শিক্ষা খাতে নৈরাজ্য দুর্নীতি দায়িত্ব ও করণীয়

শিক্ষা খাতে নৈরাজ্য দুর্নীতি দায়িত্ব ও করণীয়

  • আহমদ রফিক

আজ যাঁদের বয়স আশির ঊর্ধ্বে, তাঁদের রয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সেই সঙ্গে অভিভাবকদের কাছ থেকে শোনা একটি কিংবদন্তিসুলভ তথ্য, সেকালের সমাজে শিক্ষা খাত ছিল পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত একটি ভুবন। পাশাপাশি ডাক বিভাগেরও সুনাম ছিল একই অভিধায়। স্বাস্থ্য বিভাগ উন্নত না হলেও দুর্নীতির কালো ছায়া সেখানে বড় একটা দেখা যেত না। তবে পুলিশ বিভাগকে বলা হতো দুর্নীতিপরায়ণ।

সমাজ তখন ধোয়া তুলসী পাতা, এমন ভাবার কারণ নেই। অতীত মানে সোনালি যুগ, এমন মুগ্ধতাও বাস্তব ঘটনা নয়। তবে অভিজ্ঞতা ও তথ্য বলে সমাজে দুর্নীতির ছিল সীমাভেদ ও মাত্রাভেদ, যেমন প্রশাসনে। এই মাত্রাভেদের একটি উদাহরণ দুধে পানি মেশানো। আর সে জন্য গ্রামে দু-একটি কৃষক পরিবারকে চিহ্নিত করতে দেখেছি। অর্থাৎ এটা সাধারণ্যে দুর্নীতিবিরোধী চেতনা তথা নৈতিকতার উদাহরণ। আর শহরে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরকে দেখা গেছে একই কারণে বাজারে অভিযান চালিয়ে দু-একটি দুধভরা ঘটি ড্রেনে উপুড় করে ঢেলে দিতে। অপরাধ, দুধে পানি মেশানো হয়েছে, ল্যাকটোমিটারের পরীক্ষায় সাক্ষাৎ প্রমাণ।

আর এখন? দুধে শুধু পানি নয়, আরো কিছু ক্ষতিকর  উপাদানের মিশ্রণ চলছে। চলছে ফল, শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছে পর্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার। বিষাক্ত লিচু খেয়ে বছর কয়েক আগে ১৪টি শিশু মারা গেল, সংবাদপত্রে প্রথম পাতায় শিরোনাম; তা সত্ত্বেও সমাজ নড়েচড়ে বসেনি। আম আর মাছ নিয়ে সম্প্রতি কিছুটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, বাদবাকিগুলোর একই অবস্থা।

এমন এক ঐতিহ্য সৃষ্টির কারণে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের প্রবল দাপটের কারণে ‘বিশুদ্ধ’ শব্দটা খাদ্য ও প্রাত্যহিক ব্যবহার্য পণ্যের তালিকা থেকে প্রায় উধাও হয়ে যেতে বসেছে। একসময় সরষে তেলে মবিল ভেজালের ভয়াবহতার কারণে বহু পরিবার সেই থেকে সয়াবিনে ঝুঁকে পড়ে, আর তা দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী ‘বিশুদ্ধ ঘানিভাঙা সরষের তেল’ সেই সঙ্গে আরো একাধিক কারণে সেই যে ভোক্তাদের স্বাদু তালিকা থেকে খসে পড়ল, তার আর আলোতে আসা হলো না। বাঙালির রান্নাঘর থেকে তার নির্বাসন স্থায়ী হয়ে গেল।

এমন বহু ঘটনা, খাদ্যদ্রব্য থেকে বহু বিষয়ে আমাদের দুর্নীতি তথা অনৈতিকতার পরিচিতিপত্র নিয়ে সমাজে সমালোচনার লক্ষ্য হয়ে থেকেছে। তা সত্ত্বেও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি। বিখ্যাত ব্র্যান্ডের গুঁড়া মসলায়ও ভেজাল, ভেজাল এক সর্বগ্রাসী চরিত্র অর্জন করে ফেলেছে। এর অনুপ্রবেশ দেখা গেছে ওষুধেও। বিষাক্ত প্যারাসিটামল সেবন করে কত শিশুর যে প্রাণ গেল, সে মামলার ন্যায্য ফয়সালা এখনো হয়নি।

দুই.

