হতে চাইলে কাঁকড়া চাষী

হতে চাইলে কাঁকড়া চাষী

মারুফ ইসলাম : যাঁরা মনে করেন কাঁকড়া চাষ একটি নতুন পেশা তাঁদেরকে সবিনয়ে জানাই, প্রায় বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ কাঁকড়া রপ্তানিকারক সমিতি সূত্র জানাচ্ছে, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার টাকা মূল্যের কাঁকড়া প্রথম বিদেশে রপ্তানি করা হয়। অপরদিকে মৎস অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট জানাচ্ছে, গত তিন বছরে কাঁকড়া রপ্তানি করে আয় হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু গত বছরেরই আয় হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে কাঁকড়া রপ্তানি করে প্রতিবছর গড়ে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

কাঁকড়া। অবহেলিত এক জলজ প্রাণী। কিন্তু অবহেলিত এই কাঁকড়াই খুলে দিতে পারে আপনার ভাগ্যের দুয়ার। অতএব চলুন, জেনে নেওয়া যাক কাঁকড়া চাষের আদ্যপান্ত।


পুকুর নির্বাচন

  • কাঁকড়ার জন্যে দো-আঁশ বা পলি দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। পুকুরের আয়তন এক হেক্টরের মধ্যে হলে ভালো হয়। পুকুরের আয়তন ছোট হলে কাঁকড়া মজুদ করতে সুবিধা হয়। তা ছাড়া ব্যবস্থাপনার দিক দিয়েও সুবিধা। নোনা পানির উৎসস্থল যেমন_নদী বা সমুদ্রের কাছে হলে খুবই ভালো হয়। এতে জোয়ার-ভাটার সঙ্গে পানি ওঠানো-নামানো যায়। পুকুরের পানি উত্তোলনের জন্য গেট থাকা ভালো। কাঁকড়ার পলায়নপর স্বভাবের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৫ মিটার উচ্চতার বাঁশের বানা (পাটা) দিয়ে পুকুরের চারপাশ ঘিরে ফেলা দরকার। বানা প্রায় আধা মিটার মাটির নিচে পুঁতে দিতে হয়, যাতে কাঁকড়া পুকুরের পাড় গর্ত করে পালিয়ে যেতে না পারে। মাটির পিএইচের ওপর ভিত্তি করে পাথুরে চুন (CaCO3) গুঁড়া করে সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হয়। মাটির পিএইচ ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫-এর মধ্যে থাকলে হেক্টরপ্রতি ১২৫ কেজি পাথুরে চুন দিতে হবে। চুন ছিটানোর পর পুকুরে জোয়ারের পানি তুলতে হবে এবং সাত দিন পর হেক্টরপ্রতি ৭৫০ কেজি জৈবসার (গোবর) প্রয়োগ করতে হবে। জৈবসার প্রয়োগের তিন দিন পর হেক্টরপ্রতি ২৫ কেজি ইউরিয়া এবং ১৫ কেজি টিএসপি সার প্রয়োগ করা হয়। অজৈব সার প্রয়োগের তিন থেকে চার দিন পর পুকুরে কাঁকড়া মজুদ করা হয়।

kakra_3434-300x227মজুদ খাদ্য

  • ফ্যাটেনিংয়ের জন্য প্রতি হেক্টর ঘেরে ১০ হাজারটি অপরিপক্ব স্ত্রী কাঁকড়া মজুদ করা যায়। কাঁকড়ার ওজন ১৮০ গ্রাম বা তার বেশি হলে ভালো হয়। কারণ এ ওজনের কাঁকড়ার দাম সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। মজুদের পর কাঁকড়ার জন্য নিয়মিত খাবার দিতে হবে। কাঁকড়ার খাবার হিসেবে শতকরা ২৫ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৭৫ ভাগ গরু-ছাগলের ভুঁড়ি অথবা শতকরা ৫০ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৫০ ভাগ বাগদা চিংড়ির মাথা (মাংসল অংশ) প্রতিদিন পুকুরে সরবরাহ করতে হবে। কাঁকড়ার দেহের ওজনের আট ভাগ হারে প্রথম সাত দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে পাঁচ ভাগ হারে খাবার সরবরাহ করলেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়।

পানি

  • পুকুরে কাঁকড়ার খাবার হিসেবে প্রচুর পরিমাণে প্রাণিজ মাংসল খাদ্য সরবরাহ করতে হয়, যা দ্রুত পচনশীল। তাই কাঁকড়ার পুকুরের পানির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার সরবরাহ করলেও পানি নষ্ট হতে পারে। পানির গুণাগুণ যাতে নষ্ট না হয় সে কারণে এবং প্রয়োজনবোধে অমাবশ্যা বা পূর্ণিমার ভরা জোয়ারের সময় চার থেকে সাত দিন পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হবে।

স্ত্রী কাঁকড়ার গোনাড পরীক্ষা আহরণ

  • কাঁকড়া মজুদের ১০ দিন পর থেকে দুই-তিন দিন পর পর কাঁকড়ার গোনাড পরিপুষ্ট হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করতে হয়। কাঁকড়াকে আলোর বিপরীতে ধরে দেখতে হবে যে, কাঁকড়ার ভেতর দিয়ে আলো অতিক্রম করে কিনা। যদি কাঁকড়ার ভেতর দিয়ে আলো অতিক্রম করতে না পারে তাহলে বুঝতে হবে গোনাড পরিপুষ্ট হয়েছে। বিপরীতে গোনাড পরিপুষ্ট না হলে কাঁকড়ার দুই পাশের পায়ের গোড়ার দিক দিয়ে আলো অতিক্রম করবে। সাধারণত গোনাড পরিপুষ্ট হলে পুকুরে পানি ওঠানোর সময় কাঁকড়া গেটের কাছে চলে আসে। পুষ্ট কাঁকড়া স্কুপনেট বা টোপ দিয়ে প্রলুব্ধ করে ধরতে হবে। কাঁকড়া সম্পূর্ণভাবে আহরণের জন্য পুকুরের পানি নিষ্কাশন করতে হবে। ধরার সঙ্গে সঙ্গে কাঁকড়াকে বিশেষ নিয়মে বেঁধে ফেলতে হবে। অন্যথায় কাঁকড়ার চিমটা পা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। খুলনার পাইকগাছা ও সাতক্ষীরার দেবহাটায় কাঁকড়া চাষ বা ফ্যাটেনিং বহুল প্রচলিত।

