জেফ বেজসের আমাজন সাম্রাজ্য

জেফ বেজসের আমাজন সাম্রাজ্য

  • লিডারশিপ ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের চূড়ায় নেওয়ার আশা প্রত্যেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারই থাকে। বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন শপিং রিটেইলার আমাজন ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেফ বেজস আরও বড় ‘মহাকাব্যিক’ কিছুর প্রত্যাশা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ের বড় একটি দেয়াল সে কথাই বলে। সেখানে নানা ঐতিহাসিক অভিযানের বর্ণনা রয়েছে।

এর মধ্যে আছে ‘দ্য ওডিসি’র উদ্ধৃতি, চন্দ্র বিজয়ীদের কথোপকথন। এমনকি আমাজন কীভাবে ‘ডে ওয়ান’ মন্ত্রটি নিয়ে যাত্রা শুরু করল, সে বিষয়টি। আমাজনের মন্ত্র ‘ডে ওয়ান’কে বিশেষভাবে ধারণ করেন জেফ বেজস। এটি যেন তাঁর বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। তিনি মনে করেন, আমাজনের প্রতিটি দিনই ‘ডে ওয়ান’, অর্থাৎ আমাজনের যাত্রা সবে শুরু হলো এবং প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয়।

বিনিয়োগকারীদের সব প্রত্যাশা পূরণ করার সম্ভাবনা আছে বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানটির। তবে বড় সাফল্যের পথে বড় সমস্যাও আছে। ২০ বছর আগে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করা আমাজন বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেতারা খুচরা পণ্য কেনার ক্ষেত্রে যত খরচ করেন, তার মধ্যে ৫ শতাংশ আমাজনের ই-কমার্স সেবা ব্যবহার করে খরচ করা হয়। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। আমাজনের চেয়ে বাজার দখলে দ্বিগুণ এগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে, ক্লাউড কম্পিউটিং সেবার দিক থেকে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ২০১৫ সালের পর থেকে আমাজনের শেয়ারের দাম ১৭৩ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের দুই বছরের চেয়ে সাত গুণ দ্রুত। অবশ্য পরিচালন ব্যয়ও বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যয় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলারে সীমাবদ্ধ রাখায় বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট খুশি।

‘বিশ্বের সবচেয়ে গ্রাহককেন্দ্রিক কোম্পানি’ হিসেবে বিশাল বিনিয়োগ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে আমাজনের। সাবেক বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে বৃহত্তম অনলাইন রিটেইলার এখন। নতুন গ্রাহকদের খরচ করা অর্থের অর্ধেকের বেশি পকেটে পুরছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও এখন আমাজন। ৪০ হাজার কোটি (৪০০ বিলিয়ন) ডলার বাজার মূলধন হিসাব করলে আমাজন হচ্ছে বিশ্বের পঞ্চম মূল্যবান প্রতিষ্ঠান। আমাজনের মতো অন্য কোনো কোম্পানি এত কম মুনাফা দেখিয়ে এত মূল্যায়ন পায়নি। ২০২০ সালের পর মুনাফা আসবে—এমন সম্ভাবনায় ৯২ শতাংশ মূল্যায়ন করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, লাভের অঙ্কটা ভবিষ্যতে দারুণভাবে বেড়ে যাবে। গত বছরে ১ হাজার ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য বিক্রি করেছে আমাজন। আগামী এক দশকে আমাজনের মুনাফা আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার আশা করছেন তাঁরা। এই আশার প্রতিফলন ঘটনাতে আমাজনকে অতি দ্রুত আরও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এর মূল্যায়নের যথার্থতা প্রমাণে দ্রুত বেড়ে উঠতে হবে। এটা কি সম্ভব?

আমাজনের সফলতার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো হাত গুটিয়ে বসে নেই। মাইক্রোসফটের ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের লক্ষ্য আছে। ওয়ালমার্টের আয় বাড়ছে এবং অনলাইনে কার্যক্রম বাড়ছে। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা বেজসের যদি কিছু ঘটে, তবে সে শূন্যতা পূরণ করাও কঠিন হবে। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে কতটা সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে, সেটাই আমাজনের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য আমাজনের মাধ্যমে কাজ করতে ইচ্ছুক নয়। বড় রিটেইলারগুলো আমাজনকে ঠেকাতে তাদের মতো দ্রুত ও সাশ্রয়ী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। আমাজনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা কমাচ্ছে। গত বছর থেকে আমাজনকে ঠেকাতে বিশাল বাজেট নিয়ে নেমেছে ওয়ালমার্ট। ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারে কিনেছে ই-কমার্স উদ্যোগ (স্টার্টআপ) জেট ডটকমকে। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা আমাজনের ব্যবসা মডেল নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ভিডিও স্ট্রিমিং-সেবা নেটফ্লিক্সকে প্রাইম ভিডিও-সেবা চালু করে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে আমাজন। ২০০টি দেশে এ সেবা দেবে প্রতিষ্ঠানটি। নেটফ্লিক্সের প্রধান নির্বাহী রিড হ্যাসটিংস আমাজনের চ্যালেঞ্জ স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন অস্বাভাবিক এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি। যেহেতু জেফ সেখানে আছে, এটা একধরনের ভীতি।’