লেখা শুরু করেছিলাম একদা দুর্নীতিহীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে, তা বাংলাদেশ সমাজ-সংস্কৃতির এমনই মহিমা যে সেই ধারায় ভূমিকা হিসেবে প্রসঙ্গান্তরে এক পাতা লেখা হয়ে গেল। তবু শিক্ষাব্যবস্থার পুরনো তৈলচিত্রটার ওপর একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া দরকার এ কারণে যে দুই দফায় পরাধীনতা থেকে মুক্তির পর যথারীতি ঊর্ধ্বমুখ উন্নতির বদলে অধোগতি শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অবিশ্বাস্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা যেমন শিক্ষাক্রমে, তেমনি ভিন্ন পরিসরে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে। শিক্ষাব্যবস্থার চালচিত্রটাই একেবারে বদলে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ইত্যাদি।

0056562017-07-13-KK-AK-39সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সংবাদপত্রের উপসম্পাদকীয় ও টিভি কথকতায় ক্ষোভ ও বেদনা দুই-ই প্রকাশ পেয়েছে শিক্ষকতার মহান আদর্শ কালিমাযুক্ত হওয়ার কারণে। শিক্ষকদের একসময় বলা হতো ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ এবং অনুরূপ বিশেষণে জাতির ভবিষ্যৎ শিশু-কিশোর-তরুণদের তাঁরাই আদর্শ মানুষের প্রতীকে গড়ে তোলেন ইত্যাদি কত কথা। শ্রদ্ধার সেই উচ্চাসন আর নেই।

কল্পকাহিনির মতো সে অবস্থা তৈরি হয়েছিল আদর্শ ধারায় শিক্ষাদানে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে। সমাজ তাতে সমর্থন জুগিয়েছিল। অথচ কী আশ্চর্য বৈপরীত্য, বিনিময়ে তাঁদের অনেকের আর্থিক অসচ্ছলতা বা ক্ষেত্রবিশেষে দারিদ্র্য সমাজে কারো মনে প্রশ্ন জাগায়নি। তাঁদের সেই নীরব অবদান ছিল বিশেষ সামাজিক পরিস্থিতির কারণে। আর অসচ্ছলতা ছিল মূলত স্কুলশিক্ষক পর্যায়ে, যাঁদের হাত দিয়ে প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত মানুষ গড়ার সূচনা।

পেশা হিসেবে সেকালে শিক্ষকতার পেছনে ছিল শিক্ষকদের আদর্শনিষ্ঠা। শিক্ষাকে দেখা হতো সমাজসেবা ব্রত হিসেবে, শিক্ষকের সেখানে সেবাব্রতীর ভূমিকা। তাতে যথেষ্ট অর্থ উপার্জন হোক বা না হোক। এটা তখনকার সামাজিক পরিবেশের দান। তাই সর্বোচ্চ শিক্ষায়তনিক ডিগ্রির (যেমন এমএ) অধিকারী যে ব্যক্তি অনায়াসে অন্যদিকের পেশায় ভালো উপার্জন করতে পারেন, তাঁকেও দেখা গেছে শহরে বা গ্রামে আদর্শের টানে সামান্য বেতনে স্কুল শিক্ষকের কর্মব্রত গ্রহণ করতে।

অনেক উদাহরণ থেকে দু-একটিই উল্লিখিত বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের কথা। আমাদের পাশের গ্রামের একটি স্বনামখ্যাত হাই স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন বিএ, বিএসসি, ছিলেন তিনজন এমএ, এর মধ্যে একজন ডাবল এমএ। ভাবা যায় দূর গ্রামের স্কুলের শিক্ষকদের এমন ডিগ্রির মান? তাঁরা সবাই স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দা। নিছক শিক্ষাদানকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন আদর্শের টানে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গৃহীত প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় এ স্কুলের ফলও ছিল বেশ ভালো।

উল্লেখ্য, মেধাবী ছাত্রদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘কোচিং’ ক্লাসরুমেই দিতেন শিক্ষকরা, বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজিতে; কখনো স্কুল সময় শেষে নেওয়া বাড়তি পিরিয়ডে। তাতে বাণিজ্যের গন্ধ ছিল না। ছিল না শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা। কদাচিত কোনো বিষয়ে দুর্বল দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে আলাদাভাবে শিক্ষা নিতে দেখা গেছে সামান্য অর্থের বিনিময়ে।

শহরের হাই স্কুলেও (উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে) একই ব্যবস্থা। তেমনি শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, যেমন আগে বলা হয়েছে। একমাত্র আরবি ও সংস্কৃত শিক্ষক ছাড়া বাকি সবাই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের। কাজেই শিক্ষাদানের মান ও শিক্ষার্থীর মান নিয়ে এখনকার মতো প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। দুটি উদাহরণই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ধৃত। আর তা দেশবিভাগ পূর্বকালের কথা। বিদেশি শাসনের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থপরতার শিক্ষানীতির মধ্যেও যদি শিক্ষার মান প্রশ্নাতীত হতে পারে তাহলে বিদেশি শাসনমুক্ত স্বদেশে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষানীতি, শিক্ষার মান, সর্বোপরি শিক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ, সমালোচনা ও প্রশ্নের অবকাশ থাকবে কেন?

