হার না মানা টেরি ফক্স

হার না মানা টেরি ফক্স

  • লিডারশিপ ডেস্ক

১৯৭৭ সাল, টেরি ফক্স তখন সিমন ফ্রাসের ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ১৮ বছর বয়সী এই যুবক হঠাৎ করেই জানতে পারেন, তার ডান পায়ের হাড় ক্যান্সারে আক্রান্ত। সে ক্যান্সার যেন শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য তত্ক্ষণাৎ হাঁটুর কয়েক ইঞ্চি উপর থেকে পাটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো। ১৮ বছর বয়সী একজন ছেলের জন্য, এই অবস্থাটি কতটা মর্মস্পর্শী হতে পারে ভাবা যায়?


হাসপাতালের বেডে শুয়ে ভাবনার বেড়াজালে প্রায়ই প্যাঁচ লাগছে। কখনো চোখ বন্ধ করে, আবার কখনো খুলে ভাবতে থাকেন। পর্যবেক্ষণ করেছেন তার মতো আরও অসংখ্য মানুষের জীবন-যন্ত্রণাবোধ। খুব কাছ থেকেই দেখেছেন সর্বনাশা ক্যান্সার কীভাবে টগবগে তারুণ্যকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এক সময় সিদ্ধান্তটা নিয়েই নেন। বেঁচে থাকলে ক্যান্সার আক্রান্ত এবং ক্যান্সার গবেষণার জন্য কাজ করবেন তিনি। সেই ইচ্ছা পূরণ করতে মৃত্যুর আগে একপায়ে একটানা দৌড়েছিলেন ১৪২ দিন। পাড়ি দিয়েছিলেন দীর্ঘ ৫ হাজার ৩৭৩ কিলোমিটার, ইতিহাসের পাতায় যা আজ ‘ম্যারাথন অব হোপ’ নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা।

টেরি ফক্স ১৯৫৮ সালের ২৮ জুলাই কানাডার মানিটোবায় রোলি ফক্স এবং বেটি ফক্স দম্পতির ঘরে জন্ম নেন। টেরির জন্মের কয়েক বছর পরই তার পরিবার পাড়ি জমায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাংকুভারের কাছে পোর্ট ককুইটলামে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি অদম্য আগ্রহ টেরির। যদিও গ্রেড এইটের বাস্কেটবল টিমের সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড় ছিল সে। পোর্ট ককুইটলাম সেকেন্ডারি স্কুলের শেষ বর্ষে টেরি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাগ অ্যালওয়ার্ডের সঙ্গে যৌথভাবে বর্ষসেরা অ্যাথলেটের সম্মান অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি ভালোবাসতেন সসার, রাগবি, বেসবল এবং বাস্কেটবল। পরবর্তীতে টেরি সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন।

bd-pratidin-s-02a১৯৭৬ সালের ১২ নভেম্বর। টেরি গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। তিনি তাতে আহত হন। ডান পায়ের হাঁটুতে বেশ জখম হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে ফিরে আসেন। কিন্তু টেরি বা চিকিৎসক কেউই ভাবতে পারেননি এ জখমই তাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত করবে।

হার মানেননি টেরি ফক্স। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য টাকা সংগ্রহ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে। আর এর জন্য সে দৌড়াবে। সুবিশাল ক্যানাডার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। টেরির ধারণা ছিল যদি সারা দেশের লোক মাত্র এক ডলার করেও দেয় তাহলেও ক্যান্সার গবেষণার জন্য সংগৃহীত হবে দুই কোটি চল্লিশ লাখ ডলার। সেজন্য ১৪ মাস অনুশীলন প্রাপ্ত হওয়ার পর, ১৯৮০ সালের ১২ই এপ্রিল, টেরি কৃত্রিম পা নিয়ে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর থেকে তার ম্যারাথন শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন গড়ে ২৬ মাইল দৌড়ান। ১৪৩ দিন পর্যন্ত তার দৌড় অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন।

বরফশীতল বৃষ্টি, প্রচণ্ড বাতাস এমনকি তুষারপাতকে অগ্রাহ্য করে টেরি প্রতিদিন প্রায় বিয়াল্লিশ কিলোমিটার দৌড়াতেন। সন্দেহবাদীদের ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে দিনের পর দিন দৌড়ে টেরি অতিক্রম করে যান ডার্টমাউথ, শার্লট টাউন, মন্ট্রিয়ল, টরেন্টো। এরই মাঝে চলতে থাকে বিভিন্ন স্থানে আবেগপ্রবণ বক্তব্য দান। টেরির সেই সব বক্তব্য স্পর্শ করে যায় অসংখ্য জনগণের হৃদয় এবং মনকে। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হতে থাকে এই দুঃসাহসী তরুণ। ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর, টেরি যখন থাণ্ডার বে পার হয়েছেন আচমকা তিনি তার বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। তার ক্যান্সার তখন ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। তখনই তাকে আবার চিকিৎসার জন্য ফিরে আসতে হয়। কিন্তু দুঃখের ঘটনাটি ঘটে তখনই। ১৯৮১ সালের ২৮ জুন ক্যান্সারের কাছে হার মেনে টেরিকে ছেড়ে যেতে হয় এই পৃথিবী। তখন টেরির বয়স মাত্র ২২ বছর।

টেরির এই ম্যারাথন দৌড়ের উদ্দেশ্য ছিল, ‘ক্যানাডিয়ান ক্যান্সার সোসাইটির’-কে সাহায্য করা ও ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। যদিও, টেরি ম্যারাথনে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সমর্থ হননি, তবুও তার এই দৌড় ২৪.২ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পেরেছিল। টেরির এই ম্যারাথন দৌড় লাখো মানুষকে ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে। কোটি কোটি মানুষ এখনো তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তাকে স্মরণ করে রাখার উদ্দেশ্যে, তার নামে নির্মিত হয়েছে স্কুল, স্ট্যাম্পসহ এইচবিও মুভি। কিন্তু সবকিছুর মাঝে সবচেয়ে বড় হলো, ‘বার্ষিক টেরি ফক্স দৌড়’, যা কানাডা শহরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৪ সালে কানাডিয়ানরা টেরি ফক্সকে ‘সেকেন্ড গ্রেটেস্ট কানাডিয়ান অব অল টাইম’ হিসেবে নির্বাচিত করে। বিশ শতকে কানাডার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার স্মরণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে টেরি ফক্স রান। চলে ক্যান্সার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ। টেরি ফক্স আমাদের সবার জন্য এক জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রবল ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক অক্ষমতা কোনো কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এর জন্য থাকা চাই অদম্য মনোবল।

কানাডার বহু স্কুল, ভবন, রাস্তা এবং পার্কের নামকরণ করা হয়েছে টেরি ফক্সের নামানুসারে। এ ছাড়া প্রাদেশিক পার্ক এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপত্যকার নামও করা হয়। ২০০৪ সালে সিবিসি টেলিভিশন প্রোগ্রামে টমি ডগলাসের পর ফক্স দ্য গ্রেটেস্ট কানাডিয়ান হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ফক্সেস স্টোরি নামের বইটি ১৯৮৩ সালে পুরস্কারপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়াও তাকে নিয়ে সিনেমা ও ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিনfavicon59-4

Leave a Reply