সাবধান ! ঢাকায় নতুন এসেছেন ?

সাবধান ! ঢাকায় নতুন এসেছেন ?

  • ফিচার ডেস্ক

আফসানা আলম (ছদ্ম নাম) বাসে চেপে যাচ্ছিলেন মতিঝিল। জানালার পাশের সিটে বসার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল তার। জনাকীর্ণ এই শহরে বাসের মধ্যে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াই যেখানে বিরাট ভাগ্য বলে মনে হয়, সেখানে বসার যায়গা পাওয়া—তাও আবার জানালার পাশে! তিনি জানালর কাঁচ সরিয়ে বাতাস উপভোগ করতে করতে মনে মনে আরেকবার নিজের ভাগ্যের প্রশংসা করলেন। হঠাৎ ফার্মগেটের যানজটে থেমে গেল বাস। আর তখনই জানালার বাইরে থেকে কে যেন খামচি দিলো তার গালে। তিনি ‘আহ’ বলে আর্তচিৎকার দিয়ে কানে হাত দিয়ে দেখলেন কানের দুলটা নেই, কান কেটে দরদর করে রক্ত ঝরছে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন ছিনতাইকারী উধাও!

আরেক দিনের ঘটনা। ইফতেখারুজ্জামান (ছদ্ম নাম) অফিস থেকে ফিরছিলেন বাসায়। লোকাল বাসে জানালার পাশের আসনে বসেছেন তিনি। গুলিস্তান মোড়ে বাস যখন যানজটে আটকা, তখন ইফতেখারুজ্জামানের মনে হলো স্ত্রীর কাছে ফোন করে শোনা দরকার যে বাজার সদাই কিছু লাগবে কি না। তাহলে কারওয়ান বাজারে নেমে বাজারটা সেরে বাসায় ফিরবেন। তিনি পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন করলেন স্ত্রীকে। আর তখনই কে যেন জানালার বাইরে থেকে খামচি দিয়ে কেড়ে নেয় তার মোবাইল। তিনি ‘আমার মোবাইল আমার মোবাইল’ বলে চিৎকার করে বাস থেকে নেমে পড়েন। কিন্তু ততক্ষণে ছিনতাইকারী উধাও!

এসব ঘটনা নিত্যই ঘটছে ঢাকা শহরে। তাই যাত্রাপথে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করুন। যেমন:

১. ঢাকায় বাসযাত্রার সময় কখনো জানালার পাশে বসে মুঠোফোন ব্যবহার করবেন না। যেকোনো সময় ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে পারেন। শুধু বাস নয়—কার, উবার, রিকশা কিছুই নিরাপদ নয় এ শহরে। সিএনজি চালিত অটোরিকশার ছাদ কেটেও মুঠোফোন নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। অতএব যাত্রাপথে মুঠোফোন পকেটে কিংবা ব্যাগের ভেতর রাখুন। যেসব নারী নাকে বা কানে সোনার গহনা  পড়েন, তারা আরও সাবধানতা অবলম্বন করুন। কারণ যাত্রাপথে এসব মূল্যবান গহনা ছিনতাইয়ের ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

২. রিকশায় চলাচলের সময় কোলের ওপর ব্যাগ রাখবেন না। পাশ থেকে মটরসাইকেল কিংবা গাড়িতে করে ছিনতাইকারীরা এসে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে যাবে। শক্ত করে ব্যাগ ধরে রাখলেও বিপদ! ছিনতাইকারীরা ব্যাগ টান দিলে আপনি রাস্তায় গিয়ে পড়বেন এবং আপনাকে রাস্তায় ছেঁচড়িয়ে অনেক দূর টেনে নিয়ে যাবে। তাতে মাথার এবং মেরুদণ্ডের মারাত্মক ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকবে। ব্যাকপ্যাক ব্যাবহার করুন তবে সেটা পিঠে না ঝোলানোই ভালো। ব্যাগ দুই পায়ের ফাঁকে রেখে পা দুটো দিয়ে আড়াল করে রাখুন।

৩. রাস্তায় কিছু খাবেন না। দূরপাল্লার যাত্রা হলে বাড়ি থেকে খাবার সঙ্গে ‍নিন অথবা প্যাকেটজাত কিছু খান। পাশের যাত্রীর দেওয়া খাবার পরিহার করুন, পাশাপাশি রাস্তার পাশের দোকান থেকে ডাব কিংবা অন্য কিছু খাওয়া থেকেও বিরত থাকুন। কারণ আপনি যে পানি বা ডাব কিনলেন অথবা অন্যকিছু, তাতেই থাকতে পারে ওষুধ মেশানো। প্রতারকরা এখন অনেক চালাক। তাই কোনো রকম খোলা খাবার খাবেন না।