এতগুলো দশকের সময় পার হয়ে আসার পর শিক্ষায়তনের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে, তা সত্ত্বেও কেন শিক্ষানীতি এবং শিক্ষাদানের মান, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের মান নিয়ে প্রশ্ন? এর অর্থ কি তাহলে শিক্ষাদানে যথেষ্ট যোগ্যতার অভাব, শিক্ষার পাঠ্যক্রম প্রণয়নে অযোগ্যতা, সংক্ষিপ্ত পথে লক্ষ্য অর্জনের ত্রুটি বা ভ্রান্তি? সর্বোপরি শিক্ষার সর্বস্তরে দুর্নীতির অনুপ্রবেশ?

একদা দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার যে প্রবাদপ্রতিম অবস্থার কথা উল্লেখ করে লেখাটা শুরু করেছিলাম, তারই জের টেনে বলতে হয় সে অবস্থা অর্থাৎ শিক্ষার মান ও দুর্নীতিহীন পরিস্থিতি এখন অতীতের বিষয়। স্বাধীন দেশে স্বাধীন শিক্ষা পরিবেশে পূর্বোক্ত ব্যবস্থাকে পিছে ফেলে উচ্চমানে পৌঁছে যাওয়াই তো ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।

কিন্তু হলো বিপরীত। মূলত তা শিক্ষানীতি, শিক্ষার পাঠব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, উচ্চ মেধার প্রশাসনিক অভাব এ দুর্দশার জন্য দায়ী। শিক্ষাবিদদের আলোচনায় সৃজনশীল পাঠ্যক্রমের ত্রুটি যেমন বারবার উল্লিখিত, তেমনি অভিযোগ উঠে আসছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক (উচ্চ মাধ্যমিকসহ) স্তরে শিক্ষাদানের যোগ্যতা ও শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে ওঠার অভাব নিয়ে। পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ ৫ ও সোনালি জিপিএর মান বিচারেও হয়ে উঠেছে খাদভর্তি পিতল।

অথচ জিপিএ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল শেষে দেশজুড়ে অভিনন্দন অনুষ্ঠানের কী সমারোহ! কী তৃপ্তির হাসি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মুখে। হীরার বদলে কাচের সনদ নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবাই খুশি। অথচ এরাই কি না বিশ্ববিদালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে উল্লিখিত শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এ ঘটনা চলছে বেশ কিছুকাল ধরে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না, অভিভাবকদের বিচলিত হতে দেখা যায় না। এমনকি সমাজের উচ্চাসনে বসা শিক্ষাবিদ ও এলিট শিক্ষিত শ্রেণি এ দুরবস্থার অবসান ঘটানোর নীতিগত দায় গ্রহণ করেন না।

তিন.

পরিস্থিতি সম্প্রতি এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে শিক্ষা খাত জাতীয় সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং তা ব্যাপক মাত্রায়। একদিকে ভুলে ভরা পাঠ্য বই, সম্প্রতি তাতে হেফাজতি অনুপ্রবেশ, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, যা দুর্নীতির তুল্য, এমনকি প্রাথমিক স্তরে ও অংশত মাধ্যমিক স্তরে কিছুসংখ্যক শিক্ষকের যোগ্যতার অভাব ইত্যাদি মিলে শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি অনৈতিক করে তুলেছে।

দীর্ঘদিন থেকে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক শিক্ষাবিদ পাঠ্যক্রমে সৃজনশীল পদ্ধতির যথার্থতা নিয়ে, এ পদ্ধতির ত্রুটি নিয়ে। এতে যে শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না এমন অভিযোগও বারবার উঠে এসেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বধির, স্থির। তারা কোনো পরামর্শই গ্রহণ করতে নারাজ। তাই একজন অধ্যাপক এ অবস্থাকে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ শিরোনামে পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছেন।

