কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই

কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই

  • রিয়াজুল হক

সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ২০০ জন সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলো। শিক্ষাগত যোগ্যতায় বলা হয়েছিল— (ক) কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি/চার বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি বা সমমানের ডিগ্রি; (খ) মাধ্যমিক এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোয় ন্যূনতম একটিতে প্রথম বিভাগ/শ্রেণী বা সমমানের গ্রেড পয়েন্ট থাকতে হবে। কোনো পর্যায়েই তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণী/সমমানের গ্রেড পয়েন্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। আবেদনপত্র জমা নেয়ার পর দেখা গেল, দেড় লক্ষাধিক আবেদনপত্র জমা পড়েছে। তারা সবাই বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ করেই আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। অথচ নিয়োগ দেয়া হবে মাত্র ২০০ জনকে। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের অবস্থা। সবাই সার্টিফিকেটধারী বিএ, এমএ পাস। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া কর্মদক্ষতা নেই। এদের পুরোপুরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ছোট এ দেশে আদৌ সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান ধরন অনুযায়ী এ সমস্যা আরো জটিলতর হবে। নিকট ভবিষ্যতে হয়তো দেখা যাবে ১০০ জনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে তিন লক্ষাধিক আবেদনপত্র জমা পড়েছে।

আমাদের জনসংখ্যা আছে কিন্তু জনশক্তির অভাব। বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি অর্থই দেশের অগ্রগতির ধারাকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন করা। একই সঙ্গে বেকারত্বে শক্তির সীমাহীন অপচয় ঘটে। ফলে অমিত এই যুবশক্তিকে উপেক্ষা করে দেশের অর্থনীতি কখনো শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হতে পারে না, হওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের সমস্যার সমাধান। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে। সহজ কথায়, কারিগর তৈরি করতে হবে। অষ্টম শ্রেণী শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের দুটি দিক থাকবে— একদল যাবে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়, অন্য দল কর্মমুখী শিক্ষায়। যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ৩-এর কম পাবে, তারাই পরবর্তী পর্যায়ে কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেবে। বিভিন্ন বিষয়ভেদে এ প্রশিক্ষণের মেয়াদ হবে দুই থেকে পাঁচ বছর। প্রশিক্ষণ শেষে বোর্ড থেকে তাদের সার্টিফিকেট দেয়া হবে। কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন, ফলের চাষ, ড্রয়িং, গ্রাফিকস ডিজাইন, পোলট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, বুটিক শিল্প, কম্পিউটার ট্রেনিং অ্যান্ড সার্ভিসিং, মোবাইল সার্ভিসিং, সেলাই, ইলেকট্রনিক সামগ্রী সার্ভিসিং, সেলুন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, কাঠের কাজ, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, লেদ মেশিন স্থাপন, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, হোটেল-সংক্রান্ত ট্রেনিং, চুলকাটার ট্রেনিং, দর্জি, কলকারখানার কাজ, সেলসম্যানশিপ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হবে। আমরা আলপিন পর্যন্ত তৈরি করতে পারি না, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এটা উন্নয়নে সহায়ক নয়।

একজন শিক্ষার্থী কোন দিকে যাবে—এ সিদ্ধান্ত অষ্টম শ্রেণীর পর হলে সবচেয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। কারণ অষ্টম শ্রেণীর পর জিপিএর ওপর ভিত্তি করে একদল শিক্ষার্থী যাবে কর্মমুখী শিক্ষায় আর অন্য দল যাবে সাধারণ শিক্ষায়।

আমাদের প্রয়োজন দক্ষ কারিগর। সবার নামধারী বিএ, এমএ পাস করার দরকার নেই। কারণ সব সার্টিফিকেটধারীকে চাকরি দেয়ার সুযোগ আমাদের দেশে নেই এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হলে বিদেশেও চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে। আর অধিকাংশ চাকরি উত্পাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচিত নয়। আমাদের প্রয়োজন সবার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। আর সেটা করতে হলে কারিগরি প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। দেশে যারা মোবাইল সার্ভিসিং করে, ৯৯ শতাংশই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। অন্যের কাজ দেখে তারা কাজ করা শুরু করে। অথচ তারা যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতো, তবে দু-একবার নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের ব্যবহূত মোবাইল ফোনগুলো ফেলে না দিয়ে সেগুলো মেরামত করতে পারলে ফলপ্রসূ হতো। আমাদের দেশে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন কৃষক নেই। এখনো তাদের জমিতে বলদের ব্যবহার অপরিহার্য। জমিতে কখন, কতটুকু সার দিতে হবে, সেই জ্ঞান তাদের নেই। যারা চুল কাটে, তাদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারিগরি প্রতিটি কাজেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

