নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে : নেলসন ম্যান্ডেলা

নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে : নেলসন ম্যান্ডেলা

বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কথা উঠলে যাঁর নাম সমগ্র পৃথিবী একবাক্যে স্মরণ করে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার মভেজো গ্রামে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই এই বিশ্বনেতার জন্ম। বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি তিনি। আফ্রিকানরা তাঁকে ডাকে ‘মাদিবা’ বলে। জীবনের ২৭ বছর কেটেছে কারাগারে কারাগারে। গত ৫ ডিসেম্বর ছিল এই মহান নেতার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষীকি। ২০১৩ সালের এই দিনে ৯৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন এই মহানায়ক। মৃত্যুবার্ষীকিতে তাঁকে স্মরণ করে তাঁর দেওয়া একটি বক্তৃতা প্রমিনেন্টের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করেছেন মারুফ ইসলাম


দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮, মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।
দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮, মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।

নেলসন ম্যান্ডেলা : স্মৃতিগুলো আজও অমলিন। চোখ বুজলে ঠিক ঠিক দেখতে পাই। অল্পবয়সী তরুণদের নীরব-নিথর দেহ পড়ে আছে পথে পথে। পুলিশের ছোঁড়া বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে এসব তরুণের তরতাজা প্রাণ। সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিন চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিল। এই স্মৃতিগুলো বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কী বিভীষিকাময় আর ভয়ংকর এক অতীতকে আমরা জয় করে এসেছি। এই স্মৃতিগুলো বারবার করে বলে তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। কারণ তরুণদের আত্মত্যাগেই আমরা পেয়েছি মুক্তি, আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা – ভাবতেই একটা আনন্দের সুবাতাস বয়ে যায় আমাদের মনে। আমরা আনন্দিত এ জন্য যে, আর কোনো বুলেট কোনো তরুণের গায়ে বিদ্ধ হবে না। আমাদের তরুণেরা এখন শিক্ষার পরিবেশ চায়। তারা চায় জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে।

আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি শুধু তরুণদের প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা জানাতে। কেননা বর্ণবৈষম্যের অচলায়তন ভেঙে এই তরুণেরাই আমাদের মুক্তি এনে দিয়েছে। বর্ণবাদ-বিরোধী বিপ্লবের অগ্রভাগে থেকে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তি বা স্বাধীনতা যখনই ইশারায় ডেকেছে, তখনই এই তরুণেরা, মানে তোমরা সাড়া দিয়েছ। এই তোমরা মৃত্যুকে বলেছে, কুছ পরোয়া নেহি! মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বুলেটের আঘাতকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছ তোমরা। বিপ্লবের ময়দান থেকে তোমরা কখনোই পিছু হটনি। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন জাতি গঠনের আহ্বানে তোমরা সাড়া দিয়েছ দ্বিধাহীনভাবে।

তোমরা এসব করেছ নিজেদের জন্য, জাতির জন্য। অথচ বিনিময়ে তোমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাওনি। এমনকি আজও চাইছ না। তাই আজ আমি কৃতজ্ঞচিত্তে বলতে চাই, দক্ষিণ অফ্রিকা তরুণদের কাছে ঋণী। তাই দক্ষিণ আফ্রিকা তোমাদের গণতন্ত্রের সব ধরনের সুবিধা দিতে নতুন করে একটি জাতীয় যুব কমিশন গঠন করছে। এই কমিশন শুধু তরুণদের জন্য কাজ করবে। তরুণদের চাহিদার জোগান আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এ কমিশনের কাজ। আশা করি, এই কমিশন সব বাধা অতিক্রম করে সফলভাবেই কাজ করতে পারবে। তবে কমিশনের সফলতা নির্ভর করবে তরুণদের ওপরই। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া এই কমিশনের পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া এ জাতিও সফল হতে পারবে না। কারণ, তোমরা তরুণেরাই জাতির কর্ণধার।

