক্ষাদীক্ষায় অমনোযোগী হয়েছে, ঠিক তখনই অন্য একটি জাতির আগ্রাসনে তারা পরাধীন জাতিতে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা ব্রিটিশ শাসনের কথা বলতে পারি। বাংলা ও মোগল শাসকরা যখন আরাম-আয়েশে মত্ত ছিলেন ঠিক তখনই জ্ঞান-বিজ্ঞানে তুলনামূলক অগ্রসরমাণ ইংরেজ জাতি আমাদের পরাধীন জাতিতে পরিণত করেছিল।

বর্তমানেও দেশ দখল হচ্ছে, তবে তার রূপ কিছুটা ভিন্ন। অর্থনৈতিক শক্তিতে উদীয়মান চীন আজ পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের সরকার ভিনদেশে বাড়ি কেনার জন্য তাদের নাগরিকদের ঋণ দিচ্ছে। চীনও আজ দিগ্বিজয়ী জাতি গঠনে তৎপর। কিন্তু প্রাচীনকালের মতো যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে নয়, বরং জনসম্পদ ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে। এখানে উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার অনেক এয়ারপোর্টেই চায়নিজ যাত্রীদের জন্য চীনা ভাষায় ঘোষণা দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় অর্থনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে চায়নিজদের হাতে। তাই চায়নিজদের বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ায় কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্ভব নয়। এ বিষয় দুটিকে আমি চায়নিজদের জন্য সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছি।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। বিভিন্ন দেশে কর্মক্ষেত্রে তারা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। ফিজি, সুরিনাম, গায়ানা ও মরিশাসের মতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। যে দেশ দুটির কথা উল্লেখ করলাম, সেগুলো জনবহুল দেশ। চীন ও ভারতের জনসংখ্যা যথাক্রমে ১৩৪ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ৭০৬ ও ১৩৮ কোটি ৮২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৩ এবং আয়তন যথাক্রমে ৯৩ লাখ ৮৮ হাজার ২১১ ও ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৯০ বর্গকিলোমিটার। চীন ও ভারতের প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে যথাক্রমে ১৪৫ ও ৪৬৭ জন (প্রায়)। কিন্তু আমাদের দেশে বাস করে প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক হাজার ২০ জন (মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি হিসাবে)। আয়তনের বিচারে আমাদের জনসংখ্যা তাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। আমাদের সময় এসেছে জাতিকে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে মেধা ও শিক্ষার গুণে তারা হতে পারে দিগ্বিজয়ী জনগোষ্ঠী।

000737kalerkantho.com-28-03-17-51_
ড. মো. নাছিম আখতার

বর্তমান বিশ্ব ইনফরমেশন টেকনোলজি-নির্ভর। জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় যার জ্ঞান যত বেশি সে তত অগ্রসরমাণ। প্রগ্রামিংয়ে বিশ্বের সেরা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম থেকে ১০তম অবস্থানে থাকা দেশগুলো হলো—চীন, রাশিয়া, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জাপান, তাইওয়ান, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক ও ইতালি। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের ডাটা বেইস হ্যাক করেছেন রাশিয়ান প্রগ্রামার। রাশিয়ানদের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তাদের গণিত শিক্ষার ভিত্তি অনেক মজবুত। কম্পিউটার প্রগ্রামিংয়ের মূল ভিত্তি হলো গণিত। গণিতের ব্যবহারেই কোনো সমস্যা সমাধানের গাণিতিক মডেল বা অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়। আমাদের গণিত শিক্ষায় এসব দেশের গণিত শিক্ষাপদ্ধতি অনুকরণীয় হতে পারে। বর্তমান সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয় আইটি শিক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর। সে ক্ষেত্রে প্রগ্রামিং বিষয়ক প্রশিক্ষণের আগে গণিতের জ্ঞানকে যাচাই করে নিলে আইসিটি সেক্টরে আরো বেশি দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। আমরাও বিশ্বাস করি, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের সন্তানরাও একদিন প্রগ্রামিং নৈপুণ্যে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোকে পেছনে ফেলবে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের এ যুগে মানুষ হয়ে পড়ছে অলস আর এ অলসতাই মানুষকে করছে শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিক চাপ বহনে অক্ষম। প্রায়ই শোনা যায়, ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সে মানুষ স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করছে। শিক্ষিত জাতি গঠনের প্রথম শর্ত হলো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠী তৈরি। বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁর দিকে তাকালে দেখব ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া। এর কারণ তিনি মার্শাল আর্টে ব্ল্যাক বেল্টপ্রাপ্ত কেজিবির কর্মকর্তা ছিলেন। শুনেছি, এ বয়সেও তিনি মার্শাল আর্ট অনুশীলন চালু রেখেছেন। তাই প্রতিকূল পরিবেশে স্নায়ুযুদ্ধে তিনি বেশির ভাগ সময়ই জয়ী হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশ তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে টালমাটাল।

জীবনে চলার পথে নানা ধরনের দুঃখ-কষ্ট, উত্থান-পতন থাকবেই। এ প্রতিকূলতাকেই সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলার জন্য চাই সুস্বাস্থ্য ও সবল মন, যা কেবল খেলাধুলা ও শারীরিক অনুশীলনের মাধ্যমে সম্ভব। কায়িক পরিশ্রম ও খেলাধুলার সঙ্গে মানুষের মনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি মানুষের অ্যানাটমি বিশ্লেষণ করি, দেখব যে Endorphin, Seretonin, Dopamine, Oxytocin নামের হরমোনগুলোর নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকলে মানুষ হাসিখুশি আর আনন্দে থাকে। তার মধ্যে থাকে না কোনো হতাশা বা বিষাদ। গবেষণায় দেখা গেছে,  উপরোল্লিখিত হরমোনগুলোর স্বাভাবিক নিঃসরণ কায়িক পরিশ্রম ও খেলাধুলার ওপর নির্ভরশীল। মনের আনন্দ ও স্ফূর্তি সঠিক পড়াশোনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই খেলাধুলা, সাঁতার কাটা ইত্যাদিকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

যেকোনো পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস শিক্ষার উন্নয়নে বড় অন্তরায়। কারণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ, উদ্দীপনা ও প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়ে যায়। আর এ প্রতিযোগিতা নষ্ট হলেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য গবেষক সৃষ্টি হবে না। ফলে গবেষণানির্ভর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ‘কষ্ট না করেই যদি আশা পূরণ হয়, তবে কেন এত কষ্ট করা!’ এ মানসিকতা জাতিকে করবে হতোদ্যম, কর্মবিমুখ ও কল্পনাপ্রবণ—যাদের কল্পনা কখনোই বাস্তবে পাখা মেলবে না।

সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারের নিবিড় পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। যেকোনো পরীক্ষাপদ্ধতির প্রতিটি ধাপই যেন সততার সঙ্গে সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট অর্জিত হয়। তাহলেই আমরা পাব এই বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে সেই মেধাবী সন্তান, যারা দেশে ও দেশের বাইরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে করবে সমৃদ্ধ এবং বিশ্বের বুকে সুপরিচিত। জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় মানসম্মত জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে আমাদের সন্তানরাই ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের বুকে জ্ঞান বিতরণের কাণ্ডারি হয়ে, ছিনিয়ে আনবে আমাদের জন্য অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিজয়।

লেখক : ডিন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

সূত্র: কালের কণ্ঠfavicon59-4

Leave a Reply