জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আক্ষেপ ও আহ্বান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আক্ষেপ ও আহ্বান

  • ফারজানা বাশার

আক্ষেপ দিয়েই শুরু করি। প্রথম আক্ষেপ হচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুণগত ও আচরণগত পার্থক্য রয়েছে প্রায় আলোক বর্ষ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনার পরিসর যেখানে পুরো পৃথিবী সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর আশপাশের জায়গাটুকুও নয়। পাবলিকের শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতির প্রায় সকল শাখায় দক্ষতা রাখে। পাঠে গবেষণাধর্মী মনোভাব। আচরণে উচ্চ মূল্যবোধের লক্ষণ।

এখন কথা হলো,কেন এ পার্থক্য পরিলক্ষিত?
উত্তর কি এমন আসতে পারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গ্রাম বা মফস্বল শহর থেকে আগত বলে? তাহলে বলবো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০% এর বেশি শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে আগত। তবে তারা কিছুদিনের মধ্যে বদলায় কি করে? আমাদের কেন পরিবর্তন নেই?
তিনটি কারন হতে পারে:
১.অব্যবস্থাপনা
২.শিক্ষকের মনোযোগের অভাব
৩.শিক্ষার্থীর মনোযোগের অভাব

একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
১.অব্যবস্থাপনা : ক.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিক পরীক্ষাগুলোর সময়সূচী নির্ধারণ করেছে দুপুরের পর। কেননা, বছরজুড়েই বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলায় সকালে যেন ক্লাশরুমগুলো বুকড না থাকে, যেন ক্লাশ নিয়মিত হয়। কিন্তু হতাশাজনকভাবে আমরা পূর্বের ন্যায়ই বঞ্চিত হই! পূর্বের চিত্রই দেখতে হয়। এবিষয়ে ডিপার্টমেন্টের প্রধানের সাথে কথা বললাম, ক্লাশ চাইলাম। তিনি বললেম, ‘ক্লাশ নেয়া সম্ভব না। ছেলেপিলে সিট প্ল্যান ছিড়ে ফেলে।’

ক্লাশ না হওয়ার জন্য এ অজুহাত কি যথেষ্ট? আমি বলছি, যদি ছিড়ে ফেলেই তবে আপনাদের হাতে হাজিরা শীট রয়েছেই সিরিয়াল মেনটেইন করতে! আর ক্লাশ না হওয়াটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক।
এসব বলে কোনো লাভ হয়না। তাদের শেষ কথা, ক্লাশ হবেনা।

খ.
কলেজ ফ্যাসিলিটির অভাব। যেমন: ছেলেদের একটি ইনডোর গেমের ব্যবস্থা থাকলেও তাতে পর্যাপ্ত ইন্সট্রুমেন্ট নেই। মেয়েদের জন্য তো থাকেই না। বিষয়টি নিয়ে আবার ডিপার্টমেন্টের প্রধানের স্মরণাপন্ন হলাম। তিনি বললেন ‘এটা ইনটিগ্রেটেড কলেজ। বিভেদ কেন? একই ইনডোরে খেলবে সবাই।’ খুশি হলাম তার বক্তব্যে। এরপর খেলার জন্য ঢুকতে গেলাম ইনডোরে। পিয়ন আটকালো, ‘মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ।’ বললাম, ‘আজ থেকে ছেলে মেয়ে সকলে এখানেই খেলবে। পারমিশান আছে। জেনে নেবেন।’ কিন্তু তা আড়চোখে দেখা হলো। মেয়েরা অনভ্যস্ততাবসত যেতে রাজি হলো না। আরেক সংকট। শেষে মেয়েদের কমনরুমে কিছু ইস্ট্রুমেন্টের ব্যবস্থা করা হলো যা কোনদিন ডিসপ্লেইড হয়নি।

গ.
চলচিত্র উৎসব, নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন,ক্রীড়া(বার্ষিক ছাড়া), জীমনেশিয়ান ও অন্যান্য সুযোগ নেই। তাই কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোন আকর্ষণ নেই।