খসড়া জাতীয় যুবনীতিতে সুস্পষ্টভাবে দেশের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বলা হয়েছে। ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে। প্রশিক্ষিতদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে নিযুক্ত রেখে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়া হবে। যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোগের প্রতি ব্যাংকিংসহ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সুবিধা প্রদান করতে হবে। কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে যুবকদের সেই দেশের আচার-আচরণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করতে হবে। যুব উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে সব যুব নারী ও পুরুষকে এ ব্যাংকের আওতায় আনা হবে। যুব উদ্যোক্তাদের উত্পাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিপণনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তবে এ যুবকদের সুযোগগুলো দিতে গেলে আগে তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কারিগরি প্রশিক্ষণ।

আমাদের দেশে এসএসসি পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ ডিপ্লোমার দিকে যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী ডিপ্লোমায় পড়বে কিনা, সেই বিবেচনা তাকে করতে হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার পর। আর যারা ডিপ্লোমা পাস করে, তারা নিজেদের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তৈরি করে এবং তাদের পড়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত সীমিত। তাদের দিয়ে তো আর রাজমিস্ত্রির কাজ করানো যাবে না, গাড়ির ড্রাইভিং করানো যাবে না। ডিপ্লোমায় বুটিক শিল্প কিংবা পশুপালনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। হস্তশিল্পের কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। তাই একজন শিক্ষার্থী কোন দিকে যাবে—এ সিদ্ধান্ত অষ্টম শ্রেণীর পর হলে সবচেয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। কারণ অষ্টম শ্রেণীর পর জিপিএর ওপর ভিত্তি করে একদল শিক্ষার্থী যাবে কর্মমুখী শিক্ষায় আর অন্য দল যাবে সাধারণ শিক্ষায়। এরপর সেই সাধারণ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে এসএসসি পাস করার পর একদল ডিপ্লোমায় ভর্তি হবে এবং অন্য দল উচ্চ মাধ্যমিকে। আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি প্রয়োজনীয় কাজের ওপর প্রশিক্ষিত কর্মী।

আমরা এখনো অদক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠিয়ে থাকি। বিদেশে যাওয়ার পর অধিকাংশই নিম্নমানের কাজ করে। এতে পরিশ্রমের পরিমাণ যেমন বেশি, আয়ের পরিমাণও কম। দেশে রেমিট্যান্সও কম আসে। অথচ কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত একজন যদি প্রবাসে গিয়ে কাজ করত, তবে ভালো মানের কাজ করতে পারত। একই সঙ্গে আয়ও বেশি হতো। অদক্ষ কোনো ব্যক্তির প্রবাসে যাওয়ার দরকার নেই। কারিগরি প্রশিক্ষণ নেয়ার পর বিদেশে যেতে হবে। এজন্য কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। বিদেশে যে বিষয়ের ওপর দক্ষ কর্মী চাওয়া হয়, আমাদের তা থাকে না। অথচ আমরা যদি সঠিকভাবে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারতাম, তবে বেকারত্বের হারও কমে যেত। রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পেত। কারিগরি শিক্ষায় জোর দেয়ার কারণে বাংলাদেশের চেয়ে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপির হার অনেক বেশি। ১৯৭০ সালে এ দেশগুলোর জিডিপির হার ছিল আমাদের প্রায় কাছাকাছি। উন্নত বিশ্বে কারিগরি ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কর্ম খালি আছে, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের মাধ্যমে আমাদের বেকারত্বের হার প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা অদক্ষ জনসংখ্যা রফতানি না করে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি করব। এতে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত কর্মীরা দেশের উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও নিজেদের নিয়োজিত করতে পারবে। উত্পাদন খাতে আমদানি হ্রাস পেলে দেশের মুদ্রা বাইরে যাবে না। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে দেশ রেহাই পাবে। আর মজবুত অর্থনীতির জন্য নিজেদের কাজ নিজেদেরকেই করতে হয়।

লেখক: উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

সূত্র: বণিক বার্তাfavicon59-4

Leave a Reply