কিছু সতর্কতা

  • (১) কাঁকড়া চাষের পুকুরের তলায় জমে থাকা বিষাক্ত ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নেওয়ার জন্য উপযক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে হবে৷ জিওলাইট প্লাস দিতে হবে প্রতিটি ফ্যাটিনিং চাষের পর৷ এরা যেহেকু জীবিত খাবার এবং প্রোটিনযুক্ত খাবার খায়, তাই খামারের তলায় অভুক্ত খাবার থেকে গ্যাস তৈরী হতে পারে৷ উপযুক্ত রাসায়নিক দিয়ে সেই অবাঞ্ছিত গ্যাসকে শোষণকরা সম্ভব হবে৷ প্রতি দু’বার ফসল তোলার পর পুকুরের তলায় জমে থাকা পলি তুলে ফেলে CaO বা পাথুরে চুন দিয়ে সাতদিন পুকুর ফেলে রাখার পর আবার জল প্রবেশ করাতে হবে৷
  • (২) কাঁকড়া গর্ত কেটে একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে৷ এই স্থানান্থর এড়াতে স্লুইশ গেটসহ খামারের চারদিকে বাঁশের পাটা ও নাইলন জালের বেড়া দিতে হবে, যা মাটির নিচে অন্ততঃ ২ফুট এবং মাটির উপরে অন্ততঃ ৩ফুট থাকবে৷ প্লাস্টিক সীট পাড়ের ওপর দিয়ে তার ওপর মাটি দিয়ে পাড় তৈরি করলেও কাঁকড়া পাড় ফুটো করে চলে যেতে পারবে না ৷
  • (৩)যেহেতু কাঁকড়া একে অপরকে খেয়ে ফেলতে পারে এই প্রবণতা এড়ানোর স্বর্থে নিয়মিত অতিরিক্ত খাদ্যের যোগান রাখা জরুরী৷ খোলক যত তাড়াতাড়ি শক্ত হবে ততই বিক্রয় উপযোগী হবে, সেই কারণে জলের গুণাগুণ উপযুক্ত মাত্রায় রাখা জরুরী৷
  • (৪) খামারে নরম কাঁকড়াগুলির প্রয়োজনীয় লুকানোর জায়গা রাখতে হবে৷ ভাঙ্গা পাইপ, অব্যবহৃত টায়ার ইত্যাদি ব্যবহৃত হতে পারে লুকানোর আস্তানা হিসাবে, ১৫ সেমি. ব্যাসার্ধের লম্বা পাইপের টুকরাগুলি খামারের তলদেশে ছড়িয়ে রাখতে হবে৷
  • (৫) খামারের মাঝখানে উঁচু মাটির ঢিবি বানিয়ে তাতে লবণাম্বু উদ্ভিদের কিছু চারা যেমন বাণী, হেঁতাল, গেঁওয়া লাগালে কাঁকড়া যেমন স্বচ্ছন্দ বোধ করে তেমনি জলের অতিরিক্ত খাদ্য শোষণ করে নিয়ে জলকে দূষণমুক্ত রাখে৷

পরিবহন ব্যবস্থা 

  • আহরিত কাঁকড়া বাজারে নিয়ে যাবার আগে প্রতিটিকে বাঁধা হয় সরু নাইলন বা প্লাস্টিকের দড়ি অথবা ভিজে খড় দিয়ে, তার পরে ঝুড়িতে রাখা হয়৷ ঝুড়িগুলি ভিজে চটে বস্তা চাপা দেওয়া থাকে৷ যাতে জলীয়ভাব বজায় থাকে৷ এই ধরণের ঝুড়িতে যত বেশি বাতাস চলাচল করবে, তত বেঁচে থাকার হারও বাড়বে৷ পরিবহনের সময় জলীয়ভাব ঠিক রাখতে পারলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত কাঁকড়াগুলি বেঁচে থাকে সর্বোপরি পরিবহনের সময় কখনই সরাসরি সূর্য়ের আলো না পড়াই ভালো। ৫০ সেমি. ব্যাসার্দ্ধের একটি ঝুড়িতে প্রায় ৩০০-৫০০ গ্রাম কাঁকড়া (যার ক্যারাপেস ২.৫ সেমি. চওড়া) পরিবহন সম্ভব৷যেহেতু শ্যাওলা/ ঝাঁঝি পচনশীল তাই অনেকসময় দূরবর্তী স্থানে শতভাগ জীবিত পরিবহনের স্বার্থে মোহনার জলে তুলা ভিজিয়ে কাঁকড়া পরিবহনের ঝুড়িতে দিলে কাঁকড়ার নড়াচড়াও বন্ধ হবে। ভিজে কাঠের ভূষি প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যায় কাঁকড়া রপ্তানীর ক্ষেত্রে।

তথ্যঋণ : জাতীয় ই-তথ্যকোষ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ‘তথ্যআপা ’, প্রথম আলো, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলানিউজ।favicon594

Leave a Reply