আমি আবারও বলি, আমরা ঋণী তরুণদের কাছে, যারা জাতির জন্য অকাতরে নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছে। তারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের জন্য, যেন সবাই উন্নত ও সুখী জীবনযাপন করতে পারে। ২০ বছর আগের সেই দিন, ১৬ জুন ১৯৭৬, নিদ্রামগ্ন জাতিকে তোমরা তরুণেরা সেদিন জাগিয়ে তুলেছিলে। তখন বর্ণবৈষম্যের শাসনব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল ক্রীতদাস। তোমরা সেই তরুণ, যারা সেদিন নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে জাতিকে এনে দিয়েছিলে মুক্তি। বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে তোমরা পাল্টে দিয়েছ ইতিহাসের গতিপথ।

তোমরা হতাশ হইয়ো না। সুযোগকে কাজে লাগাতে শেখো। বড় হোক ছোট হোক, কাজে যোগ দাও। শুধু শুধু অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না। নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। নিজের জন্য নিজেই সুযোগ তৈরি করো। সরকারের দেওয়া ছোট কোনো কাজ, হতে পারে সেটা কৃষিকাজ, তুমিও যোগ দাও।

আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্যকে জয় করা। ঘরহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন অশিক্ষা আর অজ্ঞানতাকে জয় করা। পৃথিবীটা দিনকে দিন ছোট হয়ে আসছে। আমাদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। উদ্ভাবনের দিকে আমাদের উন্নতি করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন করতে হবে এবং এসব চ্যালেঞ্জ আসলে তরুণদেরই মোকাবিলা করতে হবে। যখন শহর আর গ্রাম থেকে তোমরা প্রকৌশলী, পদার্থবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য বিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এই সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়বে, তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা উন্নতি করছি। এ জন্য যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা তোমরা পাবে, তা ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাবে।

জাতির জন্য চাই কর্মঠ ও পরিশ্রমী তরুণ। দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে তরুণদের ওপর, তোমাদের ওপর। তোমরাই পারো, তোমাদের নিরলস পরিশ্রম আর প্রচেষ্টায় নিজ জাতিকে সবচেয়ে সফল, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে। জাতি গঠনের এ লক্ষ্যটা পূরণ করতে তোমাদের কাজ করতে হবে পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে।

যেসব তরুণ এখনো বেকার রয়েছ, তাদের বলি, তোমরা হতাশ হইয়ো না। সুযোগকে কাজে লাগাতে শেখো। বড় হোক ছোট হোক, কাজে যোগ দাও। শুধু শুধু অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না। নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। নিজের জন্য নিজেই সুযোগ তৈরি করো। সরকারের দেওয়া ছোট কোনো কাজ, হতে পারে সেটা কৃষিকাজ, তুমিও যোগ দাও।

হাস্যজ্জল ম্যান্ডেলা। জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮, মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।
হাস্যজ্জল ম্যান্ডেলা। জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮, মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩।

আমার বিশ্বাস, দেশের সব মানুষই বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্যহীন জাতি গঠনে একযোগে কাজ করবে। আমি সবসময় প্রত্যাশা করি তরুণদের কাছ থেকে। বৈষম্যহীন জাতি গঠনের স্বপ্নটাকে সত্যি করতে তোমরা প্রাণ উজাড় করে কাজ করবে। সব তরুণ-তরুণী যদি এক হয়, সব মানুষ যদি এক হয়, তবে দেশে এমন একটা পরিবেশ গড়ে উঠবে, যেখানে সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে বাস করা যায়।

তোমরা আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। তোমরা দক্ষিণ অফ্রিকার অলংকার। তোমরা দুঃসাহসের প্রতীক। তোমাদের ত্যাগ ও বীরত্ব কখনো ভোলার নয়। তোমাদের মতো সংগ্রামী তরুণদের জন্য আমাদের বুক স্ফীত হয়ে ওঠে। আজকের দিনে প্রতিটি জাতির জন্য এমন দুঃসাহসিক তরুণ-যুবাদের আরও বেশি প্রয়োজন। তোমরা সাহসী হও। শেখায় মনোযোগ ঢেলে দাও। নিজেদের দক্ষতা বাড়াও। মতৈক্য গড়ে তোলো। জাতির ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতেই। নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমরা এই জাতির ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করো, আলোকিত করো। তোমাদের জন্য শুভ কামনা।

১৯৯৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার যুব দিবসে তরুণদের উদ্দেশে এই অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য দেন ম্যান্ডেলা।  favicon5

Leave a Reply