২. শিক্ষকের মনোযোগের অভাব:
প্রথম কথা হলো অনিয়মিত ক্লাশ এবং তা হতাশাজনকভাবে অনিয়মিত! এর দায় কার? শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষের। ডিপার্টমেন্টে প্রায় ৩৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ২৫০ থেকে ৩০০। অথচ ক্লাশে গেলে পাঁচজনও খুঁজে পাওয়া যায় না! কেউ বলবে, ওরা উপার্জনের পথে ছুটে সময় পায় না। আমি বলব, ওই ৩০০ জন সকলেই কি তাই করে? ধরলাম ১৫০ জন করে। তবু অবশিষ্ট থাকে ১৫০। তাহলে কেন পাঁচজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না? কারণ, ক্লাশে শিক্ষার্থীদের কোন আকর্ষন নেই! কেননা:
ক.
একদিন ক্লাশ হলে বিভিন্ন কারণে ও অকারণে একমাসের মধ্যেও ফের ক্লাশের খোঁজ থাকেনা। এতে মাসখানেক পরে গিয়ে শিক্ষক অসমাপ্ত অধ্যায় ভুলে যান। এতে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
খ.
পড়ানোর ভঙ্গিতে বিনোদনের বড়ই অভাব। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ‘পড়াটা এনজয় করে পড়তে হয়।’ এখানে পড়ায় কোনই এনজয়মেন্ট নেই। কেননা শিক্ষকের লেকচার খুবই এলোমেলো আর আনপ্ল্যানেড থাকে। একটি ভালো লেকচারের জন্য নিশ্চয়ই পূর্ব প্রস্তুতির দরকার। পরিকপ্লনামাফিক পূর্বেই লেকচার তৈরি ও ক্লাশে তা গোছানো উপস্থাপন হবে মজা নিয়ে ও মজা দিয়ে। কিন্তু শিক্ষকরা সেটা করেন না। তাঁরা দায়সারা গোছের ক্লাশ নেন।
গ.
পড়ানোতে তথ্যের শূন্যতা ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের উদাহরণ টানার অভাব। পড়াশোনার প্রায়োগিক ক্ষেত্র সম্পর্কে শিক্ষকরা কোনো ধারনা দেন না। অর্থাৎ শিক্ষক শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেন আর তাও পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়ার মতো কোন লেকচার নয়। তখন আমরা ভাবি, এ পড়া নিজেরাই পড়ে নিবো। দেখা দেয় ক্লাশে শূন্যতা!
ঘ.
চার পাঁচজন ক্লাশে উপস্তিত থাকলে ক্লাশ পাবার প্রত্যাশা অন্যায়? একজনও উপস্থিত হলেও ক্লাশ নেয়াটা শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমার ধারনা। যাহোক, পাঁচ সাত জন অপেক্ষা করি, শিক্ষক আসেন না, অথচ রুটিন বলে তাঁর আসার কথা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যাই ডেকে নিয়ে আসতে। বলেন,‘ক’জন তোমরা?’ ‘পাঁচ সাত জন, স্যার।’ রক্তচক্ষু দেখিয়ে, ‘পাঁচ সাত জন নিয়ে ক্লাশ হয়? যাও, কমপক্ষে দশজন হলে ডাকতে আসবে!’ ততক্ষণে ক্লাশ পিরিয়ড শেষ!
উল্লেখ্য, শিক্ষককে ডাকতে যাওয়ার মতো দুঃসাহস কোনো শিক্ষার্থী দেখাতে চান না আমার মতো এ্যারোগ্যন্ট ছাড়া! তার মানে তাঁদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা আজরাইল ও বান্দা ধরনের।
ঙ.
শিক্ষকগণ মনে করেন, তাঁরা একবার বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তো সকল দায়িত্ব শেষ! অথচ নিয়োগের পর শপথ তাঁদেরকে গ্রহণ করতে হয় দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে।

৩. শিক্ষার্থীদের মনোযোগের অভাব:
দূরদর্শী না হওয়ায় অনেকেরই ক্লাশে অনিহা রয়েছে তবে মূলত দায় বর্তায় উপরোক্ত সমস্যাগুলোর উপর।

সবশেষে একটি আহব্বান জানাই। প্রিয় শিক্ষক, প্রয়োজনীয় স্টাডি করে কনফিডেন্স নিয়ে নিয়মিত ক্লাশে আসুন। তথ্য দিন। পাঠে বিনোদনের সন্ধান দিন। অব্যবস্থাপনার সংস্কার করুন। শৃংখলা আনয়ন করুন। সুস্থ্য পড়াশোনার পরিবেশ দিন। কথা দিচ্ছি, আমরা মনোযোগী ও নিয়মিত হবো।

ফারজানা বাশার: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী

Leave a Reply