অবশ্য আমাজনকে নিয়ে অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এ দুশ্চিন্তার কারণও রয়েছে। অ্যাপলের সঙ্গে আমাজনের স্ট্রিমিংয়ে কনটেন্ট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। গুগলও আমাজনের মাধ্যমে কেনাকাটার সুযোগ দিতে নারাজ। আমাজনের অ্যালেক্সার সঙ্গে প্রতিযোগিতার জন্য গুগল নিজস্ব ভার্চ্যুয়াল সহকারী ছেড়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের দুনিয়ায় আমাজনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে মাইক্রোসফট। আইবিএম ও গুগল এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। এই চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতায় উন্নত ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হাতে পাচ্ছে মানুষ।

এদিকে আমাজন কাজ করছে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে। এখনকার সময়ে নির্বাহী কর্মকর্তাদের স্বল্প মেয়াদে ফল দেখাতে চাপ দেওয়া হয়। বেজস কিন্তু উল্টোপথের যাত্রী। ক্রমাগত বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে ই-কমার্স ও আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস ব্যবসায় আরও বিনিয়োগ বাড়ানো। ই-কমার্সের ক্ষেত্রে যত শপ বা বিক্রেতাকে আমাজন কাছে টানছে, ততই রিটেইলার বা খুচরা ব্যবসায়ী ও উৎপাদক আমাজনে তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে চাইছেন। এতে নতুন নতুন সেবা এনে অর্থ আয় করার সুযোগ পাচ্ছে আমাজন। যেমন দুই ঘণ্টায় পণ্য সরবরাহ, ভিডিও ও মিউজিক স্ট্রিমিং সুবিধা। এতে নতুন বিক্রেতা যুক্ত হচ্ছে। একইভাবে এডব্লিউএসের নতুন যত সেবায় আমাজন বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, তত গ্রাহক আকর্ষণ বাড়ছে। তৃতীয় আরেকটি লাভজনক ব্যবসা আমাজন ফেঁদেছে তাদের ভয়েস বা কণ্ঠস্বর পরিচালিত ভার্চ্যুয়াল সহকারী অ্যালেক্সাকে কেন্দ্র করে। ডেভেলপাররা অ্যালেক্সার জন্য যত সেবা তৈরি করবে, এটি গ্রাহকদের জন্য তত দরকারি হয়ে উঠবে। এতে ডেভেলপারদের আরও সেবা তৈরির সুযোগ বাড়বে।

বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিন ধরেই আমাজনের ব্যবসা মডেলের ওপর বিশ্বাস রাখতে হচ্ছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে আমাজন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অবশ্য ব্যর্থতা যে একেবারে নেই, তা নয়। মোবাইল ফোনের দুনিয়ায় সফল হতে পারেনি আমাজন। এ ক্ষেত্রে অ্যাপল, গুগল এগিয়ে গেছে।

আমাজনের কাজের পদ্ধতি ও সময় বিবেচনা অদ্ভুত মনে হয়। বার্ষিক প্রতিবেদনে আমাজন উল্লেখ করেছে, তাদের বর্তমান ও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় রয়েছে লজিস্টিক ফার্ম বা পণ্যসেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট, খাদ্য উৎপাদন ও সব ধরনের মিডিয়া। আমাজন যে শুধু অনলাইন পণ্য বিক্রেতা নয়, এটা তারই প্রমাণ। নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানকে সেবা দিতে কাজ করছে আমাজন। ক্লাউড-সেবা, ওয়্যারহাউস ভাড়া, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, ড্রোনের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের মতো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রযুক্তি শুধু আমাজনের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতে পারছে। অনেকে মনে করছেন, আমাজন ভবিষ্যতে নতুন ধরনের উপযোগিতা তৈরি করবে, যার মধ্যে ই-কমার্সের অবকাঠামো থেকে শুরু করে কম্পিউটিং শক্তি, অনলাইন অর্থ লেনদেন ও পণ্য সরবরাহের সুবিধা জায়গা করে নেবে।

আমাজনের প্রত্যাশা ঘিরে অবশ্য কিছু সমস্যা রয়েছে। প্রত্যাশা পূরণের কাছাকাছি গেলেও এটি নিয়ন্ত্রকদের চোখ এড়াতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো এটি বৃহত্তম রিটেইলার হয়ে ওঠেনি। দেশটির অ্যান্টিট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ওপর প্রভাব ও দামের বিষয়টি দেখছে। তাঁদের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ফাঁকি দিতে পারবে না আমাজন। এটি যখন আরও বড় হবে, এটি নিয়ে উদ্বেগও বাড়বে। ভবিষ্যতে আমাজনের তৈরি সফটওয়্যার-সেবা বা টুল ব্যবহার করে যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে বেড়ে উঠতে হয়, সে জায়গায় যেতে চাইছে আমাজন। ব্যবসার ক্ষেত্রে সে জায়গাটা যদি আমাজন ধরে ফেলে, তবে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিও উঠে আসবে। প্রতিদ্বন্দ্বীরা যদি আমাজনের কার্যক্রম ঠেকাতে না পারে, তখন চলে আসবে অ্যান্টিট্রাস্টের নজর।

আমাজনকে ঠেকাতে এর প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন প্রতিষ্ঠানটির কোনো ভুল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিতে পারে। জেফ বেজস যদি কোনো ভুল ট্রেন্ড ধরে এগোতে থাকেন, তবেই সে সুযোগ আসবে। আমাজনকে ঠেকাতে এর ঘরে নেই—এমন গ্রহণযোগ্য, ক্রেতার চাহিদাসম্পন্ন পণ্য বিক্রির দিকে ঝুঁকতে হবে। তবে সাফল্যের পথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে সরকার।

তথ্যসূত্র: ইকোনমিস্টfavicon59-4

Leave a Reply