৪. ট্রেন যাত্রার সময় দরজার পাশে কিংবা দুই কামরার পাশে দাঁড়াবেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে ধুমপান করবেন না। ট্রেনের ছাদে চলাচল যতোই রোমান্টিক লাগুক না কেন, তা থেকে বিরত থাকুন। কারণ যে অপরাধীচক্র ছিনতাই করে, তারা খুবই নির্দয় এবং বেপরোয়া। এদের শিকার হওয়া অনেক যাত্রীর লাশ পাওয়া যায় সারাদেশের ট্রেন লাইনের আশেপাশে। বেশিরভাগই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে ফেলা হয়।

৫. অনেক সাবধান থাকার পরেও কখনো কখনো ছিনতাইয়ের কবলে পড়তে পারেন। দেখা যাচ্ছে, ছিনতাইকারী বেশ কয়েকজন। আপনি একা, চারপাশে কেউ নেই। আপনাকে ঘেরাও করে রেখেছে। আপনার পকেটে দামী ফোন।  কী করবেন তখন? এসবক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হচ্ছে, ফোনের মায়া ত্যাগ করা। কারণ যারা ছিনতাইকারী তাদের বেশিরভাগই নেশাগ্রস্থ। এরা খুব একটা চিন্তা করেনা কিছু একটা করে বসার আগে। তাই এরকম পরিস্থিতিতে নিজেকে খুব বেশি সাহসী প্রমাণ না করাই ভালো। বেঘোরে প্রাণটা যাবে। আপনার জীবনের মূল্য পৃথিবীর যেকোনো দামী ফোনের চেয়েও অনেক বেশি।

৬. বান্ধবী বা মেয়ে বন্ধুর সাথে রেস্টুরেন্ট বা পার্কে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখবেন আপনার চারপাশে একদল ছেলের আবির্ভাব। এরা একটা চক্র। দেখবেন তারা আপনাদের নিয়ে নানা রকম আজে বাজে কথা বলছে, বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসলে ওরা চাইছেই আপনাকে উত্তেজিত করে একটা ঝামেলায় বাঁধাতে। এতে ওদের লাভ। সেটা কিরকম? ধরা যাক আপনি মাথা গরম করে ঝামেলায় জড়ালেন। ওরা আপনাকে অপমান করেছে বলে আপনি পাল্টা কিছু বললেন বা করলেন। এই পেয়ে গেলো সুযোগ। ওরা তখন বাইরে থেকে নেতা গোছের কাউকে ধরে আনবে। যিনি এসেই আপনাকে আপনার বান্ধবীর সামনেই নানান রকমভাবে জেরা করবে। তারপর বিচারে আপনাকেই দোষী বানিয়ে দেবে। তারপর মিটমাট করার নাম করে আপনার কাছ থেকে জরিমানা বাবদ টাকা পয়সা কিংবা দামী ঘড়ি, ফোন অথবা ল্যাপটপট রেখে দেবে। তাই এসব জায়গায় কথা বাড়ানো মানেই ঝামেলা ডেকে আনা। আর নির্জন জায়গা হলে এদের দেখা মাত্রই সরে পড়ুন।

৭. ভোররাতে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। সাহস দেখিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তে যাবেন না। বাসস্টপে বা ট্রেন স্টেশনেই অপেক্ষা করুন। সকালে যখন রাস্তায় যথেষ্ঠ মানুষ থাকবে তখন বের হন।

৮. ট্রেন স্টেশনে বা সদরঘাটে নিজে নিজে বয়ে নিয়ে যেতে পারেন না এমন বোঝা নিয়ে এসেছেন তো বিপদে পড়েছেন! মাথায় করে পৌঁছে দেয়ার নামে আপনার কাছ থেকে চাদার মতো ৪০০-৫০০ টাকা খসিয়ে ছাড়বে কুলিরা। তাই সাবধানে থাকুন, দরদাম করে তারপর কুলি ঠিক করুন।

যতই ভালো লাগুক, ট্রেনের ছাদে বা বাসের ছাদে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন।

৯. নিউমার্কেট বা নীলক্ষেতের মত জায়গায় কেনাকাটা করতে গেলে খুবই সাবধান। কৌতুহলের বশে কোনো কিছুর দাম জিজ্ঞেস করলেও এখানে আপনাকে পাল্টা দাম বলার জন্য জোরাজুরি করবে। মনে রাখবেন এখানে মেজাজ দেখিয়ে লাভ নাই, এখানকার দোকানীরা সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করে। তাছাড়া সাথে কোনো নারী থাকলে তো আরো বেশি ঝামেলা করবে। এসব পরিস্থিতিতে জোরাজুরি করলে যা হয় একটা দাম বলুন। দরকার হলে অকল্পনীয় রকম কম দাম বলুন। আপনার সামর্থ্য এবং জিনিসপত্রের মূল্যজ্ঞান নিয়ে ওরা অপমান করবে। যতোই অপমানিত লাগুক আপনি সরে যান। এসব জায়গায় কোনো ক্রেতা ঝামেলা করে মার না খেয়ে বাড়ি ফেরেনা সাধারণত।