কোচিং বাণিজ্য নিয়ে, গাইড বই সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনামূলক লেখা দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছাপা হচ্ছে। আহ্বান জানানো হয়েছে কোচিং বাণিজ্য ও শিক্ষায় মুনাফাবাজি বন্ধ করতে। একসময় এ বিষয়ে তীব্র ও লাগাতার প্রতিবাদের মুখে মনে হচ্ছিল কর্তৃপক্ষ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করবে। কিন্তু না, সে গুড়ে বালি। এমনকি একদা নোট বই বাতিলের পর এখন দেদার চলছে গাইড বই বাণিজ্য। আর সৃজনশীল ব্যবস্থার কল্যাণে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ের পুরোটা (টেক্সট) পড়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। জ্ঞান হয়ে যাচ্ছে অতি সীমিত।

চার.

শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন বড়সড় ত্রুটি নির্বিবাদে চলছে, তেমনি সম্প্রতি তাতে যুক্ত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুর্নীতি। যা নিয়ে বছরকয় যাবৎ চলছে তোলপাড়। কে দায়ী, কারা দায়ী তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি। সন্দেহের তীর যেমন ছাপাখানার দিকে, তেমনি সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো শিক্ষকের দিকে। এমনকি বড় মাপের কোচিং সেন্টারগুলোর দিকেও আঙুল উঠছে এবং তা তুলছেন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ কেউ কেউ।

এত আঘাতেও কায়েমি স্বার্থের অচলায়তন টলছে না, ভেঙে পড়া তো দূরের কথা। এর বড় কারণ বাংলাদেশি সমাজে দুর্নীতির শিকড়-বাকড়গুলো বড় শক্ত, এর ভিত্তি বড় মজবুত। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কি দুর্নীতির এতটা বিস্তার সম্ভব? তাও শিক্ষার মতো এমন এক খাতে যা তৈরি করে জাতির ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মেরুদণ্ড, প্রজন্মের পর প্রজন্মে। এখানে দুর্নীতির সংক্রমণ জাতির ভবিষ্যৎ নষ্ট করার অনুকূল। অবস্থা এতটা নাজুক হওয়া সত্ত্বেও প্রতিকারের, প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষা খাতে এ পরিস্থিতি, এর সার্বিক দুর্নীতি ও কোচিং বাণিজ্য এবং ত্রুটিযুক্ত পাঠ্যক্রম নিয়ে সত্যই এক জাতীয় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিচলিত সৎ শিক্ষাবিদরা, সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা। দিনের পর দিন দৈনিকগুলোতে তাঁদের লেখা নিবন্ধে পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ ও করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত এ বিষয়ে তাঁদের লেখার গুটিকয় শিরোনাম অবস্থার গুরুত্ব বোঝার পক্ষে সহায়ক হবে। লক্ষণীয় এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ। শুরু করা যাক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মন্তব্য দিয়ে। এ প্রসঙ্গে শিরোনাম : ‘শিক্ষাকে মুনাফার হাতিয়ার না করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির’। এরপর যথাক্রমে শিক্ষা নৈরাজ্যের নানা দিক নিয়ে শিরোনামগুলো—‘শিক্ষা কি অধিকার না বাণিজ্য’, ‘শিক্ষকের দুর্নীতির’, ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য’, ‘পাঠ্যপুস্তকে ভুল ও অসঙ্গতির পাহাড়’, ‘প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মেধাবিকাশের অন্তরায়’, ‘পাঠ্য বইয়ে ভুল নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক কথা’, ‘ভুলে ভরা সপ্তম শ্রেণির পাঠ্য বই’, ‘শিক্ষায় তুঘলকি উন্নতি’ ইত্যাদি।

আশা করছি, পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগেই কর্তৃপক্ষের বোধোদয় ঘটবে। তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে ও সঠিক ব্যবস্থা প্রচলনে অভিযান শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে শুরু করতে হবে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান। এতে প্রাথমিক গুরুত্বে প্রথম কাজ হবে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা, কঠোর ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা, সৃজনশীল শিক্ষার পরিবর্তে ব্যাপক পাঠের অনুকূল পাঠ্যক্রম চালু ও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষায়তনগুলোর আদর্শভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি, জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য পাঠ্যক্রমে আবশ্যিক হিসেবে অন্তভুক্তি ইত্যাদি। এ পাহাড়প্রমাণ পরিবর্তনের কর্মভার কি বর্তমান কর্তৃপক্ষের পক্ষে বহন সম্ভব হবে?

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

সূত্র: কালের কণ্ঠfavicon59-4

Leave a Reply