বিদায়ের আনন্দ

বিদায়ের আনন্দ

সজীব হোসাইন, রংপুর : ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল তিনটি অনুষদের অধীনে ৬টি বিভাগের (বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, গণিত, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিবিএ) ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে রংপুর শহরের লালকুঠি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে অস্থায়ীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের।  সেদিন হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এরপর একে একে পার হয়েছে বছর। আরও পড়াশোনা, আরও টেনশন। অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাস পাওয়া- সবই ঘটেছে তাদের চোখের সামনে। ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত মজার স্মৃতি আনন্দ বেদনার বিভিন্ন ঘটনা। আজ তাঁদের অনেকেরই সম্পন্ন হয়েছে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। মনের কোণে তাই বেজেছে বিদায়ের ঘণ্টা।

২০১৩ সাল থেকে প্রথম হল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আবাসিকতা পান প্রথম ব্যাচের ছাত্রীরা। হলে ইতোমধ্যে কেটেছে তাঁদের দীর্ঘ সময়। বিদায় বেলায় তাই চোখ ভার করে শেষ হাসি হাসার চেষ্টা যেন সকলেরই। তাই মঙ্গলবার(২৩ ফেব্রুয়ারি) দিনটা প্রতিদিনের মতো আলো ঝলমলে হলেও মনের কোণে বিষাদের অজানা সুর। আর এক সাথে জমবে না আড্ডা। হবে না সুখ- দুঃখের খুনসুটি। কারণ আজই তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল থেকে।

হল সমাপন উৎসবে শিক্ষকদের সঙ্গে বেরোবির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। ছবি : সজীব হোসাইন।
হল সমাপনী উৎসবে শিক্ষকদের সঙ্গে বেরোবির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। ছবি : সজীব হোসাইন।

হল সমাপনী বা বিদায় উৎসবের দিন সকাল থেকে তারা জড়ো হতে থাকেন ক্যাম্পাসে। সবাইকে টি-শার্ট বিতরণ করা হয়। অনেকেই হাতে তুলে নেন খেলনা বাঁশি, ঢোল আর ঝুনঝুনি। এগুলোর শব্দে মুখরিত হতে থাকে ক্যাম্পাস চত্বর। আর ব্যান্ড পার্টি তো সঙ্গে ছিলই। হলটির প্রাধ্যক্ষ ড. তুহিন ওয়াদুদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা করেন বিদায় উৎসবের। তারপর শুরু হয় রং ছোঁড়াছুড়ি। একে অন্যকে রঙে রাঙানোর পালা। ব্যান্ড পার্টির বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে গান গাইতে গাইতে মুখরিত হয় পুরো ক্যাম্পাস। আবার বিকেলে সবাই মিলে প্রিয় ক্যাম্পাসে ভ্রমণ।

‘কীভাবে সময়গুলো পার করলাম ভাবতেই পারি না। যদি আবার প্রথম থেকে শুরু করতে পারতাম তাহলে মনে হয় আরও ভালো হত’— অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন প্রথম ব্যাচের ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ইটের গল্প যাঁদের জানা তাঁদের হারিয়ে  পুরো ক্যাম্পাসই যেন থমথমে!

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হলটির প্রাধ্যক্ষ ড. তুহিন ওয়াদুদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী। এ সময় উপাচার্য প্রথম ছয়টি বিভাগের শিক্ষার্থীদের উত্তরীয় পড়িয়ে দেন এবং সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্যের সহধর্মিণী গুলনাহার নবী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন ড. মো. তাজুল ইসলাম, বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদের ডিন ড. মো. মতিউর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ কমলেশ চন্দ্র রায়। এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হলটির সহকারী  প্রাধ্যক্ষ শেখ মাজিদুল হক, ড. নিতাই কুমার ঘোষ, সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী, কুন্তলা চৌধুরী, কাশফিয়া ইয়াসমিন অম্বা প্রমুখ।

সমাপনী অনুষ্ঠানে মধ্যে দিয়ে সবার অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে শেষ হয় হল সমাপনী। হলে আবাসিক ছাত্রীরা তাদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে বলেন, আনন্দ লাগছে ঠিকই কিন্তু তার মাঝেও খানিকটা বেদনা লুকিয়ে আছে, আর সেটা হচ্ছে-ভালোবাসার বেরোবি ক্যাম্পাস এবং বন্ধুদেরও ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট।

সবশেষে অশ্রুসিক্ত লোচনে আর নির্বাক কণ্ঠে তাদের অন্তর বলে উঠে যেন, ‘দেখা হবে বন্ধু কারণে বা অকারণে…’ । আর এই এরকম কিছু টক-ঝাল-মিষ্টি-মধুর গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আনন্দঘন প্রথম ব্যাচের হল সমাপনী উদযাপন।favicon594

Leave a Reply