১০. বাসে উঠলে প্যান্টের পিছনের পকেটে ওয়ালেট বা সামনের পকেটে মোবাইল রাখা নিরাপদ না। সামনের পকেটে এসব জিনিস রাখুন। অথবা সাথে ব্যাগ থাকলে ব্যাগের ভেতর ফোন আর মানিব্যাগ রেখে চেইন ভালো করে লাগিয়ে দিন। ব্যাগের দিকে নজর রাখুন।

১১. বাণিজ্যমেলা, চিড়িয়াখানা, চন্দ্রিমা উদ্যান কিংবা শিশুপার্কে গিয়ে দাম না জেনে কোনো খাবার খাবেন না। দেখা যাবে একটা সিংগাড়া কিংবা আধা প্লেট বিরিয়ানি খাইয়ে ৪০০-৫০০টাকার বিল ধরিয়ে দেবে আপনাকে। শিশু পার্ক বা চন্দ্রিমা উদ্যানে দাম জিজ্ঞাসা না করে ফুচকা খাবেন না। কেননা খেয়ে ফেলার পর ফুচকার দাম ১০০/১৫০ বললে কিছু করার থাকে না। খাবার আগে দাম জিজ্ঞাসা করুন।

১২. রাতে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। কারণ রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বেশি। এমনকি পুলিশ ধরলেও বিপদ। যতই নির্দোষ হন, পুলিশ যদি বুঝতে না চায় আর আপনাকে আটকে রাখার নিয়ত যদি থাকে, তাহলে আপনার কিছুই করার থাকবে না। তাই ভালো হয় খুব জরুরি দরকার না হলে রাতে রাস্তায় না বের হওয়া। আর নিতান্তই যদি বের হতে হয় তাহলে বাড়ির লোকজনকে জানিয়ে রাখুন কোথায় যাচ্ছেন। বিপদে পড়লে কাকে কাকে ফোন করতে হবে সেটাও জেনে নিন।

১৩. বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো আপনার সামনে। সেটা প্রাইভেট গাড়িও হতে পারে। আপনাকে চালক বলবে সে গ্যারেজে ফেরার পথে বাড়তি কিছু ‘ট্রিপ’ নিচ্ছে। খুব অল্প ভাড়ায় আপনাকে পৌছে দেবার কথা বলবে। আপনি উঠবেন না। নারী হলে তো আরো আরো বেশি সাবধান হোন। যতোই আরামের ভ্রমনের নিশ্চয়তা দিক, আর আশেপাশের সিটের যাত্রীদের যতই নির্ভার নিশ্চিন্ত লাগুক। উঠবেন না। কেননা এরকম একটা প্রস্তাবে রাজি হলে আপনিই হতে পারেন ছিনতাই, ধর্ষণ বা কিডন্যাপিংয়ের শিকার। রাতের বেলা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যাবহার করুন যেটায় লোকজন আগে থেকেই উঠে আছে। আপনার গন্তব্য যদি শেষ স্টপেজে হয় তাহলে আশেপাশের যাত্রীদেরকে জিজ্ঞাসা করুন তারা কেউ অতদূর যাচ্ছে কিনা। গেলে তাদের সাথে একসাথে নামুন।

১৪. রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ ভদ্রবেশি কেউ এসে, সে হতে পারে ছেলে বা মেয়ে বা বয়ষ্ক পুরুষ কিংবা মহিলা, আপনার ফোন চাইলো। বললো, উনার কোন একটা সমস্যার কথা, এক্ষুনি একটা ফোন দিতে হবে কাউকে। আপনি বিশ্বাস করে ফোনটা দিলেন, দেখবেন পরক্ষণেই হুট করে বাইকে উঠে হাওয়া।

১৫. সাথে সবসময় আইডি কার্ড রাখুন। বিপদে পড়লে খুব কাজে দেয়। হয়তো কোনো দূর্ঘটনা ঘটেছে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, তখন যারা আপনাকে উদ্ধার করতে আসবে তারা আপনার পরিবার পরিজনকে জানাতে পারবে।

১৬. বড় অংকের নগদ টাকা কখনোই একসাথে নিয়ে চলাফেরা করবেন না। চেষ্টা করুন নগদ লেনদেন আপনার ব্যাংকের কোনো একটি শাখায় সারতে যাতে করে লেনদেন হয়ে গেলেই টাকাটা আপনার একাউন্টে জমা দিয়ে দিতে পারেন।

১৭. নতুন বিবাহিত হলে এবং স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঘুরতে এলে কাবিননামার ছবি মোবাইলে তুলে রাখুন। কখন কোন কাজে লেগে যাবে বুঝতেও পারবেন না।

সবচেয়ে বড় কথা, সবসময় সতর্ক থাকুন, চোখ কান খোলা রাখুন। মনে রাখবেন আপনার নিরাপত্তা আপনারই হাতে।

Leave a Reply